ঋতিল মনীষার কবিতা ভাবনা ও ৫টি কবিতা
ঋ তি ল ম নী ষা, সোমবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১২


ঋতিল মনীষার জন্ম ১৯৮৪ সালের পহেলা আগস্ট কক্সবাজারের রামু উপজিলায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যের স্নাতকোত্তর।তিনি 'শ্রয়ণ' নামের একটি ছোট কাগজের সম্পাদক।বর্তমানে গবেষক হিসাবে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
প্রকাশিত বই: ধূলির ছায়ায় অবসর।






কবিতা ভাবনা

নিজের কবিতা সম্পর্কে লিখতে বললে অস্বস্তি লাগে। মানুষের আসল চিন্তা তো নিজেকে নিয়েই । উন্মোচিত হতে আমরা ভয় পাই। তুলনামূলকভাবে এই ভয়টা আমার কম । আমি যা করি সেটা নিয়ে আমি লজ্জিত বা বিস্মিত নই । তবে নিজেকে সংশোধন করা কিংবা প্রচলিত সমাজের একজন যোগ্য মুখোশদারী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা কবিতা লেখার চেয়েও কঠিন একটা কাজ । এ কাজে এখনও খুব বেশী পারদর্শীতা দেখাতে পারি নি বলে মনে হয় । চেষ্টাই আছি বেঁচে থাকার প্রয়োজনে ।
আমার জীবনে কিছু কিছু বই এবং লেখকের অবদান অনস্বীকার্য । বিশেষ করে রাশিয়ান কিছু বইয়ের । একদিন হয়তো একটা তালিকা প্রস্তুত করতে পারব ।
আমার লেখা নিয়ে বিশেষ করে প্রকাশিত বইটি নিয়ে আমার এখনকার মন্তব্য ভালো নয়। অপরিপক্ক আবেগের প্রকাশ । বেশীরভাগই টিনেজ বয়সের সীমাবদ্ধ সামাজিক পরিসরের মাঝখানে হাপিঁয়ে উঠতে উঠতে লিখেছি । নিজেকে বেঁধে রেখে ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত হওয়ার মাঝখানে আমাকে খানিকটা মুক্তি দিয়েছে কিছু শব্দ । সে সকল শব্দের শুরুতে প্রাণসঞ্চার করে যাত্রা শুরু করলেও, পরবর্তীতে তাদের স্বাধীন পদচারণার উপর আমার প্রভাব ছিল কম।তবে ছিল। শব্দ এবং শব্দের গতির জোরে আমি বেঁচে আছি ।শব্দের বহুমুখী ব্যপ্তি ও সম্ভাবনা আমার ভেতরে প্রেরণা জাগায় হেঁটে চলার এবং একধরনের মুক্তিও দেয় ।শব্দের গতি এবং গতির পরিব্যপ্তি আমাকে ডুবিয়ে দেয় সুরে । এছাড়া নিজের অস্তিত্ব অর্থহীন লাগে।


...........................................
ঋতিল মনীষার ৫ টি কবিতা
...........................................

তোমার চোখ থেকে সরে এসে দেখ


আমাকে একবার তোমার চোখ থেকে সরে এসে দেখ
উঁচু কাঁটাবিদ্ধ ঢিবির উপর থেকে নামিয়ে দেখো
এতটা নামিয়ো না যাতে নরম মাটিতে ঢুকে যায় পা
পদ্ম সমস্ত জায়গায় ফুটে না
দিঘীর জলে ময়লা ।
আমাকে একবার শেকড়হীন করে দেখ
এই যে দড়ির মত এতসব লতা-পাতা ব্রত
এই যে তারের ভেতর রক্ত চোষার তরঙ্গ
এই যে তর্ক প্রতিবাদের ঘোর জ্বর
মায়াকাননের ফুলদাত্রী
ভয় ফোঁটা হরিণ চোখের মাধুরী
এই যে কোলের কাছে ভবিতব্য তুলা
ছাই উড়া কাঠকুড়ানো দুঃখ
আমাকে কিছুক্ষণ নগ্ন করে দেখ
এতটা নরম নয় যাতে জবর-দখল হয়ে যায় ভিটে –মাটি
একবার নিষিদ্ধ রাতের উঠোনে দেখো
পাহাড় ডিঙানো ক্লান্ত অবসরের আগে
আমাকে একবার আমার মত করে দেখো
নীল রাগ পোষা রাতের আগে
শ্লোকবিদ্ধ অসমাপ্ত দেহান্তর পর্ব
তারা খসা রাতের শোক ছায়া নিঃস্বরণের আগে
এখনও কি এতটা শীতগ্রস্ত লাগছে !



ক্ষমা কর প্রেমিক

ক্ষমা কর প্রেমিক প্রেম জানি না
আদর্শ দেখি নি আসবাবপত্র ছাড়া
নেশা নিতে হয় একবেলা,
একবেলা ভাত না হলেও চলে ।
সত্য শহর দেখি নি ভাঙা নগর ছাড়া,
গ্রামের বাহুতে ঘুম পোকার আবরণ,
শামুক বৃত্তি
অন্যের জন্য মুক্তো খোঁজা চলে না
নিঃশব্দ পায়ে ক্ষয়রোগ
বিকেল খেয়ে মরে যায় পাখি,
পাখিরা নির্দোষ,
কেঁচো প্রবৃত্তি
অবনতির কথা বাইরে বলা চলে না ।

ক্ষমা কর প্রেমিক,
শরীর ছাড়া প্রেম চলে না ।



ইচ্ছেদের সময়মত আত্মহত্যা করতে হয়

সেদিন একটা অসভ্য সময় আমাদের মধ্যে এসে দাড়িয়েছিল
আব্রুহীন রাতের হাড়
মাতাল হিসেবী রাত
আমারও কিছুটা উষ্ণতার প্রয়োজন ছিল
মেঘ সংক্রান্তি কালে শিশিরের স্বাদহীন স্বেদবিন্দু
সংশয় ছিল না নগ্ন হওয়ার সম্ভাবনায়
ভালবাসার অস্তিত্ব থাকে না এসকল অপ্রাপ্তবয়স্ক নির্গলনে
পাতারা খুলে ফেলেছিল মর্মবেদনা
কেউ সে শব্দ শুনে নি
আমরাও শুনিনি
আমরা যা করি আমাদের মত করে করি
কেউ কাওকে দেখি নি
দিনশেষে জানি নি তুমিও আমাকে ভয় পাচ্ছিলে কি-না
সংশয় কেবলই আমার
কিছুই নিতে শিখি নি
সেদিন একটা অশালীন ইচ্ছে জেগেছিল
তুমি দেখা না দিয়ে চলে যাওয়ার আগেই আরেকটি ইচ্ছে আত্বহত্যা করেছে
দিনদুপুরে
কেউ দেখে নি ।

যখন তুমি শাড়ি পড়ো

যখন তুমি শাড়ি পড়
আকাশ সেদিন মাটিতে গড়ায়
কাঁধ অবধি ঝুলানো চুল উদ্যত বিভোর কর্ম আয়োজনে
কাজ ছাড়া তুমি নিজের যত্ন নিতে শেখো নি বলে
সে জানে না সুন্দরের সবটুকু আলো-ছায়া তোমার বাহুতে গড়ায়
সে জানে নি কত অল্প যত্ন নিলেই কী উৎসাহে উদয়াচল কেবল তোমার মুখোমুখি
যেদিন তুমি শাড়ি পড় সেদিন আমি পুরুষ হয়ে উঠি
সমুদ্র গর্জন করে উঠে আমার বুকে
উদভ্রান্ত ঢেউরা কালো পাড়ে গড়াগড়ি খায়
তোমার রোদ ভেজা কপালে টিপ খুঁজি
তুমি কখনও আমার সামনে টিপ পরো নি
ঈর্ষা নিয়ে শিশু বিকেল আচলে আদর খুঁজে
সেদিন একটা হলুদ ফুল রিকশায় উঠেছিল অন্যমনস্ক হৃদয়ে
অবাক এক সুন্দরকে দেখলাম ভালবেসে ক্লান্ত পায়ে উড়ে যেতে
সুন্দর চলে গেছে, ছায়া থেকে গেছে মনে ।


সূর্যের অভিশাপ

সূর্যের মুখ দেখব বলে বসে থাকি
অথচ সকাল শুরু হয় সুরহীন ঘড়ির যান্ত্রিক আমন্ত্রণে
আয়নায় দাড়িয়ে নগ্ন ঘুমের অবিশ্রান্ত গালাগালি
গোপনে চুল উঠে যাওয়া কপালের ছিন্নপত্র
জনসম্মুখে গুজব ছড়ানোর সুযোগ পায় নি ।
গুজবের শেষ নেই বলে সূর্য বন্ধ জানালার
মরচে পড়া গ্রিলে ধাক্কা খায় ।

অফিসে এলে সবাই কেরাণী,
এমনকি পেট ঝুলে বসে থাকা
প্রগাঢ় জ্ঞানবেশী ব্যাঙটাও,
চোখ বুজে ব্যাঙাচিদের পদচারণা গোণা ছাড়া
দিনান্তে তার কোন অবসর নেই ।

আমিও ঘুরি অপলক
অন্ন খুড়ি,
অন্ন যোগালী ।
টেবিলে চারকোণা মুখ
চুমু খায়,
জিহ্বা বের করে ভ্যাংচি কাটে
দাঁত বের করা হা-ভাতে ঘরের ছেলেদের হাসি,
চারকোণা মুখের বদন্যতায় দিন কাটে ।

প্যাঁচ খাওয়া রাবারের সাপ বুক বের করা
সোফায় লেজ দোলায় ।
টিভি কার ঘর পোড়ার খবর দেখায়
কোন এক দেশের কালো কোট পড়া রাজা
হাত তুলে মার্জিত শব্দের বয়ান করে
জনগণের উদ্দেশে
জনমনকে ভালবেসে ।
ভাষণ কি একধরনের কবিতা?

ভাবতে ভাবতে ব্রেক ছাড়া লাঞ্চে খাই,
ইঁদুরের লালার সাথে, কাগজের ঝোল ।
রঙ উঠা দেমাগী পর্দা,
সূর্যের চোখে ধূলা দিয়ে কাঠের দরজা বুকে রাখে ।
চারদেয়ালের কাঁটা গায়ে -মুখে ফুটিয়ে পার করি
জল লুকিয়ে ফেলা নদী পথ,
আরেকটি ঠোঁট ভেঙে পড়ে থাকা বিকেল
হাতভাঙা টুপি পড়া ফকির
শেষ ভিক্ষের আশায় বস্তিতে ফেরার আগে
সেই গানটা আবার গায় ।
গানটির কোন স্বরলিপি নেই
গীতিকারের নাম নেই
গানটি মুখে মুখে কে শুনিয়েছিল!
মনে করার চেষ্টা নেই আর ।
সে কেবল একটি গানই জানে।

সূর্য নিভে যায় ততক্ষণে
অথচ সূর্য দেখব বলে কাটিয়েছি
আরেকটি দিন
ব্যাঙের সাথে ।
ধোঁয়ার আবদ্ধে হঠাৎ ঘড়ি
রাতে থামে,
দেয়ালের টিকটিকি গুনে ।

মধ্যরাতের আয়নায় কেবল যাতনাময়
চোখের কোণে জমে থাকা কালি
তর্জনি তুলে সূর্যের অভিশাপ ।