শার্ল বোদলেয়রের প্রবন্ধ 'তরুণ সাহিত্যিকদের প্রতি উপদেশ'
শার্ল বোদলেয়র, বুধবার, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১২


এই লেখাটি প্রথম পড়েছিলাম অমৃতলোকের একটি সংখ্যায়। ভাষাবদল করেছিলেম তরুণ মুখোপাধ্যায়। পরে 'শার্ল বোদলেয়ারের গদ্য' নামের একটা বইয়ে এই প্রবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বইটাতে প্রায় অনেকগুলা প্রবন্ধ অর্ন্তভুক্ত হয়েছিল বোদলেয়রের। বলা বাহুল্য সব প্রবন্ধেরই অনুবাদক ছিলেন তরুণ মুখোপাধ্যায়। লেখাটি অন্যরকম বিশেষ করে তরুণ লেখকদের অনেক চিন্তার খোরাক জোগায়। সেই স্বার্থেই লেখাটা এখানে পুন:প্রকাশ করা হল। যেহেতু তরুণ মুখোপাধ্যায়ের সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় আমাদের জানা নাই, ফলে মার্জনা চেয়ে নেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও নাই।


যে নীতিগুলি আপনারা পড়বেন সে গুলি হল অভিজ্ঞতার ফল, অভিজ্ঞতা বলতেই বোঝায় কতকগুলি ভুলের সমষ্টি। প্রত্যেকেই তা করেছেন-অন্তত একটু-আধটু ভুল সবাই করেছেন-মনে হয় যে আমার অভিজ্ঞতা প্রত্যেকের অভিজ্ঞতার দ্বারাই প্রমাণিত হবে।
ফলে এই নীতিগুলির দাবি হল শুধুমাত্র পথ নির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয়তা হিসাবে বলা যায় সৎ ও শিশুসুলভ ভদ্রতা। এছাড়া এগুলির অন্য কোনো দাবি নাই। - অত্যন্ত ব্যবহার্য । মনে করুন একজন সহৃদয় ও বুদ্ধিমান ভাবেন-এর লেখা ভদ্রতার আইন, একটি মায়ের কন্যাকে প্রয়োজনীয়ভাবে সাজগোজ করবার শিক্ষাদান।-এমনি মন নিয়ে ভ্রাতৃত্বের কোমলতাসহ এই নীতিগুলো তরুণ সাহিত্যিকদের কাছে উৎসর্গ করছি।

১.প্রাথমিক সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যঃ

একজন তরুণ সহকর্মী সর্ম্পকে কথা বলার সময়ে তরুণ সাহিত্যিকেরা ঈর্ষামিশ্রিত কন্ঠে বলেন 'সত্যিই সুন্দর এই প্রথম আত্মপ্রকাশ ওটাতে ও গর্বিত সুখ পেয়েছে'।
তাঁরা ভেবে দেখেন না যে সর্বদাই প্রথম আত্মপ্রকাশের পেছনে থাকে অন্তত কুড়িটি প্রথম আত্মপ্রকাশ ও তাদের সমষ্টিগত ফল, সেগুলি তাঁরা জানেন না।
আমি জানি না যে খ্যতির ক্ষেত্রে কোন দিন কোনো বজ্রঘোষণা হয়েছিল কি না। আমি বরং বিশ্বাস করি যে সাফল্য হল, লেখকের ক্ষমতা অনুযায়ী, পূর্ণ সাফল্যগুলির গাণিতিক ও জ্যামিতিক ফল, যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না। সেখানে আছে অণুগুলির ধীর সমন্বয়, কিন্তু অলৌকিক ও স্বতঃস্ফুর্ত কখনই নয়।
যারা বলেনঃ আমার কপাল মন্দ, তাঁরা হলেন সেই সব লোক যারা এখনও যথেষ্ট সফল হন নাই এবং যারা তাকে অস্বীকার করেন।
আমি সেই সব লক্ষ লক্ষ পারিপার্শ্বিক অবস্থায় বিশ্বাসী যেগুলি মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে ঘিরে থাকে এবং যে গুলি নিজেরাই তাদের বৈধ কারণ, এগুলি হল একটি বৃত্ত যার মধ্যে ইচ্ছাশক্তি আবদ্ধ; কিন্তু বৃত্তটি জঙ্গম,জীবন্ত,ঘুর্ণমান এবং প্রতিদিন, প্রতিমুহুর্ত তার বৃত্ত ও কেন্দ্রটি পরিবর্তিত হয়। এমনি ভাবে, তারই দ্বারা পরিচালিত হয়ে তার মধ্যে বদ্ধ মানুষের ইচ্ছাশক্তিগুলিও প্রতি মুহুর্তে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল কর্মগুলিতেও পরিবর্তন ঘটায়, এবং এটাই স্বাধীনতা। কাছ থেকে দেখলে স্বাধীনতা ও নিয়তি হল বিসদৃশ কিন্তু দূর থেকে দেখলে এ দুটি একই ইচ্ছাশক্তি। ফলে দূর্ভাগ্য বলে কিছু নাই। আপনার ভাগ্য যদি মন্দ হয় তার মানে আপনার মধ্যে কোন কিছুর অভাব আছে।এই কোন কিছুটি যে কি সেটি জানুন এবং নিকটবর্তী ইচ্ছাশক্তিগুলির কর্মগুলিকে অনুধাবন করুন যাতে আরও সহজে এই বৃত্তটিকে সরাতে পারেন।
হাজার উদাহরনের মধ্যে একটি উদাহরন দেওয়া যাক,
যাদের আমি ভালবাসি ও শ্রদ্ধা করি তাদের মধ্যে অনেকেই কর্মরত ধাধা রচনাকার ইউজেনস্যুয়ে ও ফেভাল এর বাস্তবিক জনপ্রিয়তায় ক্রুদ্ধ হন, কিন্তু তা যত নগণ্যই হোক না কেন, তাদের প্রতিভা কমে যায় না এবং আমার বন্ধুদের ক্রোধ স্থায়ী হয় না, বরং কমে যায়- কারণ তাতে সবচেয়ে কম দামী ব্যাপারে সময় নষ্ট হয়, প্রশ্নটি এই নয় যে হৃদয়ের সাহিত্য বা তার রুপ প্রচলিত সাহিত্যর চেয়ে ভালো বা মন্দ। অন্তত আমার ক্ষেত্রে এটি সত্য। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত সাহিত্যের যে রুপটির প্রচলন আপনি করতে চাইছেন তার মধ্যে ইউজেনস্যুয়ের নিজস্ব রুপটির মধ্যে যে দক্ষতা আছে সেই দক্ষতা আপনার রুপটির মধ্যে আরোপ করতে পারছেন ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার সাহিত্যের রুপটি অর্ধসত্য ছাড়া কিছুই নয়। নতুন পদ্ধতিগুলির দ্বারা সমতুল্য আর্কষণীয়তা জাগান। বিপরীত দিক থেকে সমতুল্য ও অধিকতর ক্ষমতার অধিকারী হোন। এটিকে সমঘন করবার জন্য উদ্যমকে দুইগুণ তিনগুণ চতুর্গুণ করুন, দেখবেন যে আপনি বুর্জোয়াদের নিন্দা আর করছেন না, কারণ বুর্জোয়ারা আপনার দলে এসে গেছে। ততক্ষণ পর্যন্ত জয়ের প্রতিজ্ঞা। কারণ?-কারণ ক্ষমতার চেয়ে সত্য আর কিছুই নয়। এটিই হল অন্তিম বিচার।


২.পারিশ্রমিক সম্পর্কেঃ

বাড়িটা যেমনই হোক, সর্বপ্রথম তা হল- তার সৌন্দর্যর প্রশ্নেরও আগে এত মিটার উচু ও এত মিটার চওড়া।- তেমনি, সবচেয়ে তুচ্ছ বস্তুর সাহিত্যও-প্রথমত হল কলাম ভরাট করা এবং সাহিত্যের রচয়িতার লাভ শুধুমাত্র নামেই হবে না, সর্বপ্রথম, তাকে বিক্রি করতে হবে।
অনেক তরুণ আছেন যারা বলেনঃ 'এত কম দাম,তাহলে এত খাটব কেন'? তারা সর্বশ্রেষ্ঠ কাজটি দিতে পারতেন এবং সেক্ষেত্রে তাঁরা শুধু বাস্তবিক প্রয়োজনীয়তার দ্বারা, প্রকৃতির নিয়ম অনুসারেই প্রতারিত হতেন, তারা নিজেদেরই প্রতারিত করছেন,-ভালো কাজটির জন্য কম পারিশ্রমিক পেলেও তার দ্বারা তারা সম্মান পেতে পারতেন। অন্য ক্ষেত্রে কম পারিশ্রমিক পেয়ে তারা নিজেদের অপমান করলেন। এই ব্যাপারে আমি যা বলতে পারি তাকে এক কথায় একটি সর্বোচ্চ নীতিবাক্যের আকারে বলে সেটিকে নিয়ে চিন্তা করবার জন্য আমি এটিকে সমস্ত দার্শনিক, ঐতিহাসিক ও ব্যবসায়ীদের দরবারে পেশ করছি শুধুমাত্র সুন্দর মনোভাবের দ্বারা লোকে ধনী হতে পারে।
যারা বলেন 'এত কমের জন্য এত খেটে কি হবে' তারা হলেন সেই সব লেখক যারা বিখ্যাত হবার পর তাদের বই ফর্মাপ্রতি দুশো ফ্রঁ দরে বেচতে চান, প্রত্যাখাত হয়ে, পরের দিন একশ ফ্রঁ ছাড় দিতে রাজি হন।
তিনিই হলেন স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন লোক যিনি বলেন ' বিশ্বাস করি যে এটির দাম এত হওয়া উচিৎ কারণ আমি প্রতিভাবান, কিন্তু কিছু ত্যাগ করতে হয়, তা আমি করব আপনাদের দ্বারা প্রকাশিত হবার জন্য'।

৩.নম্রতা ও অনম্রতা সম্পর্কেঃ

প্রেমের মতোই সাহিত্যেও নম্রতা হল অনিচ্ছাকৃত। তৎসত্ত্বেও এটিকে পরীক্ষা করবার প্রয়োজনীয়তা আছে এবং সেখানে যুক্তিই শেষ কথা। সৎ নম্রতা অত্যন্ত সুন্দর,কারণ তা একের মধ্যে দুই-অসৎ নম্রতা অসহ্য কারণ তা শুধু একটির দ্বারা সৃষ্ট, ঘৃণার চেয়ে ভালো, প্রাথমিক উদাসিন্য ছাড়া, প্রাথমিক ভাবে আসে প্রতারণা ও কষ্টকর মোহমুক্তি। এরই ফলে যুক্তি ও মানসিকতার মৌলিক যোগসুত্রের ভিত্তিতে সৃষ্ট বন্ধুত্বকে আমি স্বীকার ও শ্রদ্ধা করি। তা হল প্রকৃতির প্রকাশের একটি স্বাস্থ্যকর অঙ্গ, সেই পবিত্র উক্তিটির অনেকগুলি প্রয়োগের মধ্যে একটি প্রয়োগঃ সঙ্ঘবদ্ধতা শক্তির উৎস।
একই সারল্য ও অকপটতার আইনের দ্বারাই নম্রতাও পরিচালিত হওয়া উচিৎ। অথচ এমন কিছু লোক আছেন যারা উল্টোভাবে শ্রদ্ধার মতই তার স্থানে ঘৃণা রচনা করেন। এটা খুবই অবিচক্ষণতা, এর ফলে নিজেরই শত্রু সৃষ্টি হয়। যার প্রতি নিক্ষেপ করা হয়েছে সেই গুলিটা যদি প্রতিপক্ষের গায়ে আচড়ও না দিতে পারে তা হলে তা অন্তত তার ডাইনে না বায়ে দ্বন্ধযুদ্ধের সাক্ষীদের গায়ে লাগাতে পারে।
একদিন তলোয়ার খেলার ক্লাশে একজন উত্তমর্ণ আমাকে বিরক্ত করতে এসেছিল। আমি তলোয়ার নিয়ে তার পেছনে তাড়া করলাম। যখন ফিরে এলাম তখন অসুরের মত বলবান শিক্ষক যিনি আমায় ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারতেন কিন্তু অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের লোক, তিনি আমায় বললেন; 'অনম্রতাকে আপনি কি বেহিসাবী খরচা করেন! একজন কবি! দার্শনিক! ছিঃ!' -দুটো আক্রমণ করবার সময় আমি খোয়ালাম,হাপিয়ে পড়েছিলাম,লজ্জিত এবং তার ওপরে একজন লোকের দ্বারা ঘৃণিত,-উত্তমর্ণের কোন ক্ষতিই আমি করতে পারি নাই।
বস্তুত, ঘৃণা হল একটি মহার্ঘ মদ, বুর্জোয়াদের সমস্ত বিষের চেয়ে দামী-কারণ তা তৈরী হয়, আমাদের রক্ত, স্বাস্থ্য, নিদ্রা এবং আমাদের প্রেমের দুই তৃতীয়াংশ দিয়ে। এর সম্পর্কে কৃপণ হতে হবে।

৪. কঠোর সমালোচনা সম্পর্কেঃ

কেবল মাত্র ভূলের প্রতিভুর বিরুদ্ধেই কঠোর সমালোচনা করা উচিৎ। আপনি যাদ ক্ষমতাবান হন, তা হলে শুধু ক্ষমতাবান লোককে আক্রমণ করলেই আপনি হারবেন; যদি কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে আপনি ভিন্নমত পোষণ করেন তাহলে বিশেষ ক্ষেত্রে অন্যত্র সে আপনার দলে থাকবে।
কঠোর সমালোচনার দুটো পথঃ বাঁকা পথ,ও সবচেয়ে ছোট পথ যেটা হল সোজা পথ। জুল-জানিন-এর লেখাগুলিতে বাঁকা পথের প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়। বাঁকা পথ পাঠককে মজা দেয়, কিন্তু শিক্ষা দেয় না। আজকাল কিছু কিছু ইংরাজ সমালোচক সোজা পথটি সফলভাবে ব্যবহার করছেন; পারিতে তা পরিত্যক্ত হয়েছে; এমন কি শ্রী গ্রনিয়েদ কালাজাক-ও তার কথা ভূলে গেছেন বলে মনে হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে, এইভাবে বলা হয় 'শ্রী ক....হলেন একজন অসৎ লোক,তার ওপর তিনি বোকা; এটাই আমার প্রতিপাদ্য'- এবং এটি প্রমাণ করবার জন্য, প্রথমত, দ্বিতীয়ত, তৃতীয়ত,- ইত্যাদি....,যাঁদের ক্ষমতা আছে এবং যাঁরা যুক্তিতে বিশ্বাসী তাঁদের এই পথটি নিতেই আমি বলব। লক্ষ্যভ্রষ্ট কঠোর সমালেচনা হল একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা, তাহল একটি তীর যা তীরন্দাজের দিকে ফিরে আসে বা অন্তত ধনুক থেকে বেরোবার সময় আপনার হাতের ক্ষতি করে, তা হল একটি গুলি যা ছিটকে এসে আপনাকেই বধ করতে পারে।

৫. রচনার পদ্ধতিঃ

আজকাল প্রচুর লিখতে হয়- ফলত তাড়াতাড়ি এগোতে হবে- তার জন্য ধীরে-ত্বরা করতে হবে- প্রতিটি তীর যেন লক্ষ্যে পৌঁছয়, এবং একটা আঁচড়ও যেন অপ্রেয়োজনীয় না হয়।
তাড়াতাড়ি লিখতে হলে অনেক ভাবতে হয়,-বস্তুটিকে সবর্ত্র বয়ে বেড়াতে হবে, বেড়ানোর সময়, স্নানের সময়, রেস্টুরেন্টে এবং এমনকি রক্ষিতার বাড়িতেও তাকে নিয়ে যেতে হবে। ইউজেন দলাক্রোয়া একদিন আমায় বলেছিলেনঃ 'শিল্প হল এমন একটি অপসৃয়মান ও কল্পিত আদর্শ যে কাজের যন্ত্রগুলি কখনই যথেষ্ট সম্পুর্ণ নয় এবং উপায়গুলিও যথেস্ট দ্রুত নয়।' সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একই কথা;- ফলত কাটাকুটিতে আমি বিশ্বাস করিনা; তা চিন্তার আয়নাকে আন্দোলিত করে।
কেউ কেউ, সবচেয়ে বিশিষ্ট ও সচেতনদের মধ্যে- যথা এদুয়ার উরলিয়াক- গোড়ায় কাগজটি ভরিয়ে দেন; তাঁরা একে বলেন পট ভরানো। এই জটিল কাজটির লক্ষ্য হল, কোন কিছু যাতে না হারায়। তারপর কপি করবার সময় তারা এটাকে ছাটেন ও তার থেকে বাদ দেন। ফলটি যত ভালই হোক না কেন, এটা হল ক্ষমতা ও সময়ের অপব্যবহার। কাগজ ভরাট করবার মানে এই নয় যে কাগজে ঘণ করে রং চাপাতে হবে, তার মানে খুব হাল্কা ভাবে রং দিতে হবে, তা হল হাল্কা ও স্বচ্ছ ছোপ ধরানো;-কাগজটি ভরাট করতে হবে মাথার মধ্যে- সেই মুহুর্তে যখন শিরোনামটি লেখার জন্য কলম ধরবেন।
বলা হয় যে বালজাক তার খাতা ও প্রুফটিকে অদ্ভুত ও এলোমেলো ভাবে ভরান। তখন থেকেই উপন্যাসটি কতকগুলি উপাদানের একটি বিশেষ পরম্পরার মধ্য দিয়ে যায়, যেখানে কেবলমাত্র বাক্যগুলির ঐক্যই নয় রচনাটির ঐক্যও জড়িয়ে থাকে। নিঃসংশয়ভাবে পদ্ধতিটি খারাপ কারণ তা প্রায়শই শৈলীর মধ্যে এক ধরণের অনির্দিষ্ট অনচ্ছতা, চাপ ও অপক্কতা আরোপ করে-এই মহান গল্পকারের একমাত্র দোষ।

৬.প্রাত্যহিক কাজ ও প্রেরণা প্রসঙ্গেঃ

উম্মত্ততা আর প্রেরণার ভগিনী নয়ঃ আমরা অবৈধ আত্মীয়তাকে ভেঙ্গেছি। কতকগুলি সুন্দর চরিত্রের দ্রুত দৌর্বল্য এবং ক্ষয় এই উৎকট বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়।
অত্যন্ত সারবান ও নিয়মিত খাদ্যই হল উর্বর লেখকদের একমাত্র প্রয়োজনীয় বস্তু। প্রেরণা নিশ্চিতভাবে প্রাত্যহিক কর্মের ভগিনী। এই দুই বৈপরীত্য একে অপরকে ততটাই বাধা দেয় যতটা প্রকৃতির মধ্যে সমস্ত বৈপরীত্যগুলি বিসদৃশ হয়। ক্ষুধা হজম ও নিদ্রার বশবর্তী হল প্রেরণা। নিশ্চিতভাবে বুদ্ধির মধ্যে একটি স্বর্গীয় যন্ত্র আছে যার সম্পর্কে লজ্জিত হওয়া উচিৎ নয় বরং ডাক্তারেরা যেমন ভাবে দেহযন্ত্রের জ্ঞানকে কাজে লাগান তেমনি ভাবেই এটির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবহার করতে হবে। কেউ যদি আগামীকালের রচনা সম্পর্কিত চিন্তার মধ্যে ডুবে থাকতে চান তাহলে প্রাত্যহিক কর্মপ্রেরণা কাজে লাগবে,- পাঠযোগ্য হস্তাক্ষর চিন্তাকে আলোকিত করবার ভীষণ কাজে লাগে এবং শান্ত ও বলবান চিন্তা পাঠযোগ্যভাবে লেখার অত্যন্ত কাজে লাগে; কারণ অস্পষ্ট হস্তাক্ষরের দিন চলে গেছে।

৭.কবিতা সম্পর্কেঃ

যারা কবিতার কাছে আত্মসর্মপণ করেছেন বা সফলভাবে করেছেন তাদের আমি বলব যে তারা যেন কখনও এটিকে ত্যাগ না করেন। কবিতা হল একটা শিল্প যা সবচেয়ে বেশি টাকা আনে, কিন্তু এটি হল এক ধরণের লগ্নী যার সুদ অনেক দিন পরে পাওয়া যায়, ফলত অঙ্কটা হয় মোটা। ঈর্ষাকাতরদের চ্যালেঞ্জ করছি, তারা দেখাক যে ভাল কবিতা কোন প্রকাশককে দেউলে করেছে।
মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায় যে কবিতা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর বুদ্ধির মধ্যে এমন এমন এক বিভাজক রেখা টানে যে সবচেয়ে বুর্জোয়া পাঠকও এর স্বেচ্ছাচারী প্রভাবকে এড়াতে পারে না। যারা প্রায়শই তেয়োফিল গোতিয়ের ধারাবাহিক সাধারণ রচনাগুলি পড়েন শুধুমাত্র এই কারনণ যে তিনি কমেদি দ লা মর রচনা করেছেন বলে। এ কথা নিশ্চিত যে তার এই রচনাটির সম্পূর্ণ সৌর্ন্দয অনুভব করতে পারেন না কিন্তু তারা জানেন যে তিনি কবি।
অবশ্য এতে আর্শ্চযরই বা কি আছে। যে কোনো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী লোক দু'দিন না খেয়ে থাকতে পারবেন কিন্তু কবিতা ছাড়া কখনই নয়। যে শিল্প সবচেয়ে রাজকীয় প্রয়োজন মেটায় তা সর্বদাই সবচেয়ে বেশি সম্মান পায়।

৮.পাওনাদার প্রসঙ্গেঃ

‘দেসর্দ্র এ জেনি’ (বিশৃঙ্খলতা ও প্রতিভা) কমেডির কথা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। বিশৃঙ্খলতা কখনো কখনো প্রতিভার সঙ্গে থাকে। তার মানে হলে যে প্রতিভাটি অত্যন্ত প্রখর, দুর্ভাগ্যবশতঃ অনেক যুবকের কাছেই এই উপরোক্ত নামটির অর্থ দাড়ায় যে বিশৃঙ্খলতা একটি দুর্ঘটনা নয় বরং তা একটি প্রয়োজনীয়তা। গ্যেটের পাওনাদার ছিলো কিনা এ ব্যাপারে আমার প্রচুর সন্দেহ আছে। বিশৃঙ্খল হোফমান নিজেও অনেক বেশি প্রয়োজনের তাগিদে, চিরকাল পাওনাদারদের থেকে মুক্তি আশা করতেন এবং তিনি তখনই মারা গেলেন যখন আরও স্বচ্ছল জীবন তার প্রতিভার আরও উজ্জ্বল উৎসারণকে সাহায্য করতে পারত। কখনই পাওনাদার জোটাবেন না। যদি চান ত' পাওনাদার থাকার ভান করতে পারেন, এর বেশি কিছু বলার নাই।

৯.রক্ষিতা সম্পর্কেঃ

যে বৈপরীত্যের আইন মানসিক ও দৈহিক কাঠামোকে শাসন করে সেটি নিরীক্ষণ যদি করতে চাই তাহলে লেখকদের পক্ষে বিপদজনক মহিলাদের এই ভাবে সাজাতে আমি বাধ্য, সতী নারী, আঁতে মহিলা ও অভিনেত্রী।সতী নারী কারণ তারা অবশ্যম্ভাবী ভাবে দু’জন পুরুষের অধিকারে এবং কবিদের সার্বভৌম হৃদয়ের পক্ষে তার অতি সাধারণ ধাতুতে সৃষ্ট; আঁতে মহিলা, কারণ তারা ছেলে হতে হতে মেয়ে হয়েছে, অভিনেত্রী, কারণ তারা সাহিত্যের সঙ্গে মাখামাখি করেছে কিন্তু তার গ্রাম্য ভাষায় কথা বলে থাকে, কারণ তারা নারী শব্দের পরিপূর্ণ অর্থ অনুযায়ী নারী নয়। প্রেমের চেয়ে দর্শক তার কাছে মর্হাঘতর, এই জন্য।
ভাবতে পারেন যে বউকে ভালবাসে এমন একজন কবি বউকে নকল চরিত্রে অভিনয় করতে দেখতে পারবে? আমার মনে হয় যে সে নিশ্চয়ই থিয়েটারে আগুন লাগিয়ে দেবে।
ভেবে দেখেছেন যে স্ত্রীর জন্য সে একটা ভুমিকা তৈরী করতে বাধ্য থাকবে যে স্ত্রীর প্রতিভা নেই?
এবং এই সত্ত্বাটি তার সবচেয়ে প্রিয়জনকে যে দর্শক এত কষ্ট দিয়েছে তাদের সামনে এপিগ্রামগুলিকে প্রকাশ করতে ঘাম ছোটাবে এই সত্ত্বা,যাকে প্রাচ্যদেশিয়রা পারীতে আইন পড়তে আমার আগে তালা বন্ধ করে রেখে আসে? এর কারণ হল প্রত্যেক সৎ সাহিত্যিকেরই সাহিত্য সম্পর্কে জুগুপ্সা হয় এবং আমি এটা মেনে নিই মুক্ত ও গর্বিত হৃদয়, ক্লান্ত মন, সপ্তম দিনে তাদের বিশ্রামের প্রয়োজন কেবল মাত্র দু’ধরণের নারীই তাদের পক্ষে উপযুক্তঃ বেশ্যা বা বোকা মেয়ে।প্রেম বা হেঁশেল ভাইগণ! এর কারণটা কি খুলে বলতে হবে?