রত্নগর্ভা
দেবানন্দ সরকার, সোমবার, মার্চ ১১, ২০১৩


আজ ভোর থেকে তাহমিনা বেগমের মনটা কেন জানি বড় খুশী খুশী। অন্যদিন ফজরের আজানের শব্দে তাহমিনার ঘুম ভাঙে। আজ ঘুম ভেঙে গেল তারও আগে। কোনো দুঃস্বপ্নের ভয়ে ঘামে ভিজে উঠে নয়। আনন্দের কোন কিছু দেখছিলেন। কি দেখছিলেন তা এখন মনে পড়ে না তবে বুকের ভেতরটা সুখে ভরাট হয়েছিল। বিছানা থেকে উঠে তাহমিনা কাপড় গুছিয়ে নিয়ে পুকুরঘাটে এলেন। বৈশাখের ভোর। এখনো আলো ফোটে নি। পাখিরা ধীরে ধীরে কলতানে মুখর হয়ে ডানা মেলছে আকাশে। সারারাতের গুমোট গরমের পর ঝিরঝির ঠান্ডা হাওয়া আদর দিয়ে যাচ্ছে তাহমিনার চুলে। সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে তাহমিনা জলের ঝাপটা দিলেন মুখে। নিদ্রার গ্লানি ধুয়ে ফেলে সজীব হয়ে উঠলেন। কই এরকম অনুভূতিতো আগে কখনো হয়নি! কোনো অঘটনের আগে মনে কে যেন কুডাক দেয়। সেটা তাহমিনা বুঝতে পারেন। দূর প্রবাসে কেউ অসুস্থ হলে সে খবর পাওয়ার আগেই তাহমিনার বুকের ভেতর ধুকধুক করতে থাকে। কিন্তু আজকের মত এত প্রশান্তি, এত সাম্য আগে তো কখনো অনুভব করেন নি! আর তার সাথে অজানা হর্ষমাখা পুলক। যেন আকাশে ডানা মেলে উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে। কি আছে আজ সারাদিনে? এও কি কোনো অমঙ্গলের প্রতিরূপ? বাতাসে ভাসতে ভাসতে দুঃসংবাদের আঘাতে সশব্দে কি আছড়ে পড়বেন মাটিতে? তাহমিনার মনে হাল্কা শঙ্কা জাগে। কিন্তু যে প্রফুল্লতা অনুভবকে জড়িয়ে রেখেছে তার বলয় ভেদ করে কোনো ভয় তাহমিনাকে দুলিয়ে দিতে পারে না।
একা দাওয়ায় বসে তাহমিনা এই অনুভবকে সযত্নে লালন করেন। বিরাট উঠোনের চারপাশে ছ’টি ঘর। তার বেশীরভাগেই তালা দেওয়া। এত বড় বাড়ি তবু কেউ নেই থাকার। রান্নাঘরের পাশের ঘরটায় রহিমন বিবি ছেলে হাবিব আর মেয়ে শেফালীকে নিয়ে থাকে। হাবিব জোয়ান ছেলে। কুড়িতে পা দিয়েছে গত বছর। ও বাইরের সব কাজ দেখাশোনা করে। শেফালীর পনের। তাহমিনার যত্ন নেওয়াটা ওর কর্তব্য। রহিমন বিবির বাবা কেরামত আলি এই বাড়ির জমিজমা দেখাশোনা করত। রহিমন বিবি বিধবা হবার পর হাবিব আর শেফালীকে নিয়ে বাবার কাছে চলে এসেছিল। কেরামত মারা গেছে। জমিজমাও আর নেই। কিন্তু তাহমিনা রহিমনকে নিজের কাছে রেখেছেন। বিপদে-আপদে কাউকে তো পাশে দরকার।
তালা দেওয়া ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে তাহমিনার মন ডুবে যায় স্মৃতি রোমন্থনে। এখনতো শুধু অতীতকে লেহন করেই বেঁচে আছেন তাহমিনা। ন’বছর বয়সে এ বাড়ির বৌ হয়ে এসেছিলেন। এখন বয়স পঁয়ষট্টি। ছাপ্পান্ন বছর ধরে এ বাড়িতে আছেন! নিজের বাপের বাড়ির কথা মনেও পড়ে না তাহমিনার। এ বাড়ির প্রতিটি ধুলোর সাথে গাঢ় হয়ে মিশে আছে তাহমিনার সুখ-দুঃখ। তিন বছর আগে হৃদরোগে এ উঠোনে দেহ রেখেছেন তাঁর স্বামী। এ বাড়ি ছেড়ে তাহমিনা কোথায় যাবেন? ছেলেরা অনেক করে বলেছে তাহমিনাকে ঢাকায় এসে থাকতে। তাহমিনা রাজী হননি। ওরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। গ্রামের জমিজমার দরকার নেই। তাছাড়া জমিজমা থাকলেই গ্রাম্য রাজনীতির চক্করে পড়ে ঘুরপাক খেতে হবে। তাই একে একে ধানী জমি সবই বিক্রি হয়ে গেছে। শুধু আছে এই বাড়ি আর পুকুর। এটুকু তাহমিনার জন্য যথেষ্ট। নাতি-নাতনীরা কালে-ভদ্রে আসে দাদীর কাছে। গ্রামের খোলা হাওয়া আর উন্মুক্ত আকাশের নীচে ওরা প্রাণ ভরে দৌড়াদৌড়ি করে। তাহমিনার বড় ভালো লাগে।
ছেলেদের বলেন, ‘দেখ্ কি আনন্দ করছে ওরা! আমাকে ঢাকায় টেইনে নিয়ে এলে কি ওরা এত মজা করতে পাইরতো? তোদের শহরে তো হাটার জাগাটুকুও নেই।’
ছেলেরা মার কথা শুনে হাসে। ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য খুববেশী চাপাচাপি করে না। সাতটি সন্তান তাহমিনা বেগমের। সব ক’টাই ছেলে। তাদের মধ্যে দু’জন ঢাকায়। আর বাকী পাঁচজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। সবাই সবচেয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছে। শুধু এ গ্রাম নয়, আশেপাশের গ্রাম ছাড়িয়ে জেলা সদর পর্যন্ত সবাই ওঁর সন্তানদের চেনে। তার সাথে চেনে তাহমিনা বেগমকেও। গর্বে বুকটা ভরে ওঠে তাহমিনার।
খুটখাট শব্দে ঘোর ভাঙে তাহমিনার। অন্ধকার কেটে ভোরের গোলাপী আলো ছড়িয়ে আছে চরাচরে। সেই সাথে শেফালীও উঠে পড়েছে। এক বাটি মুড়ি আর এক কাপ চা নিয়ে শেফালী তাহমিনার পাশে এসে বসে।
‘দাদী, চা নেও।’
‘তুই খাবি নানে?’
‘ভাইজান উঠলে একসাথে খাব।’
‘তোর মা কই?’
‘মা রাইতে বলছিল জ্বরজ্বর লাইগছে। ভাইজান অষুধ দিল। তা খেইয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।’ বলতে বলতে হাসিতে গড়িয়ে পড়ে শেফালী। সেই হাসির ছোঁয়াচ তাহমিনার মনেও লাগে। বড় মিষ্টি শেফালীর মুখটা। ওকে একটা খুব ভালো বিয়ে দিতে হবে।
‘ও দাদী, আমি তো বুলতে ভুইলেই গেছি। বাজারে ফার্মেসীতে তুমার নামে একটা চিঠি এসেছে। ভাইজান রাতে করে নিয়ে এইসেছিল। তুমি ঘুমিয়ে পইড়েছিলে বইলে দেওয়া হয় নি। দাড়াউ আমি নিয়ে আইসতেছি।’ শেফালী দৌড় দিয়ে ঘরে চলে যায়। প্রবাসী ছেলেদের কাছ থেকে মাঝেমধ্যে চিঠিপত্র আসে তাহমিনার। হয়তো বা সেরকমই কিছু এসেছে।
শেফালী খামটা হাতে দিতে তাহমিনা একটু চমকে যান। এতো বিদেশের চিঠি নয়। দেশী ডাকটিকেট লাগানো। খামের এককোনে লেখা আজাদ প্রডাক্টস। পুরু কাগজের মোটা খাম। ভেতরে শক্ত কোনো কাগজ আছে। কাঁপাকাঁপা হাতে তাহমিনা খামটা খোলেন। ভেতরে একটি আমন্ত্রণপত্র। তাহমিনা বেগম একবার পড়েন। কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। তারপর আবার পড়েন। এবার যেন বুঝতে পারেন। পুরো মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে হাসিতে আর একই সাথে চোখ উথলে অশ্রুর প্লাবন জাগে। এর জন্যই সকাল থেকে মনটা এত সুখী হয়েছিল!
‘দাদী এটা কি? তুমি দেখি একসাথে হাস আর কাঁদ। কি লিখা আছে ওই কাগজে?’ শেফালী জিজ্ঞেস করে। তাহমিনা জবাব দেন না। শুধু কাগজটা শেফালীকে বাড়িয়ে দেন পড়ার জন্য। পড়ে শেফালী আনন্দে চিৎকার করে উঠে জড়িয়ে ধরে তাহমিনাকে। তারপর জোরে ডাক দেয়, ‘মা, ভাইজান, শিগগির আস। দেইখে যাউ। দাদী রত্নগর্ভা পুরস্কার পেইছে।’
তাহমিনা বেগম পেয়েছেন রত্নগর্ভা মায়ের পুরস্কার। আন্তর্জাতিক মা দিবস উপলক্ষ্যে আজাদ প্রডাক্টস ২০০৩ সাল থেকে পঁচিশ জন মাকে তাঁদের সফল সন্তানদের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দিচ্ছে। অন্তত তিনজন স্নাতক সন্তানের মা হতে হবে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে হলে। আর তাহমিনা বেগম তো সাতটি সুসন্তানের জননী। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই সম্মান গ্রহণ করতে ঢাকায় আসার জন্য তাহমিনা বেগমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
খবর শুনে লাফ দিয়ে ওঠে হাবিব। ‘দাদী, আমি এখনি মহিচাচারে জানাচ্ছি।’ মোবাইলটা অন করতে করতে বলে হাবিব।
‘কি করিস? এত ভোরে তো ওরা এখনো ঘুম থিকেই ওঠেনি।’
‘দাদী, এই রকম একটা খবর শুনেই তো ঘুম ভাঙা উচিত, কি বল?’ হাবিব হাসিমুখে বলে।
সেদিন থেকে তাহমিনা বেগম যেন একটা ঘোরের মধ্যে রইলেন। অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ছোটছেলে মহি এসে তাহমিনা বেগমকে ঢাকায় নিয়ে গেল। মহি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজীর অধ্যাপক। আরেক ছেলে মিজান বড় ফার্মের চার্টার্ড এ্যাকাউন্টেন্ট। দু’ ছেলে, ছেলে-বৌ, পাঁচ নাতি-নাতনী মিলে তাহমিনা বেগমকে নিয়ে এল ওসমানী মিলনায়তনে। বাকী চব্বিশজন মায়ের সাথে প্রথম সারিতে গর্বভরা বুক নিয়ে এসে বসলেন তাহমিনা। মায়ের গুণগান করে একের পর এক বক্তৃতা দিলেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। অর্থমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে গলায় পরিয়ে দিলেন মেডাল, হাতে তুলে দিলেন সনদপত্র আর উপহার। অনুষ্ঠান শেষে টিভি চ্যানেল থেকে সাক্ষাৎকার নেওয়া হল তাহমিনা বেগমের। কি বলবেন? ছেলেদের কথা বললেন। তাদেরকে এই বলে ধন্যবাদ দিলেন যে তাদের অর্জনেই আজ এই পুরস্কার পেলেন তাহমিনা।
অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি আসতে না আসতেই প্রবাসী পুত্রদের কাছ থেকে এল একের পর এক টেলিফোন।
‘মা, তুমি এত বড় একটা পুরস্কার পেয়েছ, আমাদের বন্ধু-বান্ধব সবাই তোমাকে দেখতে চাইছে। এবার আমার কাছে তোমাকে আসতেই হবে।’ পাঁচ ছেলে সবারই এক কথা।
তাহমিনা এর আগে কখনো দেশের বাইরে যান নি। সত্যি কথা বলতে কি কখনো যেতে ইচ্ছে করে নি। মরহুম স্বামী একটু ঘরকুনো ছিলেন। দূরে কোথাও যেতে ভালোবাসতেন না। পঞ্চাশের বেশী বছর এক সাথে থাকতে থাকতে সেই হাওয়াটা তাহমিনার মধ্যেও লেগেছিল। কিন্তু এবার ছেলেদের চাপে তাহমিনা আর না বলতে পারলেন না। ছেলেরা থাকে দুবাই, বাহরাইন, লন্ডন আর নিউ ইয়র্কে। সবার কাছে দু’মাস করে থাকার পরিকল্পনা। লন্ডনে থাকে দুই ছেলে। তাই সেখানে একটু বেশীদিন। সবশেষে নিউ ইয়র্কে বড় ছেলে ইফতির কাছে।
জানুয়ারীর মাঝামাঝি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ-এর বিমানে করে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে উড়ে এলেন তাহমিনা। সাতটি মাস মধ্যপ্রাচ্য আর বিলেতে বেশ কেটেছে তাহমিনার। দুবাই আর বাহরাইনে কমিউনিটি হল ভাড়া করে স্থানীয় বাংলাদেশীরা সম্বর্ধনা দিয়েছে তাহমিনাকে। এলাহী খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন সেথায়। আবুধাবি থেকে বাংলাদেশের এ্যাম্বাসেডর এসেছেন সেই মিলন মেলায়। মেডাল গলায় দিয়ে তাহমিনা লাজনম্র কন্ঠে জীবনের প্রথম বক্তৃতা দিয়েছেন। লন্ডনে অবশ্য এত জাঁকজমক হয়নি। তবে বেশ কয়েকজনের বাড়িতে জনসমাগম হয়েছে। সবাই এসে জড়িয়ে ধরেছে তাহমিনাকে। কৌতূহল নিয়ে দেখতে চেয়েছে সনদপত্র আর মেডাল। ইংরেজী না জানলেও ছেলেবৌ, নাতি-নাতনী অসম্মান করে নি। বরং তাহমিনাকে নিয়ে গর্ব করেছে।
ইফতির কাছে এসে তাহমিনাকে নিয়ে আবেগ আর উত্তেজনায় যেন একটু ভাঁটা পড়ল। নিজের কন্সট্রাকসন কোম্পানী আছে ইফতির। লং আইল্যান্ডে বিরাট বাড়ি। একটি মেয়ে কানিজ। কলেজে পড়ে। নিজের জগতে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ব্যস্ত। দাদীর কাছে ভিড়ে না। বৌমা রুমানা বিভিন্ন সমাজসেবী সংগঠনের সাথে জড়িত। সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে। আর ইফতিতো ব্যস্ত ব্যবসা নিয়ে। তাছাড়া ইদানীং রাজনীতির সাথেও জড়িত। সকালে নাস্তার সময় এক ঝলক দেখা হয় তাহমিনার সাথে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাঝরাত।
সারাদিন তাহমিনা বাড়িতে বন্দী থাকেন। বাড়ির সামনে পেছনে বড় লন। কিন্তু সব তুষারে ঢাকা। তাহমিনার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় বাইরে গিয়ে হাঁটবেন। কিন্তু এত ঠান্ডা যে সাহস করে উঠতে পারেন না। রক্ষে একটাই বাড়িতে বাংলা টিভি আছে। সারাদিন টিভির সামনে বসে থাকেন তাহমিনা। ছ’টা চ্যানেলে ঘুরে ঘুরে দেশের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।
দু’ সপ্তাহ পার হয়ে গেল নিউ ইয়র্কে। এর মাঝে কোথাও যাওয়া হয়নি তাহমিনার। কাউকে বাড়িতেও ডাকে নি ইফতি। ছুটির দিনগুলোতে রুমানা যেন আরো বেশী ব্যস্ত সেমিনার আর ফান্ডরেইজিং নিয়ে। আর ইফতির ব্যবসা তো কখনোই থেমে থাকেনা। অস্থির লাগে তাহমিনার। ভাবেন ইফতিকে বলবেন দেশে ফিরে যাবার কথা।
সোফায় আধশোয়া হয়ে সংবাদ দেখছিলেন তাহমিনা। খবর শুনতে শুনতে উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসে পড়লেন। কি হচ্ছে দেশে? আব্দুল কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে সাধারণ জনতার ঢল নেমেছে শাহবাগে। শাহবাগের নতুন নাম হয়েছে প্রজন্ম চত্বর। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে আওয়াজ আসছে রাজাকারদের প্রতিহত করার। তাহমিনা বেগম স্থির হয়ে বসে থাকতে পারেন না। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর জাতি কি জাগল আবার? উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মত আবারও কি জোয়ার লাগল জাতির বিবেকে? কি হবে এর পরিণতি? তাহমিনা ছটফট করতে করতে একের পর এক চ্যানেলে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন। যেন শুষে নিতে চান প্রতিটি বাক্য। যেন ইথারে ভেসে গিয়ে নিজের স্থান করে নিতে চান মঞ্চ ঘিরে জনতার কাতারে।
সকালে নাস্তার টেবিলে ইফতিকে পেয়ে আবেগ আর ধরে রাখতে পারলেন না তাহমিনা, ‘ইফতিরে দেশে কি হইচ্ছে দেখেছিস বাপ?’
‘ও সারাদিন বাড়িতে থেকে এসব ছাঁইপাশ দেখছ তুমি মা? আমরা হুজুগে জাতি। কিছু লোক হুজুগ করছে। নাই কাজ তাই খই ভাজছে। যত সব অপদার্থের দল।’ ইফতির মুখ থেকে রাগ আর বিরক্তি ঝরে পড়ে।
‘নারে বাপ তুই যে রকম বইলছিস আমার কিন্তু সেরকম লাইগছে না। এবার যেন লুকজন অনেক বেশী এককাট্টা। কত লুকের ঢল নেইমেছে দেইখেছিস?’
‘মা আমাদের ষোলকোটি মানুষের দেশ। ওখানে একটা হাততালি দিলে লাখে লাখে লোক ছুটে আসে। কিছু লোক একসাথে হয়ে লাফালাফি করলেই সেটা নিয়ে এত পুলকিত হয়ো না।’
তাহমিনা বলার কিছু পান না। কিন্তু সারাদিন ধরে টিভি দেখে দেখে কি ঘটছে তা বোঝার চেষ্টা করেন। ভাষার মাসে জনতার অহিংস প্রতিবাদ যেন বিশেষ এক প্রতীক বহন করে আনে। বাঙালী জাতি যেন প্রতি কুড়ি বছর পরপর জাগে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর একাত্তরের স্বাধীনতা। নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানের পর দু’হাজার তের-র এই আন্দোলন। তাহমিনার মন বলে এ আন্দোলনও সফল হবে। কিন্তু সেই সাথে গাঢ় ভয় আচ্ছন্ন করে রাখে তাহমিনাকে। যারা তিরিশ লাখ প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে স্বাধীনতার সময় তারা কি এত সহজে ছেড়ে দেবে? সারাদেশে কি গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে না? তাহমিনার সেই আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করেই জামাত-শিবির মেতে ওঠে হত্যাযজ্ঞে। তাদের নৃশংসতায় আবারো গ্রামের মাটি ভিজে ওঠে রক্তের প্লাবনে। সংখ্যালঘুদের মন্দিরে আগুন জ্বলে। লাশের পাহাড় জমে ওঠে হাসপাতালের মর্গে। একা বাড়িতে বসে এ সব দৃশ্য দেখতে দেখতে তাহমিনা বেগম অনর্গল আঁচলে চোখ মোছেন। এই রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে কি আসবে পরিশুদ্ধি? তাহমিনার বুকটা ভারী হয়ে ওঠে।
ছেলের সাথে এ নিয়ে কথা বলে হাল্কা হতে চান তাহমিনা। কিন্তু ইফতি এ নিয়ে কোনো কথাই বলতে চায় না। বলে, ‘শুধু শুধু এসব দেখে কেন সময় নষ্ট কর মা? এর চেয়ে হিন্দি মুভি দেখ।’ অথবা বলে, ‘মরার আগে পিঁপড়ের পাখা ওঠে না? ওই গাধার বাচ্চাগুলোরও পাখা উঠেছে। শাহবাগে বসে তিড়িং তিড়িং করে লাফাচ্ছে। ওদের এই তামাশা শেষ হতে আর দেরী নেই।’ তাহমিনা হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
শনিবার রাতে ইফতি আর রুমানা নিমন্ত্রণ করেছে স্থানীয় বাঙালীদের। তাহমিনার সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় হল এবার। ভেতরে মেয়েদের মহলে তাহমিনা বসলেন তাঁর মেডাল আর সনদপত্র নিয়ে। সবার আদর পেয়ে গর্বে আবারো বুকটা ভরে উঠল তাহমিনার।
তাহমিনার আনন্দের রেশটুকু ছিন্ন হয়ে গেল ইফতির গলার আওয়াজে। বাইরের ঘরে বসে কারো সাথে ইফতি খুব জোরে জোরে তর্ক করছে। তাহমিনা ধীর পায়ে দরজার পাশে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালেন। শুনতে চাইলেন ইফতি কি বলে।
‘ইফতিভাই আপনি বুঝতে পারছেন না এখন যেটা হচ্ছে সেটা হুজুক না। সাধারণ জনতা জেগেছে।’ কেউ একজন বলে।
‘ধূর বোকার স্বর্গে বাস করছেন আপনি। এগুলো সব আওয়ামী লীগের চাল। ইলেকশনের সময় এসেছে তাই জটলা পাকাচ্ছে।’ ইফতি উড়িয়ে দিতে চায়।
‘যারা প্রজন্ম চত্বরে বসে আছে তারা তো আওয়ামী লীগের লোক না। সব কাতারের মানুষ এসেছে এখানে। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা বাস ভরে আসছে।’
‘এগুলো সব ভাঁওতাবাজি। আওয়ামীলীগের পয়সা খেয়ে কতগুলো নাস্তিক আর কমিউনিস্ট পাবলিকের সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলছে। আপনি যদি মুসলমান হন। আপনার মধ্যে যদি ইমান থাকে তাহলে এই ফাজলামিকে আপনি কিছুতেই সাপোর্ট করতে পারবেন না।’
‘আপনি একে ফাজলামি বলছেন?’
‘নাতো কি? চল্লিশ বছর পর রাজাকারই বা কি আবার মুক্তিযোদ্ধাই বা কি। সব নদীর পানিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যুদ্ধ হয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। ব্যস খতম। পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ কি? জ্বালাও-পোড়াও হরতাল করে পুরো ইকনমিকে ধ্বংসের ব্যবস্থা।’
‘আপনি এগুলো কি বলছেন? যারা যুদ্ধ অপরাধী তাদের বিচার হবে না? এত লোককে খুন করে, এত মা-বোনের সম্ভ্রম হানি করে এরা মাথা উঁচু করে জোর গলায় দেশের মাটিতে বসে রাজনীতি করবে? আমরা তা হতে দেব?’
‘যখন শাস্তি দেওয়ার দরকার ছিল তখন তো দেওয়া হয় নি। তাহলে খামোখা এখন কেন?’ ইফতি ব্যঙ্গ করে বলে।
ইফতির কথা শুনতে শুনতে তাহমিনার মনটা চলে যায় একাত্তরের ওই নয়টি মাস সময়ে। এই স্মৃতিটুকু তাহমিনা বুকের অনেক গভীরে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। কিছুতেই বের করতে দেননি। আজ ইফতির কথায় পাথর গুঁড়িয়ে গরম লাভার মত সেই স্মৃতির স্রোত পুড়িয়ে দিল তাহমিনার অনুভব। যুদ্ধ গ্রাস করেছে তাহমিনার বাবাকে, ভাইকে। পালানোর পথ পাননি ওঁরা। বাবা আর ভাইকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল গ্রামের মাতব্বর হাফিজুল। ঘরের ভেতর দগ্ধ হতে হতে ওঁদের কান ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তাহমিনার একমাত্র বোন সুফিয়ার চিৎকারে। খোলা উঠোনে রাজাকার আর পাকবাহিনীর দল একের পর এক ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে সুফিয়াকে। সুফিয়া মরে নি। উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। এর কোনোকিছুই তাহমিনা জানতেন না। স্বামী-সন্তান নিয়ে এপ্রিলের শুরুতে ওঁরা ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর ফিরে এসে তাহমিনা সুফিয়াকে খুঁজে পেলেন গ্রামের পথে পথে পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াতে। ছোট ছেলেমেয়েরা ‘পাগলি পাগলি’ বলে পাথর ছুঁড়ে মারছে আর সুফিয়া প্রাণপনে ছুটে পালাচ্ছে তাদের আক্রমণ থেকে। সুফিয়াকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন তাহমিনা। কিন্তু সুফিয়া বদ্ধ উন্মাদ। আর তাহমিনার ঘরে ছোট ছোট সন্তান। খুব ভয়ে ভয়ে থাকতেন তাহমিনা। সবসময় চোখে চোখে রাখতেন সুফিয়াকে। কিন্তু বেশীদিন ভয়ে কাটাতে হয়নি তাহমিনাকে। সুফিয়া নিজেই উন্মত্ত আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কুয়োর ভেতর। কুয়ো থেকে ওর লাশ তোলার পর তাহমিনার শ্বশুর কুয়োটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
এর কোনো কিছু ইফতির অজানা নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইফতির বয়স ছিল আট। সুফিয়ার কথা তো ওর মনে থাকার কথা। যারা ওর মামা আর নানাকে কেড়ে নিয়েছে, ওর খালাকে মিশিয়ে দিয়েছে মাটির সাথে তাদের প্রতি একটুও ঘৃণা নেই ইফতির? একটুও রাগ নেই? ইফতি কি সবসময় এরকম ছিল? কই এরকম তো মনে পড়ে না তাহমিনার? কুড়ি বছর ধরে ইফতি দেশের বাইরে। এর মধ্যে এত বদলে গেল ও? কার সাথে মেশে ইফতি? কারা কেড়ে নিল ওর মনুষ্যত্ব? তাহমিনার চোখ থেকে এতক্ষণ যে জল ঝড়ছিল তা ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসতে থাকে। একটা প্রচন্ড রাগ আগুন হয়ে পুড়িয়ে দিতে থাকে সেই অশ্রুকে।
‘ইফতিভাই আমি ভাবতেও পারিনি আপনি রাজাকারদের সাপোর্ট করবেন।’ কার কন্ঠ থেকে ক্ষোভ ভেসে আসে।
‘আমি প্র্যাকটিক্যাল। কিছু নাস্তিকের হুজুগে এত লোকের ফাঁসি হয়ে যাবে সেটা আমি মানতে পারি না।’ ইফতি জোর গলায় বলে।
‘ফাঁসি তো হুজুগে হচ্ছে না। আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বিচার হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনার ক্রাইম ট্রাইবুনাল বিচার চালাচ্ছে। দু’পক্ষের যুক্তি শুনে সাক্ষীদের বয়ান শুনে তারপর বিচারক শাস্তি দিচ্ছেন।’
‘এটা বিচার ব্যবস্থার একটা মকারি। কি শাস্তি হবে তাতো আগে থেকেই ঠিক করা আছে।’
‘কিন্তু যাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে আপনি এটুকু তো মানবেন যে মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যায়, সাধারণ মানুষের খুনে, নারীনির্যাতনে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। আদালত থেকে রায় দিয়েছে আর সাধারণ মানুষ প্রজন্ম চত্বরে বসে অহিংস আন্দোলন করছে। তার প্রেক্ষিতে সারা দেশ জুড়ে জামাত-শিবির যে নৃশংসতা শুরু করেছে, যে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, হিন্দুদের বাড়ি, মন্দির পুড়িয়ে দিচ্ছে সেটা আপনি কি করে জাস্টিফাই করেন?’
‘এটাকে বলে পার্জিং। যারা ইসলামের পবিত্রতা কলুষিত করে তাদেরকে এভাবেই মারতে হবে। সমাজের পরতে পরতে এরা বেলেল্লাপনা আর কলুষতা ঢুকিয়ে দিয়েছে। এদেরকে সমূলে বিনাষ না করলে যে অবক্ষয়ের দিকে আমরা যাচ্ছি তা আরো গভীর হতে থাকবে। ইসলামকে বাঁচাতে এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
তাহমিনা বেগমের মাথার ভেতরে বিস্ফোরণ জাগে। মনে হয় দু’হাত দিয়ে কান বন্ধ করে চিৎকার করে ওঠেন। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না তাহমিনা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে আগুন ঝড়িয়ে বলেন, ‘ইফতি তুই এগুলো কি বলিস?’
‘মা তুমি এখানে কি কর? আমরা ছেলেরা কথা বলছি তুমি এর মাঝে এলে কেন?’ ধমক দেয় ইফতি।
‘ইফতিরে আমার শরম হয় যে তুই আমার ছেলে। তোকে আমি পেটে ধইরছি? আমার বুকের দুধ খেইয়ে তুই বড় হইয়েছিস। এসব শিক্ষে তুই কুথায় পেলি? তুর খালা, মামা, নানা কারো কথা তুর মনে নেই? তুর বাপের কাছ থিকে এই শিক্ষে তুই পেইয়েছিস?’ তাহমিনা আর্ত চিৎকার করে ওঠেন।
‘মা, তুমি থামবে? তুমি আমার অতিথিদের সামনে আমাকে অপমান করছ।’ ইফতি রাগে লাফিয়ে ওঠে।
তাহমিনা আর পারেন না সামাল দিতে, ‘ইফতিরে রত্নগর্ভা পদক পেইয়েছি আমি। এই দেখ আমার গলার মেডেল। রত্নগর্ভা মা আমি। আমি রত্নগর্ভা নই। তুর যতই টাকা থাকুক। তুই রত্ন নস। তুই আমার গর্ভস্রাব। তুরে গর্ভে ধরার জন্য আমি কোনো পদক পেইতে পারি না। বরং মানুষের উচিত আমাকে পাথর ছুঁইড়ে মারা। আমি এক অমানুষ প্রসব কইরেছি।’ তাহমিনার মুখে ফেনা জেগে ওঠে। গলার মেডেলটা খুলে ফেলে ছুঁড়ে মারেন ইফতির মুখে। সোনার কালিতে লেখা সনদপত্র টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ছুঁড়ে দেন ঘরের বাতাসে। তারপর এক দৌড়ে দরজা খুলে ফেব্রুয়ারীর কনকনে শীতে তাহমিনা বেগম হারিয়ে যান অন্ধকারে॥
==== ==== ==== ==== ===

দেবানন্দ সরকার: জন্ম, বেড়ে-ওঠা ঢাকা শহরে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘদিন প্রবাসী। পেশা ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা। নেশা রাত জেগে গল্প লেখা। স্ত্রী এবং দুই পুত্র সহ ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডে নিবাস। প্রকাশিত গল্প সংকলন ‘সৌরভ আর বর্ষার গল্প’ (প্রকাশক: সংঘ, ২০১০), ‘মনোবেদনার পথে’ (প্রকাশক: শুদ্ধস্বর, ২০১২) এবং ‘গহ্বর’ (প্রকাশক: মিজান পাবলিশার্স, ২০১৩)।