কুতুব হিলালীর ১০ টি কবিতা
কুতুব হিলালী, রবিবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১২


কুতুব হিলালীর জন্ম ১১ জুলাই ১৯৮০ সালে কক্সবাজারের গোমাতলী। ছোট বেলায় তিরিশ পারা কোরান মুখস্থ করেছেন মক্তবে। পরে পটিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসা ও লক্ষ্ণৌ দারুল উলুম নাদুওয়াতুল উলামা মাদ্রাসায় দাওরা পর্যন্ত।


কবিতা ভাবনা

কবিতা জন্মের জমজ। এখন ভাবি, কবিতার নাগাল না পাওয়া বা কবিতা পড়তে না পারার মতো সূক্ষ্মতম কোনো অজুহাতও যদি কেউ আমার সামনে জন্মপূর্বে পেশ করতো, তাহলে কবিতাহীন জীবন গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতাম। কবিতা আমার কাছে উপলব্ধির স্বতস্ফূর্ত উৎসারণ। কবিতাহীন জীবন ভাবতে পারি না।

......................................
কুতুব হিলালীর ১০ টি কবিতা
......................................

বিত্তান্ত নাই


তবে তাই হোক

জন্ম থেকে মৃত্যু থেকে
পুরাতনের চির নতুন থেকে
বিদ্যাবতীর ইতিহাস থেকে
শেখা কিংবা শেখাবার মতো
তেমন কিছুই নাই

আমার উচ্চারণ
সেও এক প্রহসন
থাকা-খাওয়া খেলা
চাষাবাদেই সাঙ্গ বেলা

যৌবনের গুটিশুটি
অঙ্কুরিত মটরশুটি
বিহানের হেঁটে চলা
সোনালি সন্ধ্যার দিকে

মদিরতা ভরপুর
জীবন অচিনপুর
চলে যায়

তুমি চলে যাও
তোমারে তাজা রাখিবার
কোনো সাধ্যিসাধ
আমার জানা নাই

এ জনমে আমি
আসি নাই, আসি নাই গো
কোনো জনমেও
আমার কোনো বিত্তান্ত নাই

জগতের মশাইবৃন্দ
তবে তাই হোক


পারি না

জীবনটা কেন জানি
বারবার এলোমেলো হয়ে যায়
কথা দিয়ে কথা রাখতে পারি না
মন দিয়ে মন

সামর্থ্য আমার এতোই ঠুনকো
সাধের মুরোদ নেই অই অবধি যাওয়ার

জীবনকে একদিন বললাম
তুই কি আব্বুর মতো হয়েছিস
সারাক্ষণ কুম্ভকর্ণ আয়েশি দুলাল
মায়ের আশিস নিতে না-পারা
অলক্ষুণে বেয়াড়া

জীবন হাসে কবিতার খেরোখাতায়
মাঝেমধ্যে তার মিহিন কান্নার আওয়াজ
আশপাশকে ভারাক্রান্ত করে তোলে
কাঁধের ফেরেশতারাও তখন
কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারে না

জীবন কেমন হলে খুব গোছালো হয়
প্রিয়ার বিন্যস্ত কেশরাজির মতো
তাকালেই ফুরফুরে সৌরভের উচ্ছল আমেজ
আমার বুকের হৃৎপি--শিরা ভরিয়ে দেবে

এমন উন্মাদ প্রশ্নের উত্তর
এই জীবনের তিরিশ বছরেও পেলাম না
যারা পায়, মনে হয় প্রকৃতই তারা পায় না
পাওয়ার ভান করে মাত্র

এলোমেলো জীবনই আমার অন্বিষ্ট
ব্যর্থতার অবিন্যাসই নিদানশ্রেষ্ঠ
কথা না রাখা কিংবা মন না দেয়া
এই তো জীবনের সিক্ত-সারাংশ


ইতিহাস এখন নপুংসক হয়ে গেছে


ইতিহাসের পাঠ নিতে নিতে
রণক্লান্তের মতো দ্যাখো
আমি এখন একটি অঢেল বোমার স্তূপ

হিরোশিমা নাগাসাকি নয়
ভুবন কাঁপানিয়া ইস্রাফিলের আওয়াজ
আমাকে পৃথিবীর সকল
রক্তাক্ত জনপদের অধিবাসী করে তোলে

আমি সবকিছু কান পেতে শুনি
আমি চোখ বন্ধ করেও সত্যটি দেখি
এখন যারা পৃথিবীতে প্রভুত্বের আসনে সমাসীন
তাদের মগজ পিঁপড়ের বুদ্ধিও রাখে না

উন্নতির দোহাই পেড়ে
বোকা বানাবার মকশটি বেশ আয়ত্ত তাদের
হালের বলদের মতো আধুনিক পুঁজির ঘানিটি
আমাদের উপর দিয়ে দিব্যি টানিয়ে নেয়


আমরা চলি ডানে ও বামে
কখনো বা তিরিক্ষি ভঙ্গিমায়
হেঁটে চলি গজদন্ত মিনারের দিকে

বিস্ময়ের গহ্বর থেকে
হাম্বা রবটিও আর বের হয় না আমাদের

আমরা কি নিরীহ প্রাণীর চেয়ে
আরো বেশি নিরীহ হয়ে গেছি
ভুলে গেছি গন্তব্যের সঠিক সড়ক
বঞ্চনার কষাঘাতে নিস্তব্ধ নিথর

এখন তবে যা হওয়ার, সব হয়ে গেছে

গাধারাও ভুলে গেছে ঘানিটানা তাদের
কুকুরেরা চায় না আর ভাদ্র কিংবা আশ্বিন
প্রকৃতিও নিঃসঙ্গ অসহায় ধ্বজ
মানুষেরা এখন যেন নর্দমার কীট

চারদিকে কেবল রক্তবর্ণ কালিমা
ইতিহাসের ক্যানভাসে কেউ আর ভাসে না

ইতিহাস এখন নপুংসক হয়ে গেছে


শ্যাওলাসঙ্গ

বাঁকবদল কাকে বলে জানি না

শণখড়ের ছাদ, ঘুণে-ধরা বাঁশের বেড়ার ফাঁক
মাকড়সা জালের ঘরকন্না, আটপৌরে পোশাক
গেঞ্জি ও সার্ট
লাঙলের ফলা বয়ে বেড়ানো চেনাজানা মানুষ
ধূলিধূসর ব-দ্বীপের শীর্ণদেহগুলো বদলে গিয়ে
এখন দেখি ভরপুর লাবণ্যে পরিপুষ্ট

জমি-জিরেতের মালিকানায়
কারো কারো চাষাবাদ বেড়ে যায় বেশ
গোলাঘর ভরে ওঠে পুঁজির ফসলে
হালিমাদের হেঁশেলে নতুন রান্নার ঘ্রাণ
প্রতিদিন বাতাসের ডাকপোস্টে ঠিকই পৌঁছে যায়

মুখর মানুষের হাবভাব, আদলের বেশভূষা
শুভ্রসারি দাঁতের কপাট
মোলায়েম খামের ভেতর থরেথরে সাজানো থাকে

অনেক বছর পর সেই খামটি খুলতে গিয়ে
দেখি সবকিছু পরিবর্তিত হতে হতে
কেমন জানি বিবর্ণ হয়ে গেছে
সময়ের আয়না নদীময় রেখার কব্জায় বিচূর্ণ

বদল হয়নি কেবল আমার বেড়ে-ওঠা
শৈশবের সেই প্রাচীনবাড়ির শ্যাওলাটি

গাঢ় ভূতুড়ে অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে শ্যাওলাছায়া
লোমশ-আকীর্ণ কাছারি-বারান্দা, আরো দূর পরিত্যক্ত
ক্লেদাক্ত ছাইভস্মের স্তূপ বেড়ে যেতে যেতে শুনি
এই গাঁয়ের নামটাও এখন হয়ে গেছে শ্যাওলাপট্টী

সেই শ্যাওলার বদল হয়নি
সেই শ্যাওলা হজম হয়নি

আমার শৈশবও শ্যাওলাসঙ্গ নিয়ে
ওখানেই পড়ে আছে


অব্যক্ত


যে কথা বলতে চেয়েছি
বলা হয়নি
সে কথা কি কোনোদিনও বলা হয়
মনের নিভৃতচরে নিত্য যার উদয়

সুন্দরকে বুঝবার মতো
সত্যকে বলবার মতো
কথাদের বকুলেরা জীবনের অন্তরে
ফোটেনি আজো

চেয়ে থাকি প্রতিদিন প্রার্থনার স্বরে
অব্যক্ত হাহাকারে
মন কথা কও
হৃদয়ের দরোজায় হানো আঘাত
শব্দের উল্লাসে তুমুল বাজাও

সে কথা হয়নি বলা
বলতে চেয়েছি যা
নিরন্ত সমর্পণে

অদ্ভুত এক অবসাদ কোলে
সময় বয়ে যায়
আহা তুমুল বয়ে যায়


উপমা

কোনো কোনো উপমা
মাথার ভেতর অদ্ভুত এক খেলা করে চলে
প্রাচীন শস্যদানার মতো
অঙ্কুরিত বীজের অনিবার বাসনা

দেবতার উদ্দেশে যে আকাশ প্রতিদিন
সূর্যের আলোয় নিজেকে উদোম করে
ব্যাপ্ততার চরাচরে খুলে দেয় মুখ
সে কি রাত্রির তমসায় জোনাক-জ্বলা প্রাসাদে
তোমাকে ভুলতে পারে

তুমি তো উপমার শ্রেষ্ঠ উৎসারণ
চির জীয়ন্ত এক জাগরচেতন
সমস্ত কোলাহল, সকল স্তব্ধস্বর অশ্রান্ত প্রাণনে
একটি পৃথিবী-সমান অবারিত হলঘরে ছড়িয়ে পড়ে
সিম্পনির প্রতিধ্বনি বাজে তুখোড় আড্ডায়

তোমার উচ্চারণ কবিতার নিখুঁত উদাহরণ
মর্মর কণ্ঠনাদে বজ্রনির্ঘোষে যুৎসই বাঁশরিয়া সুর
আমরা সেই সুরে জেগে ওঠি অনিরুদ্ধ এক অবয়বে
অস্তাচলের জড়তা ভেঙে
হাজার কালের পরিক্রমায়
অন্ধকারের মিছিল শেষে
ধীরে ধীরে থিতু হই

কোনো কোনো উপমা
মাথার ভেতর অদ্ভুত এক খেলা করে চলে
ভালোবাসায় তৃষ্ণায় সোহাগে সম্ভোগে জীবনের খেলাঘরে
নৃত্য করে উদ্দাম আনন্দের চূড়াভূমে

তোমার কণ্ঠস্বর অভয়যাত্রার অনিশেষ মন্ত্র এক
আমাদের সার্বভৌম সান্ত¦নার আশ্রয়কেতন
সভ্যতার দীপ্তিতে উজ্জ্বল-অস্তিত্বের চূড়ান্ত সংগ্রামে
বিজয়স্তম্ভ হয়ে হিমালয়-শিখর ছুঁয়ে যায়

কোনো কোনো উপমা
মাথার ভেতর অদ্ভুত এক খেলা করে চলে
নিরন্তর ঝর্নাধ্বনির মতো
কখনো বা বেগবতী নদীর স্রোতধারা
পাললিক মৃত্তিকার পাদপীঠ ধরে
বয়ে চলে সমুখে হাজার বছর ধরে


বালির বার্লিনে

এ স্বপ্ন নয়, মিথ্যে নয়
মিথ কিংবা কাহিনির ঘোর
উজ্জ্বল রোদের মতোন স্বস্ত বিভোর

পিঁপড়ে নয়, কাঁকড়ার দুদ্দুড় আঁকিবুঁকি
মসৃন তটশোভায় মাটির স্তূপের মতোন
প্রাচীন প্রাচীরের মতোন
ভঙুর বালির বার্লিনে ভেদরেখা টেনে যায়
বিশ্বময় বিপুল ব্যত্যয়
শ্রেণিজাত পাশব উল্ল¬াসের স্রোত বয়ে যায়

চিরায়ত চিৎকার
ক্ষুধা মৃত্যু ভাষা ও জিঘাংসার
কোথাও প্রতিকার নেই, নেই কোনো অধিকার
শ্লোগানের স্বরগ্রাম ধীরে ধীরে মিহিন ফেউ-সার

পৃথিবী হে ধীর অতলান্ত পৃথিবী
ইপ্সিত প্রতিমার শ্রম ঘাম বিন্দু বিন্দু জল
ভুল হয়ে যায়
বিলকুল ভুল হয়ে যায়


অশ্লীল

প্রজ্ঞার ভাষা জানা নেই
অশ্লীল পরিচয়ে বারবার
নিজেকে ঢাকি
অস্থির পরিবেশ, নির্জনপাখি

সে পাখি আমি নই
আমি নই
আমি নই
প্রকৃতই আমি যে কি
কিভাবে নিজেকে আঁকি


না সন্তান

শুনেছি তোমার মিনতি মা
করুণ কান্নার মর্মন্তুদ মিনতি
অসহায় দারিদ্র্যের জটাজাল তোমাকে
বেদনার সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছে
তুমি উদ্ধার চাও, চাও
প্রণামের ভঙ্গিমায় অবুঝ সন্তানের আশ্রয়

ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে
নিরুপায় তুমি ক্লান্ত হয়ে ওঠো
প্রার্থনার পরম উচ্চারণে
শাড়ির আঁচলে দুচোখ মুছতে মুছতে
কণ্ঠস্বর তোমার ধীরে ধীরে
ক্ষীণ হয়ে আসে
শ্রান্ত হয়ে আসে

লা-জবাব সন্তান তোমার

এইসব বেদনার্ত বুক-ফাটা হাহাকার
শ্রুতির কুহরে কখনো প্রবিষ্ট হয় না তার
সংসারের দৈন্য জ্বর জরা মৃত্যু অনটন
চিত্ততলকে তার আর্দ্র করে না এটুকুন

এ কেমন সন্তান তোমার
এ কেমন রক্তের স্রোতাধার
বীভৎস বিবমিষ নিষ্ঠুর ক্লেদের খেলায়
মেতেছে জন্মজলে

না, না
এ তোমার সন্তান নয়
এ হনন-পিশাচ পাপিষ্ঠ এক শয়তান
নিপট পাথুরে হৃদয়ের কাছে তুমি
মিনতির বদলে পাবে না মান্যতা কখনোই
কান্নার জবাবে আসবে শুধু নির্দয় সেটানিক উল্ল¬াস

মা, এবার তুমি শমিত হও
ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পিত

ছেড়ে দাও পিশাচকে দাউদাউ নরকে
কলঙ্কিত জন্মের দাগ নিয়ে
নিখিলের অভিশাপে জ্বলতে দাও
লেলিহান অঙ্গারে ভীষণ পোড়াও

তোমার হাতের সুকোমল ধমনীশিরা
মুষ্টি ও সাহসের অমিত চোয়াল
দয়ার্দ্র কণ্ঠধ্বনি
এবার তবে শক্ত করো
হৃদয়খানি শাণিত করো

জন্মের মতো নিস্পৃহ নির্মম


অবিনাশী

দুর্দান্ত সাহসে ছুঁড়ে ফেলি নিজেদের
সীমানার প্রাচীরগুলো প্রমত্ত আক্রোশে গুড়িয়ে দিই
অনটন টনটন করে
ভেতরটা গুমরে মরে
তবু শতাব্দি প্রাচীন বিশ্বাসের নিচে পুঁতে দিই বীজ
অঙ্কুরিত জীবনের স্বপ্নিল বীজ

যে আগুন নিভে আছে ভূতল গহ্বরে
যে জল ক্ষয়ে যায় বিপুল ব্যবহারে
আমি তাদের জমজ শস্য, প্রবাহিত হিম
দূর কোনো রোদ্দুরে বেজে ওঠা বীণ, সবুজের বীণ

এখানে শস্যের দানা গেয়ে যায় গান
এখানে প্রাচীন বিশ্বাস কুটে মরে শুধু
ভুলের পুষ্প থেকে জেগে ওঠে শুদ্ধতা-শীষ
সাহসের ডানায় ভরে ওঠে গোলা

পাপের শৃঙ্খল ভেঙে
প্রাচীনের শাসন ছুঁড়ে
এখানে অনাগত নতুনের গতিপ্রাণ
ছুটে চলে তীব্র অনিশ্চিতের পথে

আমরা এই অনিশ্চিতের চির বিজয়ীর দুর্দম বীজ
আমাদের এই অঙ্কুর চির অবিনাশী