ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র
হাবিবুর রহমান স্বপন, শুক্রবার, জানুয়ারি ২৫, ২০১৩



স্বল্প পরিসরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে যাওয়া তিনজন ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্র সম্পর্কে আলোচনা করা কঠিন। তিন জনই ছিলেন আপন আলোতে উদ্ভাসিত। বাংলা সাহিত্যকে তাঁরা অনেক দিয়েছেন। দিয়েছেন পথের ঠিকানা।
উপন্যাস মানুষের হৃদয়ের ছবি; মানুষের ধর্ম আছে, সমাজ আছে, রাজনীতি আছে, সচেতন ও অসচেতন আত্মা আছে। উপন্যাসে মানবজীবনের একটি সুদীর্ঘ কাহিনী চিত্রিত হয়ে থাকে। লিখতে হয় গদ্যে। সে কারণেই উপন্যাসের কাহিনীতে বাস্তব জীবনের তুচ্ছ ঘটনাকেও বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কোন একটি কাহিনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কিছুর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া সম্ভব হয়। উপন্যাসের মধ্যে কোন উপাদানটি শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ মনে করেন আখ্যানভাগই মুখ্য; চরিত্রসৃষ্টি ও অন্যান্য উপাদানগুলি অপেক্ষাকৃত গৌণ। আগের দিনের সমালোচকগণ ও গল্পলেখকেরা গল্পকেই প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু আধুনিককালে চরিত্রসৃষ্টিকেই মুখ্য মনে করেন। উপন্যাস ও নাটক সামাজিক জীবনের বাস্তব চিত্র আঁকবে ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। আবার কারও মতামত উপন্যাসের উদ্দেশ্য গল্প বলা নয়, চরিত্রসৃষ্টিও নয়, মতবাদের প্রচারও নয়। সচেতন ও অর্ধচেতন আত্মার উপরে বাহিরের ঘটনা আঘাত করলে যে সকল নিগূঢ় অনুভূতি জাগে, তার অভিব্যক্তিই উপন্যাসের কাজ। পথ ও মতের ভিন্নতা আছে সকল বিষয়ে। এ ক্ষেত্রেও থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। লেখক যে কোন একটি বিশেষ বিষয়ের উপর দৃষ্টি দিতে পারেন; কিন্তু তাঁকে স্মরণ রাখতে হবে যে, মানুষের স্বরূপের অভিব্যক্তিই তাঁর আদর্শ; কোন একটি বিশেষ লক্ষণকে সমগ্র ব্যক্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করলে সেই চিত্র জীবন্ত হবে না। শুধু সমাজবন্ধন, শুধু ধর্ম, শুধু রাষ্ট্রনীতি, শুধু বাহিরের ঘটনা বা শুধু মগ্নচৈতন্য নিয়ে উপন্যাস লিখলে সেটা হবে একপেশে বা একদেশদর্শী। লেখকের রুচি অনুসারে কোন একটি উপাদান প্রধান্য লাভ করতে পারে। কিন্তু তা অন্য সব উপাদানকে সম্পূর্ণ নিষ্প্রভ করলে চলবে না। উপন্যাসের শিল্পপ্রকৃতি অনুধাবন করতে গেলে প্রথমেই আলোচনা করতে হয় ঔপন্যাসিকের অকৃত্রিম জীবনদৃষ্টি।
রবীন্দ্রপূর্ব শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস সম্পর্কে বলা যেতে পারে যে, ক্লাসিক্যাল অর্থে যাকে রোমান্স বলে, সেই রোমান্স-ধর্মকে অবলম্বন করেই তাঁর সমস্ত উপন্যাসগুলি গড়ে উঠেছে। যেখানে সামাজিক মানুষের প্রেমের কথা বা প্রেমের জটিলতার কথা আছে সেখানেও রোমান্স-ধর্মের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি দেখা যায় না। তাছাড়া দু’একটি উপন্যাস ছাড়া সর্বত্রই ক্লাসিক্যাল রোমান্সের ধর্ম অনুযায়ী যুদ্ধবিগ্রহ, শৌর্যবীর্য প্রভৃতির সাহায্যে রোমান্স-ধর্মকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যেখানে যুদ্ধবিগ্রহ প্রভৃতি বাহ্য শৌর্যবীর্যের প্রকাশ নেই, সেখানে চমকপ্রদ ঘটনা বা উপসংহারের সাহায্যে কাহিনীর মধ্যে রোমান্টিকতা আনা হয়েছে।
রবীন্দ্র-পরবর্তী লেখক শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে দেখা যায় যে, সেখানে প্রধানতঃ সামাজিক পটভূমিকায় নিতান্ত ক্ষুদ্র, অবহেলিত অসামাজিক নরনারীর মধ্যে মহত্ব আবিস্কারের চেষ্টা আছে এবং এই চেষ্টার জন্যে কোথাও কোথাও চরিত্রাঙ্কনে কিছু কিছু অবাস্তবতা এবং কাহিনীর মধ্যে অল্পস্বল্প অসম্ভ্যবতাও দেখা যায়। অসামাজিক বা সাধারণের চোখে হেয় মানুষকে অসাধারণ ও মহৎ করবার জন্য শরৎচন্দ্র প্যারাডক্স সৃষ্টি করে উপন্যাস-সাহিত্যে একটি নতুন শিল্প আনার চেষ্টা করেছেন, যদিও সে চেষ্টা কতদূর সার্থক হয়েছে সে বিষয়ে মতভেদ আছে।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে এককথায় বলতে গেলে সর্ব প্রধান যে ‘মূল উপাদান বা প্রধান প্রসঙ্গ’ টি দেখা যায়, সেটা হচ্ছে মানবমনের স্খুল আর সূক্ষè মনোবৃত্তির দ্বন্দ্ব এবং মানবজীবনের বৃহত্তর সমস্যার সমাধান ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। মানবজীবনে প্রেমের সমস্যার মধ্যেও কবি এই বৃহত্তর আদর্শকে অক্ষুন্ন রাখবার চেষ্টা বারবার করেছেন বলে মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের সমাজচিন্তার মধ্যে আধুনিক যুক্তিবাদের সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্য এবং সংস্কারের সমন্বয়-প্রচেষ্টা দেখা যায়।
বাংলা সাহিত্যে প্রথম উপন্যাস কোনটি। প্রাচীন সাহিত্যের বই সমূহ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে তাতে উপন্যাস নেই। উপন্যাস আধুনিক কালের সৃষ্টি। মানুষের গল্প বলার প্রবৃত্তি সনাতন। সে কারণে ধারণা করা হয় হয়তো বা বাংলা সাহিত্যে গল্প লিখিত ছিল। কিন্তু যে কারনেই হোক তা স্থায়িত্ব পায়নি। টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস। পক্ষান্তরে বঙ্কিমচন্দ্রই বাংলাসাহিত্যে উপন্যাসের ¯্রষ্টা এবং তাঁর প্রতিভা এতটাই অসাধারণ যে, তিনি শুধু পথপ্রদর্শনই করেন নাই। তিনি বাংলার প্রথম ঔপন্যাসিক এবং তিনিই বোধকরি সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। তাঁর উপন্যাসে ( দুর্গেশ নন্দিনী ) কাহিনী আছে; চরিত্রসৃষ্টি আছে,Ñ মানবহৃদয়ের গোপন রহস্যের সন্ধানও তিনি তুলে ধরেছেন। যদিও অনেকেই মনে করেন প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এর মধ্যে কাহিনী আছে, সামাজিক চিত্র আছে, বাস্তবতা আছে। কিন্তু এর মধ্যে উপন্যাসের মৌলিক উপাদান নেইÑ মানবহৃদয়ের গোপনতম বিষয় সমূহের চিত্র নেই। উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল কথিত ভাষাকে সাহিত্যের বাহন করবার জন্য এবং এর বিষয় হচ্ছে নীতিশিক্ষা, ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপ। এর মধ্যে কোন সুবিন্যস্ত কাহিনী গড়ে ওঠেনি। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন চিত্র একত্রে গ্রথিত হয়েছে মাত্র; তাদের মধ্যে যে যোগসূত্র রয়েছে তা অকিঞ্চিতকর। আলালের ঘরের দুলাল’এর প্রচুর সীমাবদ্ধতা। সে সীমাবদ্ধতার মূলেও রয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দির স্বদেশের সমাজ ইতিহাসের অষ্টাবক্র অসম্পূর্ণতা। সেটা ছিল সকল দিক দিয়েই জাতীয় অসঙ্গতি। পরবর্তী স্মরণীয় প্রতিভাধর উপন্যাসেও সে অসঙ্গতির পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ নানা প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু এ কথা স্বীকার্য যে মূল-লগ্ন সেই দুর্বল মৃত্তিকার সবটাই দেশজ মৃত্তিকা।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভা এমন অনন্যসাধারণ যে, তিনি শুধু পথপ্রদর্শকই নন, তাঁর রচনায় প্রথম ব্রতির অপূর্ণতা ও ভীরুতার পরিচয় নেই। তাঁর উপন্যাসে কাহিনী আছে, চরিত্রসৃষ্টি আছে,Ñ মানবহৃদয়ের গোপন রহস্যের সন্ধানও তিনি নিয়েছেন। তাঁর উপন্যাসগুলো প্রধানতঃ তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। ‘রাজসিংহ’ সুবৃহৎ ঐতিহাসিক উপন্যাস; ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ও ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে সামাজিক ও গার্হস্থ জীবনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ‘দুর্গেশ নন্দিনী’, ‘কপালকু-লা’, ‘মৃণালিনী’ ইত্যাদির ইতিহাস আছে, পারিবারিক জীবনের চিত্রও আছে; এর পরেও এগুলো ঐতিহাসিক উপন্যাস বা গার্হস্থ জীবনের কাহিনী নয়। কারণ এগুলোর মধ্যে কল্পনার এমন একটা ঐশ্বর্য রয়েছে যা পারিবারিক জীবনের বাস্তবতাকে অতিক্রম করে গেছে। যা ইতিহাসের দাবিকেও সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে নেয়নি। কল্পনার যে এই সমৃদ্ধিÑএটা শুধু এই তৃতীয় শ্রেণীর উপন্যাসেই সীমাবদ্ধ হয়নি; সামাজিক ও ঐতিহাসিক উপন্যাসেও পরিলক্ষিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাসে অতীতকালের যুদ্ধবিগ্রহ বা সামাজিক জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বাস্তবচিত্র দেয়া হয়নি। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস থ্যাকারের ‘হেনরি এসম-্’ জাতীয় উপন্যাস থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর কল্পনা ইতিহাসকে বিচিত্র বর্ণে রঞ্জিত করেছে। যে দেশে জেবউন্নিসা ও মবারক, আয়েশা ও জগৎসিংহ বাস করতো, সেটি বাস্তব জগতের প্রতিচ্ছবি নয়Ñকল্পনার অমরাপুরী। রোহিনীর মৃত্যু, কুন্দনন্দিনীর স্বপ্নদর্শন, নগেন্দ্রনাথ ও সূর্যমুখীর আকস্মিক মিলন Ñ এসব কাহিনীতে দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছতা নেই। এরা অপ্রত্যাশিত, আকস্মিক ও অনন্যসাধারণ। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিটি উপন্যাসই অতিশয় কল্পনা সমৃদ্ধ। তিনি প্রধানতঃ রোমান্স-রচয়িতা। এই রোমান্স কখনও ইতিহাসে, কখনও সামাজিক জীবনের চিত্রে আপনার অপরূপ আলোক সম্পাত করেছে। ‘রোমান্স’ শব্দটি বিলেত থেকে আমদানি। যে সব কাব্য ও উপন্যাসে কল্পনা খুব বেশি প্রাধান্য পায়, যেখানে আখ্যায়িকা বা চরিত্র আমাদের মনে বিস্ময়ের সঞ্চার করে, সেটাই রোমান্স। আর্ট সত্য সুন্দর সৃষ্টি। যা ঘটে নাই সেটাই শিল্পী উদ্ভাবন করেন। অনেক অসম্ভব ব্যাপারও বর্ণনা করেন। বর্ণনাচাতুর্যে তিনি অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলেন। পাঠককে তা বিশ্বাসের পর্যায়ে নিয়ে যান। আবার বস্তুতান্ত্রিক আর্টে কদর্য কাহিনী লেখা হয়, সেটাও প্রকাশের মাধুর্যে সুন্দর হয়ে ওঠে। গণিকাবৃত্তি খারাপ; কিন্তু গৎং.ডধৎৎবহ’ং চৎড়ভভবংংরড়হ নাটক সুন্দর। রোমান্স এবং বস্তুতান্ত্রিক রচনার মধ্যে পার্থক্য এই যে, রোমান্স সত্যকে পায় সুন্দরের সাহায্যে, বস্তুতান্ত্রিক সাহিত্য সুন্দরের অনুসন্ধান করে সত্যের মাধ্যমে।
বঙ্কিমের উপন্যাসে আখ্যায়িকা, চরিত্রসৃষ্টি ও প্রকাশভঙ্গি সবই শ্রেষ্ঠ রোমান্সের পরিচায়ক। রোমান্সের একটি বাহন হচ্ছে অলৌকিক কাহিনী। বঙ্কিমচন্দ্রের রচনায় অলৌকিক ঘটনার অভাব নেই। তাঁর অনেক উপন্যাসেই সাধু সন্ন্যাসী জ্যোতিষীর সন্ধান পাওয়া যায়। কোন কোন স্থানে অলৌকিকতা আতিশয্যে পরিণত হয়েছে; তা পাঠকের অবিশ্বাসকে বিশ্বাসে পরিণত করে তোলে। কিন্তু এটি বাদ দিলেও দেখা যায় যে, যা একবারে সাধারণ, যা বিশেষভাবে মানুষের জীবন কাহিনী, যার অন্তরালে একটি বিরাট শক্তি রয়েছে যার অদৃশ্য অঙ্গুলি-সঙ্কেতে পার্থিব ঘটনা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সেই বিরাট শক্তিকে আমরা চিনি না, তার প্রকাশ অস্পষ্ট। কিন্তু তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই এবং তার নির্দেশ অনতিক্রমণীয়। যুদ্ধের সময় দলনী বেগম যে দুরাবস্থার মধ্যে পড়লো তার কারণ তকীর নৃশংসতা ও বিশ্বাসঘাতকতা। কিন্তু দেখা যায় এটি পূর্ব থেকেই নির্ধারিত এবং নবাব - এর আভাসও পেয়েছিলেন। মবারকের মৃত্যুর অন্তরালে রয়েছে কতকগুলি অচিন্তিতপূর্ব ঘটনার পারম্পর্য। কিন্তু যে জ্যোতিষীকে হাত দেখিয়েছিল, তার কাছে ঘটনার এই অচিন্তিতপূর্ব পারম্পর্য চিহ্নিত হয়েছিল। শ্রী শুনেছিল যে সে প্রিয়প্রাণহন্তী হবে, কিভাবে এই অপকর্মটি তার দ্বারা সংঘটিত হবে সে সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিল না। কিন্তু যে নিয়তি তাকে এই নির্দেশ প্রদান করেছিল তার কাছে কিছুই অজ্ঞাত ছিল না। এই অলৌকিক শক্তির প্রেরণা সর্বাপেক্ষা বেশি প্রবল হয়েছে ‘আনন্দমঠ’ ও ‘দেবী চৌধুরাণীতে। যে সমস্ত উপন্যাসে অপেক্ষাকৃত বাস্তব চিত্র আঁকা হয়েছেÑ যেমন ‘রজনী’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’Ñসেগুলোতেও রোমান্সের এই উপাদান পরিমার্জিত হয়নি। যুগলাঙ্গুরীয়’কে বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই ফলিত জ্যোতিষ বলে অভিহিত করেছেন, ‘রজনী’ ফলিত জ্যোতিষ না হলেও তার মধ্যে সন্ন্যাসী শক্তির যে পরিচয় আছে তা অলৌকিক। ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যে কুন্দনন্দিনীর স্বপ্নে উপন্যাসের সমস্ত কাহিনীর সংক্ষিপ্তসার রয়েছে। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ একান্তভাবে গার্হস্থ চিত্র। এর মধ্যে অলৌকিকের স্থান নেই। তবুও ভ্রমর যখন গোবিন্দলালকে বলেছিল,...“ তোমার আমার আবার সাক্ষাৎ হইবে...আবার আসিবেÑআবার ভ্রমর বলিয়া ডাকিবেÑআমার জন্য কাঁদিবে।” তখন মনে হয় ভবিষ্যতের চিত্র সে দিব্যচক্ষে দেখতে পেয়েছিল। তার এই উক্তি খ-িতার অভিশাপ নয়, মনস্তত্ববিদের বিচার নয়, এটা সত্যদ্রষ্টার ভবিষ্যদ্বাণী, ক্ষণেকের জন্য সে যেন ভবিষ্যতের অন্ধকার আবরণ ভেদ করে তার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পেরেছিল এবং ভবিষ্যৎবাণীকে সার্থক করবার জন্যই সংঘটিত হয়েছিল।
বিষবৃক্ষ বঙ্কিমচন্দ্রের তাৎপর্যপূর্ণ রচনা। তাৎপর্যপূর্ণ বিশেষণটি অনেক সময় বহুল ব্যবহৃত হেতু শ্রুতিকটু। এছাড়াও প্রশ্ন উঠতে পারে কোন শিল্প প্রচেষ্টাই তাৎপর্যপূর্ণ নয়, তাৎপর্যের কথাটি সমগ্র শিল্প জীবন প্রসঙ্গেই ওঠে। কোনো শিল্প প্রচেষ্টায় যখন একজন শিল্পীর অভিনব বৈশিষ্ট্য তাঁর নিজস্ব শিল্পকর্মকেই অন্যভাবে আলোকিত করে তোলে, তখন তাকে আমরা তাৎপর্যপূর্ণ বলতে পারি। বিষবৃক্ষ পর্যায়ের দ্বিতীয় সৃষ্টি ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’। কিন্তু বিষবৃক্ষেই প্রথম বঙ্কিমচন্দ্র সমকালকে সমসাময়িক সমাজকে স্পর্শ করেন। এ জন্যই ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ অপেক্ষা ‘বিষবৃক্ষ’ বেশী তাৎপর্যপূর্ণ। কপালকু-লার জের বঙ্কিমচন্দ্র মৃণালিনীতেও কিছুটা বহন করেছিলেনÑবিশেষত মনোরমা চরিত্রে। দুর্জ্ঞেয় এবং দুর্বোধ্য নারী চরিত্রকে তিনি যে বিস্মৃত হতে পারছিলেন না এটা তারই প্রমাণ। তিনি শিল্পী কাউকেই অনুকরণ করতে পারেন না, এমনকি নিজেকেও না। বিষবৃক্ষেই বঙ্কিমচন্দ্র ইতিহাসের কাল পরিহার করে লেখক হিসেবে নতুন করে শক্তির পরিচয় দিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র যে সব চরিত্র এঁকেছেন তাদের মধ্যে রোমান্সের অসাধারণ ছাপ আছে। প্রথমেই মনে হবে প্রকৃতিপালিতা কপালকু-লা ও রহস্যময়ী মনোরমার কথা। এরা রক্তমাংসে-গড়া নারী। রমনীজনোচিত প্রবৃত্তি এদের মধ্যে আছে। তবুও মনে হয় ধরনীর ধূলি হতে এরা অনেক দূরে, দৈনন্দিন জীবনে এরা অপরের চিত্তে বিভ্রমের সঞ্চার করতে পারে, কিন্তু তারা কখনও প্রাত্যহিকের সম্পত্তি হয়ে থাকবে না। প্রফুল্ল, সত্যানন্দ, জয়ন্তীÑ এদের সঙ্গে প্রকৃতির সং¯্রব কম, এরা রহস্যাবৃতও নয়। কিন্তু এরাও সাধারণ নরনারীর ক্ষেত্র থেকে বহুদূরে অবস্থিত। সাধারণ মানুষের জীবনকে এরা নিজেদের আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে চায়। কিন্তু এরা নিজেরা সংসার নিমগ্ন হয়েও সম্পূর্ণরূপে আত্মবিলোপ করে না। এদের ব্যক্তিত্ব মানব কল্যাণে নিয়োজিত হয়েছে, কিন্তু তারা স্বাতন্ত্র্য হারায়নি। মাধবাচার্য, চন্দ্রচূড়, ভবানীপাঠক, রাজসিংহ Ñ এরা সত্যানন্দ বা দেবী চৌধুরাণী অপেক্ষা নিষ্প্র্রভ, কিন্তু এদের ব্যক্তিত্বও অনন্যসাধারণ ও অতিমানবোচিত। এরা একটা বিরাট আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং সেই আদর্শের কাছে অন্য সব কামনা বিসর্জন দিয়েছেন। এসব অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নিচুস্তরের, সাধারণ জীবনের সাধারণ নরনারীর চরিত্র পর্যালোচনা করলেও এই বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাওয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র যে সব নায়ক-নায়িকার চরিত্র এঁকেছেন তারা সবাই একটু অসাধারণ। এর কারণ প্রত্যেকেই এক একটি আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং সেই আদর্শকে অদম্য তেজে অনুসরণ করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র নিজে সনাতন হিন্দুর প্রাচীন আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। সে কারনেই তাঁর সৃষ্ট নরনারীর মধ্যে রয়েছে সেই অকুণ্ঠিত নিষ্ঠা এবং দৃঢ় একাগ্রতা। প্রতাপ, সূর্যমুখী, ভ্রমরÑএদের মনে কখনও কোন দ্বিধা নেই অনুসৃত আদর্শ সম্পর্কেও কখনও সন্দেহ বা জিজ্ঞাসা জাগে নাই। নায়ক নায়িকা ছাড়াও পার্শ্বচরিত্রেও বঙ্কিমচন্দ্রের একদেশদর্শিতা দেখতে পাওয়া যায়। রোহিণী একান্তভাবে পাপীয়সী, কুন্দের প্রতি তার ¯্রষ্টার করুণা আছে, কিন্তু তার প্রণয়াকাক্সক্ষা যে সর্বতোভাবে ঘৃণ্য সে সম্বন্ধে তার কোন সন্দেহ নেই। এভাবে বঙ্কিমচন্দ্র সৃষ্ট চরিত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যাবে, তারা কোন একটি দোষ বা গুণের প্রতীক। সেটাই তাদের সজীব করেছে। তাদের চরিত্রের প্রধান গুণÑনানা প্রবৃত্তির সমাবেশ নয়, কোন একটি প্রবৃত্তির ঐশ্বর্য। ব্যতিক্রমও আছে দু’একটি চরিত্রে। উল্লেখ্য নগেন্দ্রনাথ বা গোবিন্দলালের কথা। এদের মনে সৎ ও অসৎ প্রবৃত্তি সমানভাবে বিরাজ করেছে, তাদের কখনও অতি নীচ বলে মনে করা যায় না। অথচ এরা মহামানবও না। এদের কাম প্রবৃত্তিকে বড় করে দেখানো হয়েছে। কাম মানুষকে কত উন্মত্ত করতে পারে, তার চিত্র তাদের মধ্যে আঁকা হয়েছে, আবার যখন অনুশোচনা এসেছে তখন তা সীমা অতিক্রম করে গেছে। তারা সাধারণ মানুষ, কিন্তু সাধারণ মানুষ কোন প্রবল প্রবৃত্তির উত্তেজনায় কিভাবে অসাধারণ হয়ে পড়ে, তার পরিচয় মেলে এদের কাহিনীতে। ব্রজেশ্বর সাধারণ মানুষ এবং তার মধ্যে কোন প্রবৃত্তির বাহুল্য নেই। এ হিসেবে ব্রজেশ্বর অন্যান্য নায়ক থেকে একটু আলাদা। তবে এটা ঠিক তাকে উপন্যাসে আনা হয়েছে দেবীরাণীর প্রয়োজনে; উপন্যাস তার কাহিনী নয়। তার চরিত্র খুব সজীব হয়ে ফুটেছে, এর পরেও এটা ঠিক যে সে মুখ্য চরিত্র নয়। নায়িকার জীবনে সে ভবানী পাঠকের চেয়েও ছোট স্থান অধিকার করে আছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রকাশ-ভঙ্গিতেও তাঁর সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য বর্তমান। তিনি শক্তির সংঘর্ষের চিত্র এঁকেছেন, নরনারীর হৃদয়ের নানাপ্রবৃত্তির দ্বন্দ্বের সুক্ষè বিশ্লেষণ করেননি। রোমান্সে এ জাতীয় বিশ্লেষণ যে অসম্ভব তা নয়। তিনি প্রবৃত্তির অনুশীলনের সামগ্রিক আলোচনা করেছেন। ভ্রমর গোবিন্দলালকে কায়মনোবাক্যে যত ভালবাসাই দিক না কেন, যে নিয়তি গোবিন্দলালের রোহিণী-আসক্তির রূপ ধরে আসে, তাকে সে নিয়ন্ত্রণ করবে কি করে ? অথচ নিয়তি আকাশবিহারী দেবতার খেয়াল নয়, এর মূল রয়েছে পার্থিব ঘটনার বিবর্তনে এবং মানুষের আকাঙ্খার মধ্যে। প্রত্যেকের জীবন আপনার নিয়মে গঠিত, আপনার নিয়মে চলছে। জীবনে ট্রাজেডি হচ্ছে এই যে একজন মানুষের সুখ নির্ভর করে অপরের উপর। অথচ দ্বিতীয় ব্যক্তি তার স্বাধীন পথে অগ্রসর হতে চায়। ভ্রমর গোবিন্দলালকে নিয়ে সুখী হয়, কিন্তু গোবিন্দলাল চায় রোহিণীকে। সে জলে ডুবেছে, শৈবালিনীকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু কিছুতেই নিষ্কৃতি পায়নি। লাখ শৈবালিনী পেলে সে কি করতো ? কিন্তু প্রতাপ দেখিয়েছে যে একটি শৈবালিনীর ভালবাসাই নিয়তির মত দুর্বার, নিয়তির মত বিচারবিহীন। মবারকের জীবন দুটি রমণীর অপরিসীম প্রেমের ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ হয়েছে, কিন্তু সীমাহীন প্রেম শুধু তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্য নয়। সেটা চরম অভিশাপের আকারেও দেখা দিয়েছে। বাদশাজাদীর প্রণয়ের সাথে জড়িয়ে আছে তার দম্ভ ও সম্ভ্রমবোধ, আর দরিয়ার অপ্রেমেয় ভালবাসার অন্তরালে রয়েছে তার অনির্বাণ জিঘাংসা।
বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে হৃদয়ের প্রবৃত্তিগুলো শুধু প্রবৃত্তি মাত্র বলে মনে হয়নি। তিনি এদেরকে বিরাট শক্তি বলে মনে করেছেন, যেন এদের স্বতন্ত্র সত্তা আছে। নরনারীর হৃদয়ের চিত্র আঁকতে যেয়ে তিনি তাদেরকে সুমতি ও কুমতি আখ্যা দিয়েছেন, যেন তাদের একটা নিজস্ব অস্তিত্ব আছে, যেন অপরাপর শক্তির মত তারাও স্বীয় গতিবেগ-প্রাবল্যে অগ্রসর হচ্ছে। হৃদয়ের প্রবৃত্তিগুলিকে পরিপূর্ণভাবে দেখিয়েছেন বলেই তিনি তাদেরকে খ-িত করে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেননি। নগেন্দ্রনাথ ও গোবিন্দলাল প্রথম জীবনে ¯েœহপরায়ণ স্বামী ছিল, হঠাৎ তারা অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হলো। এই পরিবর্তনের মনস্তত্ত্বমূলক ব্যাখ্যা নেই। বাইরের কি কি ঘটনায় এই পরিবর্তন সাধিত হলো তার চিত্র আছে, কিন্তু কেমন করে মনের মধ্যে ধীরে ধীরে আদর্শচ্যুতি ঘটলো তার আভাস থাকলেও বিস্তৃত চিত্র নেই। প্রসাদপুরে রোহিণী ও গোবিন্দলালের সম্পর্ক যে খুব সহজ ও তাদের জীবন যে খুব সুখময় ছিল এমন মনে হয় না। তা না হলে রাসবিহারীর পটলচেরা চোখের কথা ভাববে কেন এবং গোবিন্দলালই বা কোন কথা না শুনে পিস্তল সমুন্নত করলো। কিন্তু রোহিণীর জীবননাট্যের চতুর্থ অঙ্কের উল্লেখযোগ্য কোন চিত্র আমরা পাই না, যদিও এই শ্রেণীর চরিত্রের আলোচনায় চতুর্থ অঙ্কই মুখ্য। বঙ্কিমচন্দ্র পাপের বিষয়টি নিয়ে ঘাটাঘাঁটি করতে পছন্দ করেননি হেতুই হয়তোবা এভাবে তিনি চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। শৈবালিনীর প্রায়শ্চিত্ত ও পরিবর্তন অলৌকিক উপায়ে সাধিত হয়েছে। প্রফুল্ল যে দেবীচৌধুরাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে সেটাও একেবারে পার্থিব ব্যাপার নয়। শ্রীর মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটাও যেন বাহিরের ঘটনার পরিবর্তন। সীতারামের পতন খুব বিষ্ময়কর, কিন্তু তা সত্য ও জীবন্ত হয়ে ওঠেনি। এটি অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।
বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর পর বাংলার উপন্যাস সাহিত্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে তাঁর প্রভাব থেকে এই সাহিত্য কখনও মুক্ত হতে পারবে না। তাঁর মৃত্যুর পর সামান্য কিছু ঔপন্যাসিক ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন। রমেশচন্দ্র দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাখালদাস, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ুন আহমেদ ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু এঁদের কেউই শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক দাবি করতে পারেননি। বঙ্কিমচন্দ্র যদিও বেশ কয়েকটি উপন্যাসে ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছেন তবুও তিনি খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন মাত্র একটি ‘রাজসিংহ’। তাঁর নিজের মতেও শুধু ‘রাজসিংহ’ই তাঁর একমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস।
বঙ্কিমের পরে রবীন্দ্রনােেথর প্রতিভা বাংলা সাহিত্যকে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথ কবি হয়েও ঔপন্যাসিক। জগৎ এবং জীবন সস্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ আগ্রহ তাঁর উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য হচ্ছে: বঙ্কীমচন্দ্র ঘটনা ছাড়া অগ্রসর হতে পারতেন না। ব্যক্তি এবং ঘটনার পরস্পর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় উপন্যাসের গতি নির্ভরশীলÑবঙ্কিমচন্দ্র এ রকম ধারণা পোষণ করতেন। সে জন্য তাঁর শেষদিকের সৃষ্টিতে ব্যক্তিত্বের সমস্যা অপেক্ষা ব্যক্তির সমস্যাই প্রধান হয়ে উঠেছিল। অবশ্য ঘটনা ছাড়া রবীন্দ্রনাথও অগ্রসর হতে পারতেন না (এমনকি জেমস জয়েসও)। অথচ সে ঘটনার চেহারা আলাদা। রবীন্দ্রনাথ ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ থেকেই ক্রমশ এই ঘটনানির্ভর ঔপন্যাসিক পদ্ধতিকে পরিহার করতে সচেষ্ট হন। রাজর্ষিতে ঘটনানির্ভরতা থাকলেও রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব জীবন-বিষয়ক চিন্তা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হচ্ছিল সে কথা সহজেই বোঝা যায়। ‘চোখের বালি’ তাঁর উল্লেখযোগ্য বা তাৎপর্যপূর্ণ রচনা। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি হইতেছে ঘটনা-পরম্পরার বিবরণ দেয়া নয়, বিশ্লেষণ করিয়া তাঁহাদের আঁতের কথা বাহির করিয়া দেখানো। সেই পদ্ধতিই দেখা দিল চোখের বালিতে।”
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে বাংলার সামাজিক জীবনের যে চিত্র পাওয়া যায় তা বাস্তব জীবনের সঙ্গে নিবিড়। এছাড়া এসব উপন্যাসে ঘটনার দৈন্যও নেই। তিনি অতি তীক্ষè দৃষ্টি দিয়ে আমাদের পারিবারিক জীবনকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তিল তিল করে বিশ্লেষণ করে তার বর্ণনা দিয়েছেন। এসব চিত্রে রোমান্সের সুদূরতা নেই; এরা তাঁর প্রত্যক্ষগোচর অভিজ্ঞতা হতে উদ্ধৃত হয়েছে বলে মনে হয়। এদের মধ্যে কবি প্রতিভা থেকে বাস্তবপন্থীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের শক্তির পরিচয় বেশি রয়েছে।
আশা-মহেন্দ্র-বিনোদিনীর কাহিনীর সঙ্গে ভ্রমর-গোবিন্দলাল-রোহিণীর কাহিনীর মৌলিক সাদৃশ্য আছে। কিন্তু প্রকাশভঙ্গীতে প্রভেদের অন্ত নেই। গোবিন্দলাল যে রোহিণীর প্রেমে পড়েছিল তা ঠিক এক মূহূর্তের দর্শনে নয়, তবুও এই ভালবাসা একটা সহসা সঞ্জাত মোহ। এই আকর্ষণ কত দুর্নিবার বঙ্কিমচন্দ্র তা দেখিয়েছেন, কিন্তু কেমন করে নানা দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে এই মোহ গোবিন্দলালের চিত্ত আচ্ছন্ন করলো, তার বিস্তৃত বিশ্লেষণ নেই। রবীন্দ্রনাথের চিত্ত অন্য রকম। মহেন্দ্রকে যে বিনোদিনী উদভ্রান্ত করলো, তা হঠাৎ দর্শনের ফল নয়; নানা ক্ষুদ্র চাতুরী ও তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়ে এই আকর্ষণ জন্মিল ও সঞ্জিবিত হলো। রোহিণীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে গোবিন্দলাল সুখে কালযাপন করছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু তার কোন বিস্তৃত বর্ণনা নেই। ‘চোখের বালি’তে রবীন্দ্রনাথ মহেন্দ্র-আশার মিলনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন। এর মধ্যে মায়ের অভিমান, চারুপাঠের পুরুভুজ, কলেজ কামাই করা ও পরীক্ষায় ফেল হওয়া সবই আছে। এমনকি বর্ষার দিনকে রাত্রি ও পূর্ণিমার রাত্রিকে দিন মনে করার আকাশকুসুম কল্পনা করা বাদ যায়নি।
চরিত্র সৃষ্টিতেও রবীন্দ্রনাথের কল্পনার বাস্তবপ্রিয়তাই প্রমাণিত হয়। ভ্রমরের মধ্যে একটি অলৌকিক তেজ ও মহিমা আছে, কিন্তু আশা সাধারণ ঘরের অতি সাধারণ মেয়ে, কি করে যে তার সর্বনাশ সাধিত হচ্ছে তাও সে ভাল করে বোঝে না। অন্যান্য উপন্যাস আলোচনা করলেও এই নৈপুণ্য দেখা যাবে। গোরাকে প্রথমতঃ মহামানব বলে ভুল হতে পারে। কিন্তু উপন্যাস বেশিদূর অগ্রসর হতে না হতেই দেখা যায় সে সাধারণ মানুষ। যা কিছু অসাধারণত্ব আছে সেটাও ভিত্তিহীন। তার জন্ম হয়েছিল ম্যুটিনির ঘরে; সে কারণেই তার অত্যুগ্র নিষ্ঠা অর্থহীন, এটা এক প্রকার বিকার মাত্র। তারপর দেশসেবায় উগ্র উৎসাহ থাকলেও তার কার্যকলাপে অসাধারণত্ব নেই। সর্বশেষ তার জন্মরহস্য আবিস্কার করে দিয়ে এবং সুচরিতার সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে একেবারে সাধারণ মানুষের গ-িভুক্ত করেছেন। ‘নৌকাডুবি’তে রমেশ ও কমলার মিলন একটু অতিনাটকীয়, কিন্তু তাদের যৌথ জীবনযাত্রার চিত্র আঁকা হয়েছে নানা খুঁটিনাটির মধ্য দিয়ে। কমলার বিয়ে সম্বন্ধে সত্য কথা জানতে পেরে রমেশ অতিনাটকীয় কিছু করেনি, জটিল সমস্যার সহজ সরল সমাধান করতে চেষ্টা করেছিলেন। গোরা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের একমাত্র উপন্যাস যেখানে তিনি শেষ রক্ষা করতে পেরেছেন। ‘গোরা’ বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে গভীর মূল্যের অধিকারী হয়েও ‘চোখের বালি’, ‘যোগাযোগ’, ‘চতুরঙ্গ’ প্রভৃতি উপন্যাস অপেক্ষা জটিলতার দিক থেকে উচ্চাভিলাষী না।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে আর একটি বিষয় লক্ষণীয় যে তিনি চিরপ্রচলিত নীতিকে মেনে নিয়ে তার মাহাত্ম্য কীর্তন করবার জন্য উপন্যাস রচনা করেননি। নীতি সম্পর্কে তাঁর এই পক্ষপাতশূন্যতা তাঁর প্রতিভার মৌলিকতার পরিচায়ক। বঙ্কিমচন্দ্র চিরাচরিত নীতিকে মেনে নিয়েছিলেন এবং তাঁর উপন্যাসে ভাল ও মন্দ এই দুই শক্তির সংঘর্ষের চিত্র এঁকেছেন। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের মধ্যে ‘নৌকাডুবিতে’ প্রচলিত রীতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখান হয়েছে, কিন্তু ‘চোখের বালি’তে এই নতিস্বীকার নেই। বিধবার প্রণয়াকাঙ্খার চিত্র আঁকা হয়েছে। ‘চোখের বালি’ বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসের ধারাকে নতুন পথে প্রবাহিত করেছে। ‘দুর্গেশনন্দিনী’র পর যদি কোন গ্রন্থ উপন্যাসের ক্ষেত্রে নতুন যুগ প্রবর্তনের দাবি রাখে তবে সেটি ‘চোখের বালি’। ‘চোখের বালি’তে বিধবার প্রণয়াকাঙ্খার চিত্র আঁকা হযেছে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোথায়ও বিনোদিনীকে কশাঘাত করেননি। তার আকাঙ্খাকে নারীর সহজাত স্বাভাবিক আকাঙ্খা বলে গ্রহণ করে তিনি এর বিশ্লেষণ করেছেন ও বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি উদ্দাম প্রবৃত্তির জয়গান করেননি, বরং এই উচ্ছৃঙ্খলতা কিরূপ প্রলয়ের সৃষ্টি করে তারই চিত্র এঁকেছেন, কিন্তু যেহেতু বিনোদিনী বিধবা সে কারণে তার পুরুষের আসক্ত হওয়া অসঙ্গত হবে এমন বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ উপন্যাস লেখেননি। বরং তার মত অবস্থায় পড়লে মহেন্দ্র বা বিহারীর প্রতি আসক্ত হওয়াই তার পক্ষে স্বাভাবিক, এটাই উপন্যাসের অন্যতম প্রতিপাদ্য বলে মনে হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এই নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে পারেননি। এ কারণেই উপন্যাসের শেষের অংশে বিনোদিনীর চরিত্র যেন অদ্ভূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখক এমন একটি চরিত্র সৃষ্টি করেছেন যার পরিণতি সম্পর্কে তিনি সতর্ক ছিলেন না। এর পরেও তিনি প্রচলিত সংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে নরনারীর হৃদয়ের চিত্র আঁকতে চেষ্টা করেছেন, এটাই লক্ষনীয়। এটাই বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসের গতির নিয়ামক হলো। বঙ্কিম যুগ অতিক্রম করে আমরা এক নতুন যুগে উপনীত হলাম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম জয়ন্তীতে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন তিনি সাহিত্যে গুরুবাদ মানেন এবং ‘চোখের বালি’র উল্লেখ করেন। রবীন্দ্রনাথের এই উপন্যাসে সংস্কারমুক্তির যে পরিচয় মেলে তারই পূর্ণতার বিকাশ ঘটেছে শরৎ-সাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথ বিনোদিনীর আকাঙ্খার স্বাভাবিকতাকে স্বীকার করেছেন। শরৎচন্দ্র রমা, রাজলক্ষ্মী, অভয়া প্রভৃতির পক্ষ নিয়ে প্রীতিহীন ধর্ম ও ক্ষমাহীন সমাজকে প্রশ্ন করেছেন, তারা মানুষের কোন্ মঙ্গল সাধন করতে পেরেছে? সমাজে যারা বঞ্চিত-উৎপীড়িত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন তিনি তাদের জীবন অতিশয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণের গভীরতা, বিশ্লেষণের পুঙ্খনাুপুঙ্খতা, বর্ণনারবাস্তবতা সর্বজনবিদিত এবং এখানেই তিনি রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত রীতি অবলম্বন করেছেন। কিন্তু তিনি তাঁর মৌলিকতার জানানও দিয়েছেন। তিনি সমাজের সমস্যার কোন মীমাংসা করতে চেষ্টা করেননি, শেষ প্রশ্নের উত্তর তিনি দেননি, কিন্তু নিগৃহীত, প্রপীড়িতদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছেন এবং তাদের পক্ষে তিনি প্রশ্ন করেছেন যে সমাজ ক্ষমা করতে জানে না। জানে না সামঞ্জস্য করতেও। উপলব্ধি করতে পারে না, তার গৌরব কোথায়, তার বিধিনিষেধের মূলে যদি কোন শক্তি থাকে, তবে সে কিসের শক্তি? ‘চোখের বালি’ প্রকাশের প্রায় এক যুগ পরে শরৎচন্দ্র যখন সমাজ-বিগর্হিত প্রেমকে উপজীব্য করে তাঁর উপন্যাসাবলী প্রকাশ করতে লাগলেন, যখন দেখা গেল যে প্রতিপত্তির সাফল্যে এবং জনচিত্ত দখলে তাঁর সৃষ্টি করা নারী চরিত্রগুলো বিনোদিনীকে বহু পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। শরৎসাহিত্যের সাফল্য হচ্ছে (ক) নিষিদ্ধ সমাজ-অননুমোদিত প্রেমের বিশ্লেষণ (খ) আমাদের সমাজের রীতি-নীতি ও সংস্কার প্রভৃতির কঠিন সমালোচনা।
বঙ্কিমচন্দ্র যে সব চরিত্র সৃষ্টি করেছেন এবং ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন তার মধ্যে কিছু শরৎচন্দ্রের রচনায় পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। কিন্তু তাদের স্বরূপ বদলে গেছে। শৈবালিনী যে বজরায় উঠে লরেন্স ফক্টরের সাথে চলে গিয়েছিল তা বঙ্কিমের উপন্যাসে একটি ফ্যাক্টর মাত্র। বিরাজ বৌ বজরায় উঠে রাজেন্দ্রর সঙ্গে চলে গিয়েছিল; এখানে শরৎচন্দ্র বলতে চেয়েছেন যদিও বিরাজ বৌ কূলত্যাগ করেছিল তবুও তার সত্যিকার পাপ হয়নি। ‘বিরাজ বৌ’ শরৎচন্দ্রের অপরিণত রচনা। এখানে তিনি সাহসের সাথে নিজস্ব মতামত দিতে পারেননি। সুতরাং বঙ্কিমচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্রের রচনার পার্থক্য তুলনা করতে হলে শরৎচন্দ্রের অপেক্ষাকৃত পরিণত রচনা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। প্রতাপ এবং দেবদাসের জীবনের খানিকটা সাদৃশ্য আছে। উভয়েই বাল্যপ্রণয়ের অভিসস্পাতে অভিশপ্ত হয়েছিল। উভয়ের জীবনের পরিসমাপ্তি মৃত্যুর ট্রাজেডিতে এবং সেই মৃত্যু বাল্যপ্রণয়ের সঙ্গে বিজড়িত। কিন্তু এদের জীবনের কাহিনী ও চরিত্রের পার্থক্যও খুব বেশি। প্রথমত প্রতাপ ইন্দ্রিয়জয়ী; সুতরাং শৈবালিনীকে ভাল বাসলেও সে চিত্ত জয় করেছে এবং যে নারীতে তার অধিকার নেই তার জন্য লিপ্সাকে দলিত করে রূপসীকে বিয়ে করেছে ও তাকে নিঃসঙ্কোচে বরণ করেছে। কিন্তু দেবদাসের কথা অন্য রকমের। ইন্দ্রিয়জয়ে যে পূণ্য হয় তার মূল্য কতটুকু ? হৃদয়ের অন্তস্থল ভেদ করে যে আকাঙ্খা জেগে উঠেছে তাকে নিরুদ্ধ করে কোন্ মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত হবে ? তার পর অন্য নারীকে বিয়ে করাÑদেবদাসের কাছে তো যথার্থ পাপ।
এ তো গেল তার জীবনের কাহিনী। এদের মৃত্যুর বর্ণনাও দেয়া হয়েছে বিভিন্ন উপায়ে। প্রতাপের মৃত্যুর পর রমানন্দ স্বামী বলেছেন “তবে যাও প্রতাপ, অনন্তধামে যাও, যেখানে ইন্দ্রিয়জয়ে কষ্ট নেই, রূপে মোহ নেই, সেখানে যাও। যেখানে রূপ অনন্ত, প্রণয় অনন্ত, সুখ অনন্ত, সুখে অনন্ত পূণ্য, সেখানে যাও। যেখানে পরের দুঃখ পরে জানে, পরের ধর্ম পরে রাখে, পরের জয় পরে গায়। পরের জন্য পরকে মরতে হয় না। সেই মহৈশ্বর্যময়লোকে যাও, লক্ষ শৈবালিনীকে পদপ্রান্তে পাইলেও ভালবাসতে চাহিবে না।” দেবদাসের জীবন লীলা যখন শেষ হলো তখন লেখক এই লিখে উপসংহার করলেন “তোমারা যে কেহ এই কাহিনী পড়িবে, হয়তো আমাদেরই মত দুঃখ পাইবে। তবু যদি কখনও দেবদাসের মত অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও। প্রার্থনা করিও আর যাই হোক যেন তাহার মত কাহারও এমন করিয়া মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময় যেন একটি ¯েœহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছেÑযেন একটিও করুণার্দ্র ¯েœহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও চোখের জল দেখিয়া মরিতে পারে।” বঙ্কিমচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্রের রচনার পার্থক্য এখানে সুস্পষ্টরূপে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র সংযমের জয়গান করেছেন, শরৎচন্দ্র মানবহৃদয়ের দুর্বলতাকে সহানুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন।
অন্যান্য চরিত্র গভীরভাবে আলোচনা করলেও এই পার্থক্য ধরা পড়বে। গোবিন্দপুর জমিদার বাড়ির বিষবৃক্ষের বীজ বপন করেছিল হীরা এবং সেই বিষবৃক্ষ মুকুলিত হয়েছিল হীরার জীবনে। হীরা যুবতী, সুখের কাঙাল। সে ধর্ম মানে না, চিত্তসংযমে তার আস্থা নেই। নিজের সুখের লোভে সে অনেক পাপ কাজ করেছে। তার প্রণয়ীর প্রণয়াস্পদকে হত্যা করেছে, যে প্রণয়ী তার ভালবাসার প্রতিদান দেয়নি তার উপর প্রতিহিংসা নিয়েছে, তারপর উন্মাদিনী হয়েছে। উন্মাদের মধ্যেও তার জিঘাংসাবৃত্তি শক্তিশালী রয়েছে। এই হীরার সঙ্গে কিরণময়ীর সাদৃশ্য আছে। এখানেও দেখা যায় সেই উদ্দাম প্রণয়লিপ্সা, সেই অসাধারণ কার্যতৎপরতা, ধর্মাধর্মের প্রতি সেই ঔদাসীন্য, সেই কঠোর প্রতিহিংসার উপায় একটু মৌলিক, সে সুরবালাকে হত্যা করেনি, দিবাকরের সর্বনাশ করেছে। এখানেই বঙ্কিমচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্রের রচনারীতির প্রভেদ। ধর্মসম্পর্কে কিরণময়ী শুধু যে উদাসীন তাই নয়, ধর্মের বিরুদ্ধে, পরকালের বিরুদ্ধে তর্ক করে, লড়াই করে, ব্যঙ্গ করে তার মন পরিস্ফুট হয়েছে। উপেন্দ্রের স্ত্রীকে হত্যা করলে উপেন্দ্রের আদর্শকে আঘাত করা হয় না, তাকে অপমান করা হয় না। তাই সে এমন একটি কাজ করলো যাতে উপেন্দ্রের মাথা হেঁট হয়, তার বহুদিনের সঞ্চিত ¯েœহের মূল নির্মূল হয়। এই উদ্দেশ্য নিয়ে সে দিবাকরকে প্রলুব্ধ করলো, তাকে সর্বনাশের শেষ সীমায় পৌঁছে দিয়ে নিজে সরে দাঁড়াতে চাইল। সমাজ ও ধর্মের বিরুদ্ধে যে ঔদাসীন্য হীরার মধ্যে দেখা যায়, সেটাই কিরণময়ীর হৃদয়ে তীক্ষè বিদ্রোহে রূপান্তরিত হয়েছে। এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে হীরার বিষবৃক্ষ মুকুলিত হয়েছে কিরণময়ীর মধ্যে।
শরৎচন্দ্র সেই সব নারীদের পক্ষে থাকেননি যারা সমাজের অনুশাসন অনুসারে কোন অধিকার লাভ করেছে। এখানেই বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টির সঙ্গে পার্থক্য সুস্পষ্ট। সুরবালার কাছে কিরণময়ী পরাজিত হযেছে, এ ক্ষেত্রে সুরবালার বিরুদ্ধে শরৎচন্দ্রের কোন অভিযোগ নেই, কিন্তু তবু সুরবালা শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম জাগাতে পারেননি। তার প্রতি পাঠকের মনে শুধু কৌতুকমিশ্রিত ¯েœহের সঞ্চার হয়। অথচ বঙ্কিমচন্দ্র যে সব সাধ্বী রমণীর চিত্র এঁকেছেনÑভ্রমর, সূর্যমুখী প্রমুখের আচরণে আমরা বিস্মিত ও শ্রদ্ধাবনত হই, কিন্তু কৌতুক অনুভব করি না। হারাণবাবু অধ্যাপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, স্ত্রীর যৌবনোদ্গমের প্রতি তাঁর লক্ষ্য ছিল না, তার সঙ্গে কখনও ভালবাসার আদান প্রদান করেন নাই। চন্দ্রশেখরও একই রকমের মানুষ। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রভেদও সামান্য নয়। চন্দ্রশেখর শান্ত, সৌম্য, উদার, মহান্ এবং বঙ্কিমচন্দ্র তাকেই নায়ক করেছেন। আর হারাণবাবুর মধ্যে দেখা যায় নির্জীব গ্রন্থকীট, যাঁকে প্রশংসা করা যায়, কিন্তু ভালবাসা যায় না, যার কাছেও আসা যায় নাÑ “শুষ্ক কঠোর মূর্তিমান বিদ্যার অভিমান, বিজ্ঞানের শক্ত বেড়া দিয়া যিনি অত্যন্ত সতর্ক হইয়া দিবারাত নিজের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিতেন সেই স্বামী।”
প্রকাশভঙ্গিতেও শরৎচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্রের রীতি অবলম্বন করেননি। ‘চোখের বালি’, ‘গোরা’র মধ্যে যে বিস্তৃত বিশ্লেষণের বিষয়টি পাওয়া যায় সেটা আরো বিস্তৃততর ও সূক্ষ্মতর হয়েছে শরৎচন্দ্রের রচনায়। তিনি সমাজবিগর্হিত পাপের সম্মুখে সঙ্কোচ বোধ করেননি, বরং বিধবার সূতিকা রোগের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। নরনারীর হৃদয়ের মধ্যে তিনি নানা প্রবৃত্তির দ্বন্দ্ব দেখতে পেয়েছেন। কোন একটি প্রবৃত্তির বাহুল্যে নায়ক-নায়িকার চরিত্র আচ্ছন্ন হয়নি। এ কারণেই তাঁর উপন্যাস মানসিক দ্বন্দ্ব ও পরিবর্তনের ছবি হয়েছে খুবই জীবন্ত। যে বড়দিদি সুরেন্দ্রনাথকে ছোট বোনের মাস্টার বলে একটু বেশি ¯েœহ দেখিয়েছিল এবং যে বড়দিদি মুমূর্ষ সুরেন্দ্রনাথের কাছে উপস্থিত হয়েছিল, তাদের মধ্যে কতই না প্রভেদ এবং সেই প্রভেদের মূলে রয়েছে বহু দিনের বহু ঘটনা ও বহু চিন্তা। একদিন রমা তারিণী ঘোষালের শ্রাদ্ধে উপস্থিত হওয়ার কথা কল্পনা করতে পারত না, আর একদিন সে যতীনকে রমেশের হাতে দিয়ে পল্লীসমাজ থেকে চির বিদায় নিল। এই পরিবর্তনকে অসম্ভব বলে মনে হয় না। কারণ এটা এসেছে ধীরে ধীরে সময় পার করে।
বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে মানসিক দ্বন্দ্বের ও পরিবর্তনের চিত্র খুবই কম। যেখানে মানসিক পরিবর্তনের চিত্র আছে, সেখানেও দেখা যায় যে পরিবর্তন এত সহজে ঘটেছে যে মনে হয় একটি চরিত্র হঠাৎ করে অন্য একটি চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। যে স্ত্রী স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে বাগানের ফুল চুরি করে মনের মত মালা গেঁথে গাছের ডালে ঝুলিয়ে মনে করত স্বামীকে। যে স্ত্রী অলঙ্কার বিক্রি করে ভাল সামগ্রী কিনে পরিপাটি করে রান্না করে মনে করেছে তাকে খেতে দিল, সেই একদিন স্বামীকে পরিত্যাগ করল। সন্ন্যাসিনীর অন্তরালে রমণীর ভোগ লিপ্সা নিঃশেষে মিলিয়ে গেল। স্বামী পরিত্যক্তা ভৈরবী ষোড়শী স্বামীকে একদিন অতর্কিতে ফিরে পেল, এতে তার জীবনে বিশাল পরিবর্তন এলো। সুপ্ত অলকা আবার জেগে উঠলো, কিন্তু ষোড়শীও নিঃশেষে মরল না। ষোড়শী এবং অলকার মধ্যে সামঞ্জস্য করতে তার বাকি জীবনটা কেটে গেল এবং কোন সামঞ্জস্য সম্ভবপর কিনা তা শেষ পর্যন্ত অনিশ্চিতই থেকে গেল। মতিবিবির মধ্যে পদ্মাবতী নিঃশেষে মারা গিয়েছিল; সে সহসা পুনরুজ্জীবিত হল, সে দিনই মতিবিবি মারা গেল,Ñ রইল শুধু তার অকুণ্ঠিত দীপ্ত তেজ, তার প্রবল অধিকারলিপ্সা। পিয়ারী বাইজির মধ্যে রাজলক্ষ্মী কিভাবে আত্মরক্ষা করেছিল তা আমরা জানতে না পারলেও সে যে নিভৃতে তার বৈশিষ্ট্যকে সজীব রেখেছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। যেদিন শ্রীকান্তের সঙ্গে পিয়ারীর দেখা হলো সেদিনই পিয়ারী মারা যায়নি। রাজলক্ষ্মীর জীবনে পিয়ারী মাঝে মাঝে উঁকি দিয়েছে। শুধু তাই নয় যে রাজলক্ষ্মী শিকারশিবিরে শ্রীকান্তকে অভিবাদন করেছিল এবং যে রাজলক্ষ্মী গঙ্গামাটিতে শ্রীকান্তকে বিদায় দিতে সম্মত হয়েছিলÑ এর মধ্যেও কত প্রভেদ ! অথচ এই পরিবর্তন এক দিনে সাধিত হয়নি, ধীরে ধীরে বহু তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়ে আস্তে আস্তে করে তার চরিত্রে এই পরিবর্তন এসেছে এবং এর বিশ্লেষণই শরৎপ্রতিভার অন্যতম দিক।
বঙ্কিমচন্দ্রই বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের শ্রষ্টা। তিনি নানা শ্রেণীর উপন্যাস লিখেছেন। সবগুলো উপন্যাসেই রোমান্স রয়েছে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো প্রায়ই মহামানব। সাধারণ মানুষের চরিত্রের কোন একটি প্রবৃত্তি খুবই প্রবল হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র কোন বিষয়ই পুঙ্খনুপুঙ্খ আলোচনা বা বিশ্লেষণ করেননি। নারী-পুরুষের হৃদয়কে সামগ্রিকভাবে দেখিয়েছেন এবং প্রচলিত ধর্মের প্রতি অনুরক্তি বা শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের মৌলিকতা প্রকট হয়েছে চরিত্র সৃষ্টি এবং প্রকাশ ভঙ্গিতে। রবীন্দ্রনাথ মহামানবের কথা লেখেননি, সাধারণ মানুষের সাধারণ কাহিনী নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছেন। এদের কথা লিখতে যেয়ে তিনি হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করেছেন এবং তাতে নানা রকম লুকোচুরি ও দ্বন্দ্ব দেখতে পেয়েছেন। কাউকেই একটি প্রবৃত্তির উদাহরণ মনে করেননি। প্রচলিত ধর্ম ও নীতিরও তিনি বিরুদ্ধচারণ করেননি। তিনি তার পক্ষে সাফাইও গাননি। মানুষকে তিনি মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন।
শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করেছেন। তাঁর উপন্যাসের নায়ক নায়িকারা খুব সাধারণ লোক। তিনি তাদের জীবন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তার গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। গার্হস্থ এবং সামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি তিনি সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। মানবহৃদয়ের গোপনতম কথা ও অনুভূতির যে দ্বন্দ্ব তা তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন। অনুভূতির গভীরতায় এবং বিশ্লেষণের সূক্ষ্মতায় তাঁর রচনা অনন্যসাধারণ। আবার তিনি প্রচলিত ধর্ম ও নীতি সম্পর্কে নিরপেক্ষ থাকেননি। তিনি একে অস্বীকার করেননি আবার ধর্মকে কল্যাণকর বলেও শিরোধার্য করেননি। তাঁর রচনায় বিদ্রোহের সুর রয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন, যে ধর্ম মানুষের হৃদয়ের প্রতি অবিচার করে গড়ে উঠেছে, তার মূল্য কোথায়?
ঔপন্যাসিকের শিল্প-কৌশলের মূলে রয়েছে ঔপন্যাসিকের নির্বাচনী ক্ষমতা। উপন্যাসের চরিত্র, প্লট এবং ঘটনাংশ সব কিছুতেই লেখকের নির্বাচনী ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে। সর্বোপরি লেখকের উপস্থাপন কৌশল তো আছেই। এ ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিকের মেধা ও মননের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর লেখায়। উপন্যাস রচনার স্থান-কাল বা সময় বিবেচ্য। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের সময়কালও ভিন্ন ছিল। তাই তাঁদের রচনায় কিছু মৌলিক পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক।
হাবিবুর রহমান স্বপন
মোবা:০১৭১০৮৬৪৭৩৩