ফেরদৌস নাহারের কবিতা ভাবনা ও ৫টি কবিতা
ফে র দৌ স না হা র, মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১২


ফেরদৌস নাহারের জন্ম, বেড়ে ওঠা সবই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে। তবু নির্দিষ্ট কোনো জেলা নয় পুরো দেশটাকেই বাড়ি মনে করেন। পথের নেশা তাকে করেছে ঘরছাড়া, ঘুরতে ঘুরতে এখন আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়ে, কানাডায়। সেখানে জীবন যাপনের পাশাপাশি জীবন উৎযাপন করেন কবিতা এবং লেখালিখির খরস্রোতা নদীতে বৈঠা বেয়ে। কাব্য-অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রটিও কম নয়। সরাসরি জড়িত ছিলেন বাংলাদেশের নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী কাব্য-আন্দোলনের সঙ্গে। এপর্যন্ত প্রকাশিত ৯টি কবিতা ও ২টি প্রবন্ধের মৌলিক বই এবং বাংলাদেশ ও ভারত থেকে প্রকাশিত ৬টি যৌথ কবিতা সংকলন। কবিতার পাশাপাশি লিখছেন নানারকমের গদ্য, অনুবাদ ও গান,আঁকছেন ছবি। প্রিয় বিষয় মানুষ এবং প্রকৃতি। প্রকৃতির মাঝে সবচেয়ে প্রিয় সমুদ্র। প্রিয় রঙ সাদা এবং কালো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর। বর্তমানে কানাডায় বাস করলেও বিশ্বাস করেন-এশুধু অবস্থান মাত্র। হয়তো যেকোনো একদিন বোহেমিয়ান বাতাসে পাল তুলে দেবেন আবারো কিংবা ফিরবেন ঘরে। চূড়ান্ত ভালোবাসা স্বদেশ ও কবিতা।
প্রকাশিত বইঃ
[কবিতা]
ছিঁড়ে যাই বিংশতি বন্ধন(চর্যাপদ ১৯৮৬),
সময় ভেঙ্গেছে সংশয় (নিখিল ১৯৮৭),
উলঙ্গ সেনাপতি অক্টোপাস প্রেম (নসাস ১৯৮৮),
দেহঘর রক্তপাখি (চর্যাপদ ১৯৯৩),
সমুদ্রে যাবো অবিচল এলোমেলো (বিশাকা ১৯৯৬),
বর্ষার দুয়েন্দে (শ্রাবণ ২০০১),
উদ্ধত আয়ু (অন্যপ্রকাশ ২০০৯),
বৃষ্টির কোনো বিদেশ নেই (ভাষাচিত্র ২০০৯),
পান করি জগৎ তরল (অ্যাডর্ন ২০১০)।
[প্রবন্ধ]
কবিতার নিজস্ব প্রহর (প্রত্ন ২০০২),
পশ্চিমে হেলান দেয়া গদ্য (আড়িয়াল ২০১২)।

ইমেইল: ferdousnahar@yahoo.com এবং ferdousnahar@gmail.com



কবিতা ভাবনা

ভাবনা আমার কোথা থেকে যে আসে! আর কবিতা নিয়ে কী আর বলবো, সব সময় কষ্ট দিয়েছে, দিচ্ছে, দেবে... কষ্ট-প্রণয়ে জেগে থাকতেই ভাল লাগছে। মহৎ কিছু করে ফেলার জন্যে তো কবিতা লিখি না, ওকে লিখি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। কত শত কথা, কত যে নগ্নতা, কত দংশন, কত না চিৎকার সব গছিয়ে দিচ্ছি ওর বুকে। তো- সে আমাকে খুঁড়ে খাবে না তো কে খাবে? আমি রাক্ষসের বত্রিশ পাটি দাঁত রথের মেলায় বেঁচতে এসে কবিতাকে মূদ্রা করি, মনে মনে বলে উঠি, বেশ করেছি...! পোড়া মাটির তত্ত্ব-তালাশে কবিতার দেহ ভরে শতাব্দীর সমান যজ্ঞানল, দাউ দাউ পুড়ছে সে সেইসাথে পুনঃপুন পুড়ছি পোড়া মাটির আমি। আমার মাঝে আমার আত্মহত্যা কিংবা বেঁচে থাকা যুগপৎ কবিতার প্যারাস্যুট নিয়ে দিব্যি নেমে পড়ছে ভবলীলার মাঠে, আর নেমেই দাঁত বের করে হাসছে...বলছে, দেখ-ভাবনার অনিবার্য উন্মাদ আমি, প্রত্ন-প্রণয়ের রক্তাক্ত রণাঙ্গন, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া কিংবা যা কিছু ভাবনা সব আমি...অধিশ্বর, ক্ষুদ্র, বৃহৎ সব সব সব, আমিই চরম!


ফেরদৌস নাহারের ৫ টি কবিতা

মদমন্ত্র

মন মদ মন্ত্র
শিখেছি নদী হয়ে
সমুদ্র দিব্যি দিয়ে
দরজার ওপারে
অধিকার হাঁটে
সুঠাম আগুনের
পোশাক গায়ে।

ইন্ধন জুগিয়েছে
জ্যোৎস্না-হাওয়া
বনবাস শেষে ফেরা
সুমিষ্ট নিদ্রার সুর
মন টানা গানে
মদের মাতাল তালে
মন্ত্রের যজ্ঞানলে
ধরে রাখে।
কাকে?
তোমাকে না আমাকে?
না আমাদের চিৎকার
আনগ্ন ঘুরে মরে
মগ্ন অনুতাপে।



আমার ঘুড়ি

আমাদের ইতিহাস কে রেখেছে মনে?
কোনো এক বৈশাখের বিজন উপবনে
ঘরের দুয়ার থেকে যে ঘুড়ি উড়িয়েছিলাম
তার সুতো পড়ে আছে চৌকাঠের পাশে।

নীল প্রীতি বরাবার টেনে গেছে বেদনার আঁক
জীবন দেয়ালে তাই নীলরঙ ছবি একাকার।
কাল ভোরে মেঘ ছিল,ঝড় ছিল,ছিল বজ্রপাত
ছিল আরো তার সাথে প্রেমময় দিনের আকাল।

আমার কাছে আছে একটি বিষণ্ন সুন্দর ব্যাধি
যে ব্যাধির চিকিৎসা নাই,আছে কেবল দহন
আর তাই ঘুড়িরও অসুখ হয়,সেও উড়ে যায়
আকাশের পানশালায় মেঘমদ পান করে নিতে।

রক্তজবার মতো টকটকে আগুন আমাদের
হাত ধরে নিয়ে যায় পানশালার বুকের ভেতর।



চরকা

নাম ধাম ভুলে গেলে খুব কি ভালো হয়?
আমি যেখানেই যাই না কেন
আমার আগে যায় আমার পরিচয়।

মধ্যাহ্নে চরকা কাটে তিনটি উন্মাদ
একজন আমার স্বামী, দু’জন তাহার সৎ ভাই
কিছু একটা ঢাকতে বুনন করছে তারা বস্ত্র
রাখ-ঢাক,ঢাক গুড়-গুড় স্বভাবে অভিষিক্ত
চরকা চলছে,আমি গান গাই
যে গান কিছুটা চেনা,তার সুর গরম জলে ধুয়ে
গলায় বসিয়ে বসিয়ে চরকার তালে গেয়ে যাই,

...“নিতুই পাহাড় ভেঙ্গে তোমারে ডাকিছে কে যে
যে বিদেশী বন্ধু আমার চলে গেছে দূরদেশে
তাহারে খবর দাও,ভুলভ্রান্তি ক্ষেমা দাও
ও-বন্ধু আইসো ফিরে,ঘুঘুপাখি ডাকিছে তোমারে”...

গান শেষে দম নিয়ে আবারো শুরু করি একই গান
হলদে বাতাসে ঘোরে ফড়িঙের চলন্ত পাখা,ধুলোমাখা
হলো না তা, ভাগ্য মন্দ হলে হয় যা-হলো তা
ঢু ঢু আঁকাবাঁকা।




চক্র কাটে পায়ে পায়ে

কবে লিখেছিলাম মনে পড়ে না
কবে লিখেছিলাম জন্মকালের সবকথা মনে পড়ে না
জন্ম মুছে যাচ্ছে আর ভালোবেসে পথে নেমেছে যারা
তাদের কথা কী আর লিখব
উদভ্রান্ত তারা সব ঘোর পায়ে চক্র কাটে।

মাথার আনাচে কানাচে বিষ্যুদবার রাত
ঘুরঘুর ঘুরে যায় নিঃশব্দ হাহাকার
মনে পড়ে ট্রেনে ট্রেনে এলেবেলে স্টেশনে নেমে পড়া
প্ল্যাটফর্মে হকার আর পত্রিকা হাতে সুব্রতদার ডাক -
এ-ই তোমরা চা খেলে নেমে পড়!
সেবার শীতযাত্রা ছিল খুব জমানো

পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি, ডেকেছিলে অনেকবার
আর আমি প্রতিবার চমকে ফিরে তাকিয়েছি!
ভ্রম শুধু ভ্রম, বাতাসে গেঁথে গেছে বিরহী উপকথা
তারপর কতবার পাহাড়ে গিয়ে খুঁজেছি সেই ডাক
পারলে অচেনা মানুষকে ধরে অনুরোধ করে বসি
অন্তত একবার সে-ইভাবে নাম ধরে ডাকবার...

জন্মজয়ের পথে পথে ছড়ানো কিছু ডাক, কিছু হারানো বিজ্ঞপ্তি


পাহাড়ের ভ্রাম্যমান পদচিহ্ন

যখন আমার উঁচুমান নিচুমান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ঘোর বৈঠক বসেছে
তখন আল্পস পর্বতের বুনোফুল হত্যাকারীদের খুঁজে বেড়াচ্ছি।
সে এক সময় গেছে, পাহাড়ের ভ্রাম্যমান পদচিহ্নে এত কিছু জুড়ে ছিল যে
প্রায়শ ভুল হতো সঠিক উপাদান খুঁজে পেতে। একবার তো ভুল করে
একুশ কিলোমিটার পথ পারি দিয়ে আবার ফিরে আসতে হয়েছিল
এভাবে অনেক অতিক্রম বুঝাল হত্যাকারীদের খুঁজে ফেরা মুখের কথা নয়।

তার চেয়ে অনেক সহজ হত্যা করা
যেভাবে কেউ কেউ করেছিল আর কেউ মৃত্যুবরণ করেছিল হাসতে হাসতে
যারা ঘোর-অঘোর বিবেচনায় এখনো কাঙ্গাল তাদের কাছে এসব মৃত্যু
মূল্যহীন না অমূল্য এবিষয়টিও ভাবনায় আসেনি কখনো।
তাহলে কি বোকা ছিলাম? পুবাল হাওয়ায় হাওয়ায় আল্পসের বুনোফুল
হত্যাকারীদের খুঁজে বেড়ানোর পরিকল্পনা কি নিছক বোকামি?


_______________