ইমতিয়াজ মাহমুদের ৯ টি কবিতা
ই ম তি য়া জ মা হ মু দ, শনিবার, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১২


তরুণ কবিদের মধ্যে সবচাইতে মেধাবী, মননশীল, স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের অধিকারী অথচ সবচেয়ে কমপ্রচারিত কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ। তার কবিতার বয়ান সহজ অথচ দর্শনগতভাবে গভীর। যা পাঠান্তে পাঠককে একই সাথে আনন্দিত ও ভাবনায় নিমগ্ন করে। একেবারেই নিজস্বতার ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকে তার কবিতা। প্রচার থেকে দূরে, প্রাচীরের ভেতর নিরন্তর অনুরণিত হতে থাকে কবিতাগুলি। এখানে ছাপা ৯টি কবিতা পড়লেই পাঠক বুঝতে পারবেন, আমাদের অনুমান মিছা নয়।
ইমতিয়াজ মাহমুদের জন্ম ১৯৮০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝালকাঠি জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে স্নাতক । বর্তমানে সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডার। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় 'পাক্ষিক শৈলী' পত্রিকায় ১৯৯৯ সালে।

প্রকাশিত বই

অন্ধকারের রোদ্দুরে (২০০০),
মৃত্যুর জন্মদাতা (২০০২),
সার্কাসের সঙ (২০০৮),
মানুষ দেখতে কেমন (২০১০)

প্রকাশিতব্য বইঃ

নদীর চোখে পানি ও অন্যান্য কোয়াটরেন,
পা হাড় পোড়া শব দে।


.................................................
ইমতিয়াজ মাহমুদের ৯টি কবিতা
.................................................

যাত্রা

পর্তুগালের কোনো বন্দর থেকে জাহাজটা ছেড়ে ছিল। ষোল শতকের
এক দুপুরে। জাহাজে কয়জন নাবিক ছিল তা জানা যায় নি। তবে
সেখানে একুশটা চোর, সাতটা দস্যু, তেরটা ভবঘুরে আর একজন
কবি ছিল। তাদের কারো গন্তব্য ম্যানিলা। কারো মাদাগাস্কার।
সবশেষে জাহাজটা সন্দ্বীপ বা মংলা পৌঁছবে এমন কথা ছিল।
কোথাও পৌঁছানোর আগে জাহাজটা আমার মগজের মধ্যে ডুবে গেছে।

বই

খোদা আমাকে মানুষ বানালো।
আমি হতে চেয়েছিলাম বই।
বাংলা বই। লাল মলাট।
মোমের আলোয় বালকেরা
আমাকে গলা ছেড়ে পাঠ করতো।
বাংলা বই। মোমের আলোয়।
খোদা আমাকে মানুষ বানালো।
কেউ পড়তে পারে না!

বন্ধু

আমি মরে গেলে বন্ধুরা মনে হয় কেউ কেউ আসবে। আমার লাশ
দেখতে। বলবে, ওর যে এমন হবে সেতো আগেই জানতাম।
কতবার বারণ করা হলো। কে শোনে কার কথা। কেউ বলবে, গত
সপ্তাহে একবার ফোন করলো। কথা বলতে পারলাম না। বুধবার
বাসায় আসতে বললাম। এলো না। একজন বলবে, বছরখানেক
আগে সাত হাজার টাকা ধার করলো, তারপর কোনো দেখা নেই।
আরে আমি কি কখনো টাকার তাগাদা দিয়েছি!
-তাদের কাছে আমার অনেক ঋণ।
আমি মরে গেলে আমার লাশটা বন্ধুদের খেতে দিও।


সময়

দশ হাজার বছর আগে। আমাজান বনে। একটা ডাইনোসর
ক্ষুদে একটা বনমানুষকে তাড়া করে। ডাইনোসরটা দেখতে
কেমন বোঝা যায় না। তবে বনমানুষটা দেখতে আমার মতন।
তার চোখে ভয়। ডাইনোসরের ক্ষুধা। এমন ক্ষুধার্ত কয়েকটা
পুলিশ আজ তেজগাঁ স্টেশনে আমাকে তাড়া করে। আমি
দৌড়াতে শুরু করি। দৌড়াতে দৌড়াতে বনমানুষটা দশ
হাজার বছর পরের তেজগাঁ স্টেশনে। আর আমি আমাজান বনে।
আমার পেছনে ডাইনোসর, মধ্যে দশ হাজার বছর, সামনে পুলিশ।

কুকুর

পাড়ার কালো কুকুরের নাম অ্যামব্রোস। এই নামে ডাকলে
সে খুব উৎসাহ পায়। লেজ নাড়ে। দৌড়ায়। পাউরুটি
খাবার নানান বাহানা করে। পাউরুটি খায়। নতুন মানুষ
দেখলে ঘেউ ঘেউ করে। অচেনা কুকুর দেখলে হামলে পড়ে।
পাউরুটি খায়। দৌড়ায়। পূর্নিমার রাতে তার খুব মন খারাপ
হয়। চাঁদের কালো দাগ দেখলে সে বেশ বুঝতে পারে
চাঁদের ভেতর একটা কালো কুকুর আটকা পড়েছে!


বিচ্ছেদের পর

তোমার সাথে আমার বিয়ে হলে বনিবনা হতো না। আমাকে তুমি একদম
সহ্য করতে পারতে না। আমি তোমাকে দেখতে পারতাম না। আমাদের
খুব দুর্দশা হতো। প্রতিবেশীদের উৎকন্ঠা। তোমার ছায়া দেখতেও আমার
ঘৃণা লাগতো। তোমার সন্দেহ হতো ... সব ছেড়েছুড়ে দূরে কোথাও পালিয়ে
যাবার কথা বলতে ... আমি হত্যা করার কথা ভাবতাম ... তুমি কেবল আমাকে
দোষারোপ করতে ... আমি আমার নিয়তিকে ... আমার মন বিষাক্ত হয়ে উঠতো
তোমার জিহ্বা সাপ হয়ে আমাকে ছোবল মারতো ... আমাদের চোখ আগুন
হয়ে পরস্পরকে জ্বালিয়ে দিতো ... সব ছাই হতো ...
সব নরক হতো!

এমন একটা নরকের জন্য আমি কাঁদছি ...!


হাত

মানুষের অনেকগুলো হাত থাকলে খুব ভালো হতো।
গীটার বাজানোর জন্য একটা হাত
পাউরুটি খাবার জন্য একটা হাত
জুয়া খেলার জন্য একটা হাত
এমন হলে খুব সুবিধা হতো।
এমন হলে মানুষ যে হাতে টাকা গুনতো সে হাতে গীটার বাজাতো না।
এমন হলে মানুষ যে হাতে গোলাপ ধরতো সে হাতে হত্যা করতো না।


পাঠশালা

অন্ধকার
ছোট্ট খুপড়ি ঘর। পাশে জামগাছ।
কয়েকটা গরু।
একটা রাখাল।
পাঠশালায় যাই। গ্রামের পাঠশালা। বিদ্যুত নাই।
মাস্টার নাই। আমরা তবু পাঠ করতে যাই।
যিনি ছবি আকাঁন। তিনিই আবার ধর্ম
পড়ান। আমাদের গণিত শেখান।
আমরা তাকে বাতাশ করি।
ছোট্ট খুপড়ি ঘর। পাশে জামগাছ।
কয়েকটা গরু
একটা রাখাল
ঘরে ফেরে
পাঠশালা থেকে আমার আত্মা ফেরে না।

বাগান

বাগানে অনেক গাছ আছে। একটা তরুণ গাছে ফুল
ফুটেছে। সে খুব খুশি। এবারই তার ডালে প্রথম
ফুল ফুটলো। ফুল ফোটার আনন্দে সে লাল হয়ে
উঠছে। আর একটু পর পর বাতাসে ফুল দোলাচ্ছে।
পাশে কয়েকটা গাছ যারা ফুল ফোটাতে ফোটাতে
প্রবীণ হয়ে গেছে! -তরুণ গাছটার বেহায়াপনা দেখে
তো অবাক। তারা বলছে, ‘ডালে এখনো ২/৪টা ভালো
পাখি বসলো না এরই মধ্যে এতো।’ -বাগানের শেষ
প্রান্তে একটা চারা নীরবে গাছ হবার সাধনা করছে।