নাম
দেবানন্দ সরকার, সোমবার, আগস্ট ২৭, ২০১২


রোহিত জানে কিন্নরীর জন্য ওর যে আকর্ষণ তা মোটেই প্লাটোনিক নয়। এ আকর্ষণটুকু পুরোপুরিই শারীরিক। কিন্নরীকে ওর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলতে পারলে, কিন্নরীর শরীরের সব গন্ধ-রং-রস-শ্বাসটুকু ছেঁকে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলতে পারলেই হয়তো এ আকর্ষণটুকু, এ মোহটুকু কেটে যাবে। কিন্তু যতক্ষণ তা না ঘটছে, যতক্ষণ না কিন্নরীর নরম ত্বকের স্পর্শ রোহিতের ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ একটা প্রবল আলোড়নে রোহিত ছটফট করতে থাকে। কিন্নরী দৃষ্টির সীমানায় এলে রোহিতের গলা শুকিয়ে আসে, পেটের গভীর হঠাৎ খালি খালি লাগে, হৃৎস্পন্দন আলোর গতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। স্বপ্নে কিন্নরীকে মন্থন করে রোহিত স্বেদাক্ত, সিক্ত, নিঃশেষিত অনুভব নিয়ে ভোরবেলা জেগে ওঠে। আর কিন্নরীকে আশ্লেষে জড়িয়ে ধরার কামনা ওকে আরো বেশী করে উদ্ভ্রান্ত করে তোলে।
কিন্নরীর সাথে কোনোদিন একাকী বসে গল্প করা হয় নি রোহিতের। সত্যি বলতে কি কিন্নরীর সাথে জনতার মাঝে টুকটাক কথা বলা ছাড়া রোহিত কখনোই কাছাকাছি হতে পারে নি। রোহিত কিন্নরীকে চেনে না। জানে না কিন্নরীর প্রিয় রং কি, কি ভালোবাসে কিন্নরী। বোঝে না কোন্ বোধ লুকিয়ে আছে কিন্নরীর মনের গহনে। কিন্তু প্রথম যেদিন কিন্নরীকে দেখেছিল সেদিন থেকেই অদৃশ্য ইস্পাতের জালে কিন্নরী রোহিতের সমস্ত চেতনা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। রোহিত সেই মোহের বন্ধন কেটে কিছুতেই মুক্ত হতে পারছে না।
মোমের আলোয় পার্টি হচ্ছিল সেদিন। দৈনন্দিন থোড়-বড়ি-খাড়ার জীবনে বৈচিত্র্য আনতে সুমিত্র আর কিন্নরী সব সময় নতুন কিছুর প্রয়াসী। বিদ্যুতের আলো নিভিয়ে সারা বাড়ি খেলছিল মোমের কাঁপা-কাঁপা সোনালী আলো আর তাকে ঘিরে ধূসর আবছায়া। সুমিত্র আর কিন্নরী। আট বছরের বিবাহিত জীবন। দু’জন মানুষের গদ্যময় জীবনের ছন্দকে চুরমার করে দিতে ছোট দু’টো পায়ের আগমন ঘটে নি এখনো। সদ্য হাঁটতে শেখা পায়ের দৌড়ে মুখর হয় নি ম্যানহাটনের কেন্দ্রে ওদের বিশাল চার কামরার এ্যাপার্টমেন্ট। সবার অলক্ষ্যে আপনমনে দৌড়তে দৌড়তে সেই দু’টো পায়ের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে বন্ধ করে রাখতে হয়নি ওদের সদর দরজা। তার বদলে ওদের দুয়ার উদার, উন্মুক্ত। সব সময়, সবার জন্য। ছুটির দিনগুলোতে বন্ধু সমাগমে গমগম হয়ে থাকে ওদের ঘর। এমনি এক মোম-জোছনায় সিঞ্চিত রাতে রোহিত প্রথম এসেছিল এই বাড়ি। অতিথিদের মধ্যে রোহিত ছিল দ্বিতীয় কি তৃতীয়। কাঁচের দরজার ওপাশ থেকে রোহিতের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল সোফায়-বসা-কারো-সাথে-ঝুঁকে-কথা-বলা কিন্নরীর সিলুয়েট। পাশে রাখা মোমের আলো কিন্নরীর মুখে পড়ে এক অদ্ভুত সোনালী মাদকতা এনে দিয়েছিল। শরীরের প্রতিটি বাঁক ফুটিয়ে তোলা হাত-কাটা কালো মিডি স্কার্ট কিন্নরীকে করে তুলেছিল সচিত্র পুরাণের উরসভারাক্রান্তা, নিতম্বিনী ঊর্বর্শীর প্রতিমা। চুল খোঁপা করে উঁচু করে বাঁধায় উন্মুক্ত মসৃণ গ্রীবা রোহিতকে আবাহন করছিল ওষ্ঠের স্পর্শে শিউরে তোলার জন্য। রোহিতের সমস্ত সংযম, সমস্ত রক্ষণশীলতা ভেঙে প্রগাঢ় এক সংক্ষোভ ওকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। রোহিতের মনে হচ্ছিল ওর ভেতর থেকে বল্গাহীন অশ্বটি সব দেয়াল বিদীর্ণ করে লাফিয়ে পালিয়ে যাবে কিন্নরীর অনাঘ্রাতা অরণ্যে। বসন্তের সন্ধ্যার মৃদুমন্দ বাতাসেও রোহিতের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছিল, শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে-যাওয়া কুলকুল ঘামে ভিজে উঠছিল পিঠ। দরজায় রোহিতের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠতে কিন্নরী উঠে এসেছিল অভ্যর্থনা করতে।
‘আমি রোহিত, আপনার সাথে আগে কখনো দেখা হয় নি।’ শুকনো গলা ভিজিয়ে অনেক কষ্টে কথাগুলো বলল রোহিত।
‘ও আপনিই রোহিত। সুমিত্র বলেছে আপনার কথা। আসুন ভেতরে আসুন।’ কিন্নরীর কন্ঠে নুড়ি পাথরের ওপর ঝর্ণার রিনিঝিনি। ততক্ষণে ভেতর থেকে সুমিত্র বের হয়ে এসেছে।
‘আরে রোহিত যে। চলে এসেছেন তাহলে? বাড়ি খুঁজে পেতে অসুুবিধা হয় নি তো?’
‘না। আপনার ডিরেকশন একদম নিখুঁত।’
‘পরিচয় করিয়ে দেই। রোহিত। ওর কথা তোমাকে বলেছি। ঠিকানা আছে কিন্তু অফিস নেই। এই অবস্থায় রাস্তায় উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় খুঁজে পেলাম ওকে। চাকরির ইন্টারভিউ-এর চিঠি পাঠিয়ে কোম্পানী ব্যাংকরাপ্সি ফাইল করে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এনিওয়ে, রোহিত নিউ ইয়র্ক এসেছে মাস তিনেক হল। কাজেই ওর এখনো কালচার শক চলছে। ওকে সাবধানে ডিল কোরো। আর রোহিত, এ হচ্ছে আমার গত আট বছরের সার্বক্ষণিক সাথী, আমার বউ কিন্নরী।’ সুমিত্র চমৎকার কথা বলে। শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখে।
‘নাইস টু মিট ইউ।’ কিন্নরী হাত বাড়িয়ে দেয়। এই প্রথম কোনো নারীর সাথে করমর্দন করল রোহিত। কি নরম তুলতুলে হাত! ছেড়ে দিতে মন চায় না।
‘নাইস টু মিট ইউ টু। কিন্নরী না? নামের অর্থ জানেন?’ প্রথম দেখায় সদ্য-দেশ-থেকে-আগত রোহিত বাংলায় ওর ব্যুৎপত্তি দেখানোর সুযোগ ছাড়ে না।
‘নিজের নাম। তার অর্থ জানবো না? সুকন্ঠী। সুগায়িকা।’
‘শুধু তাই না। স্বর্গের গায়িকা। আপনার কন্ঠেও নিশ্চয়ই স্বর্গীয় সুর?’
‘তা তো জানি না। চেষ্টা করি একটু আধটু গান করতে। কতটুকু সুর লাগে তা বুঝি না।’
‘কিন্নরীরা দেখতে কেমন ছিলো জানেন?’
‘নিশ্চয়ই খুব সুন্দরী।’
‘না, তা নয়। ওদের মুখ ঘোড়ার মতো আর শরীর মানুষের। গ্রীক মিথোলজির সেন্টরদের ঠিক উল্টো।’ রোহিত মুচকি হেসে বলে। কথা বলতে বলতে অনেকটাই সহজ হয়ে উঠছিল ও।
‘কি বললেন, আমি ঘোড়ামুখো?’ কপট রাগে প্রচন্ড কটাক্ষ করে বলে কিন্নরী।
‘আরে না, না। আপনি কেন তা হতে যাবেন? আপনি খুব সুন্দর।’ আচমকা বেফাঁস কথাটা বলে ফেলে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে রোহিত। আর তা দেখে সুমিত্র আর কিন্নরী দু’জনেই হাসিতে ফেটে পড়ে।
এ টুকুই রোহিতের সাথে কিন্নরীর কথা বিনিময়। সৌন্দর্যের ব্যাকরণের চুলচেরা বিভাজনে কিন্নরী রূপসী নয়। কিন্তু ওর শব্দ প্রেক্ষপন, গ্রীবা সঞ্চালন, সমস্ত অবয়ব কাঁপানো হাসি আর শরীরের নিখুঁত সৌষ্ঠব কিন্নরীকে অসাধারণ করে তুলেছে। রোহিত টের পায়, শুধু রোহিত নয় সুমিত্রর বন্ধুদের অনেকেই শুধু কিন্নরীর টানেই এ বাড়িতে আসে। কিন্নরীর একটুকু হাসির অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করে থাকে। হাতের একটুকু ছোঁয়া পেলে ধন্য হয়ে যায়। কিন্তু রোহিত তারও বেশী চায়। ওর সমস্ত আকাক্সক্ষা-কামনা-কল্পনা কিন্নরীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বের ওপর মাস্টার্স শেষ করতে করতে রোহিতের হাতে গ্রীন কার্ডটা এল। স্কুলে পড়ার সময় বড় মামা রোহিতের এদেশে আগমনের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন তার ফল মিলল এগার বছর পর। স্বপ্নের দেশে পা ফেলার সাথে সাথেই বড় মামা রোহিতের স্বপ্নভঙ্গের গহ্বরটা খুঁড়তে শুরু করে দিলেন।
এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে বাড়ি যেতে যেতে রোহিতকে জানিয়ে দিলেন, ‘শোন্, দিদিকে আমি কথা দিয়েছিলাম তোকে এখানে নিয়ে আসব। সে কথা আমি রেখেছি। এখন তোর নিজেরটা নিজেকেই তৈরী করে নিতে হবে। এক মাস সময় দিলাম। এর মধ্যে থাকার জায়গা ঠিক করবি। কোনো একটা কাজ খুঁজে নিবি। আমাকে যন্ত্রনা করবি না।’
বাড়িতে পা দেবার পর বড় মামী যখন রোহিতের সাথে একটা কথাও বললেন না তখন রোহিত সম্যকভাবে বুঝে গিয়েছিল ওর অবস্থান কোথায়। এক সপ্তাহের মাথায় ‘সাবওয়ে’তে রাতের শিফটে কাজে ঢুকে গেল রোহিত আর দিনের বেলাগুলো কাটতে লাগলো চাকরি আর মাথা গোঁজার আশ্রয়ের খোঁজে। রোহিত হাড়ে হাড়ে টের পেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের সার্টিফিকেট আর ঠোঙার কাগজের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই এখানে। জ্যাকসন হাইটসে ঘুরতে ঘুরতে দেশী দোকানের ভেতর টাঙানো বিজ্ঞাপন দেখে রোহিত আরো দু’জনের সাথে ভাগাভাগিতে থাকার জায়গা পেল এক বাংলাদেশীর বাড়ির বেসমেন্টে। কোনো জানালা নেই। কোনো আকাশ নেই। তবে একটা বিছানা আছে। মাথার ওপর ছাদ আছে। এর চেয়ে বেশী আর কি চাওয়ার থাকতে পারে? বাড়িভাড়া আর খাবার খরচটা কোনোমতে উঠে আসছিল ‘সাবওয়ে’ তে কাজ করে। কিন্তু এভাবে কতদিন? একটা চাকরি ঠিকমতো না পেলে কি করে চলবে রোহিতের? হতাশার কালো চাদর রোহিতকে যখন প্রায় পুরোপুরি ঢেকে ফেলেছিল তখন সুমিত্রর সাথে দেখা হয়ে গেল রোহিতের। চার-পাঁচটা মনিহারী দোকান আছে সুমিত্রর। আছে ব্রংক্সে গ্যাস স্টেশন। কুইন্সে দু’টো ‘সাবওয়ে’র ফ্র্যাঞ্চাইজ। তার একটিতে ম্যানেজারের সহকারী করে নিয়ে নিল রোহিতকে। সুমিত্র নতুন আর একটা ‘সাবওয়ে’ কেনার চিন্তা করছে। প্রতিশ্রুতি মিলল ঠিক মত কাজ করতে পারলে সেখানে ম্যানেজার হিসেবে রোহিতের স্থান হতেও পারে।
বসের বাড়িতে পার্টিতে মাঝে মাঝে আসা হয় রোহিতের। রোহিত সুদর্শন। প্রায় ছ’ফুট লম্বা। সেই আকর্ষণে প্রথম প্রথম অনেকে এসে কথা বলত রোহিতের সাথে। তাদের মাঝে অনেক মধ্যবয়সী বৌদি আর তাদের কন্যারাও ছিল। কিন্তু যখন প্রকাশ পেল রোহিত সুমিত্রর কর্মচারী এবং শুধুই এক সহকারী ম্যানেজার তখন এ সব পার্টিতে রোহিতের মূল্য পাপোশের চেয়েও নগণ্য হয়ে উঠল। ওকে অনেকেই ফুট-ফরমাস খাটায়। রোহিতের ভীষণ রাগ লাগে কিন্তু বসের বন্ধুদের না বলতে পারে না। সেই রাগটুকু গিয়ে পড়ে সুমিত্রর ওপর আর কিন্নরীকে পাবার ইচ্ছেটা আরো বেশী করে রোহিতের বুকে মাথা ঠুকতে থাকে। মাঝে মাঝে রোহিতের মনে হয় কি হবে এদেশে এরকম মানবেতর জীবনযাপন করে? বেসমেন্টের এই বাক্সের মধ্যে নিউ ইয়র্কের হৃদয়-বরফ করা শীতের মাঝে কাঁপতে কাঁপতে? ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরের রাস্তার ধুলো সারা গায়ে মাখতে। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সেই হতাশাগুলো যখন মহীরুহ হয়ে উঠতে থাকে তখন কিন্নরীর স্বপ্ন রোহিতের বোধে আশার স্ফুলিঙ্গটুকু জ্বালিয়ে রাখে। সপ্তাহে ছ’দিন পনের-ঘন্টা-করে-কাজ-করা ক্লান্ত বিধ্বস্ত নিষ্পিষ্ট অনুভবে কামনার ইন্ধন জোগায়। রোহিতকে সচল রাখে।
রোহিতের করোটির নিবিড়ে স্বপ্নের ধিকিধিকি আগুনে নিয়ত হাওয়া দিতে থাকে কিন্নরী নিজেও। রোহিত পার্টিতে এলে দূর থেকে অপলকে তাকিয়ে থাকে রোহিতের দিকে। রোহিত সুমিত্রর সাথে কথা বলতে থাকলে কিন্নরী কাছে এসে চপল আঙুলে সুমিত্রর জামার বোতাম নিয়ে খেলে, আদুরে গলায় নখরা করে সুমিত্রর সাথে আর রোহিতের চোখে চোখ রেখে কটাক্ষ করে। শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ঢেউ খেলিয়ে ফেনিয়ে তোলে রোহিতের মোহমুগ্ধতা। যেন বলে, ‘আমাকে ঘোড়ামুখো বলেছ না? দেখ, ভালো করে দেখ আমি কি।’ ছাব্বিশ বছরের রোহিতের অনুভব নিয়ে এরকম নয়ছয় খেলা আগে কেউ কখনো খেলেনি। রোহিত বড় হয়েছে বড় বেশী আইন-শৃঙ্খলার মধ্যে। সেখানে ওর জীবনে কোনো নারীর আগমনের সামান্যতম সুযোগও তৈরী হয় নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে মেয়েদের সাথে কথা হয়েছে, পরিচয় হয়েছে। কিন্তু সেই পরিচয়কে আরো গভীরে নিয়ে যাবার মতো সাহস রোহিতের হয় নি। বাবার রক্তিম চোখ সবসময় রোহিতকে ভীত, সংযত করে রেখেছে। কিন্নরী শুধু চোখের চাওয়ায়, ঠোঁটের হাসিতে, হাতের দোলায় নরম কাগজের মত রোহিতের মনোজগত দুমড়েছে, মুচড়েছে, ছুঁড়ে ফেলেছে এক কোণে। কুঁচকানো মন মসৃণ করে কিন্নরীর সামনে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে উঠতে পারে নি রোহিত। কিন্নরী যেন রোহিতের মস্তিষ্কের নিবিড়ে লেখা প্রতিটি বাক্য পড়ে ফেলতে পারে, আয়নায় নিজের প্রতিফলনের মতো পরিষ্কার বুঝতে পারে রোহিত কি চায়। আর রোহিতকে আবিষ্কার করে ফেলে শিকারী বেড়ালের মতো রোহিতকে নিয়ে উত্তেজনায় ভরা ভয়ংকর খেলায় মাতে।
মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে সুমিত্র দেশে গিয়েছিল। ব্যবসা দেখাশোনার জন্য কিন্নরী সুমিত্রর সাথী হয় নি। কিন্নরী সুমিত্রর সহধর্মিনী এবং সহকর্মিনী। দু’জনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্যবসা চালায়। কিন্নরী সাধারণত খোঁজ রাখে মনিহারী দোকানগুলোর আর সুমিত্র গ্যাস স্টেশন আর খাবারের দোকানের। সুমিত্র না থাকায় কিন্নরী প্রতিদিনই আসে রোহিতের ‘সাবওয়ে’তে। ম্যানেজারের সাথে বসে টাকা-পয়সার হিসেব করে। পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে রোহিত হিসেব দেখে। কাজ শেখে। এ এক অন্য কিন্নরী। সব হিসেব-নিকেশ যার নখের ডগায়। সামুরাইয়ের তলোয়ারের মতো খাপহীন, ধারালো, ঝকঝকে। কিন্নরীর ব্যবহারে কর্কশতা নেই কিন্তু এক অদৃশ্য ওজন যেন ভর করে কিন্নরীর আচরণে। বোঝা যায় রোহিত আর ওর সহকর্মীদের জগতের মালিক কিন্নরীই।
সে রাতে কিন্নরীর তালিকায় রোহিতদের দোকান ছিল সব শেষে। সব হিসেব-নিকেশ শেষ করতে করতে রাত দশটা বেজে গিয়েছিল প্রায়। দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে গিয়েছিল। কিন্নরীকে হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে ম্যানেজার বাড়ি চলে গিয়েছিল। কিন্নরী রান্নাঘরে ঢুকে দেখে নিচ্ছিল সব পরিষ্কার ঝকঝকে আছে কিনা। প্রতি রাতে রোহিতের দায়িত্ব দোকান বন্ধ করার। শেষ খদ্দেরকে বিদায় করে রোহিত অপেক্ষা করছিল ভেতর থেকে কিন্নরীর বেরিয়ে আসার।
‘ও বন্ধ করার সময় হয়ে গিয়েছে না? সরি তোমার দেরী করিয়ে দিলাম।’ কাজ শুরু করার পর থেকে রোহিতের সাথে তুমি সম্বোধনে নেমে এসেছে কিন্নরী।
‘না, না, ঠিক আছে।’
‘না, ঠিক নেই। সেই সকাল সাতটা থেকে কাজ করছ। এখনতো শরীর চায় বাড়ি ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে, নয়? চল তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেই।’
‘না, না, তার দরকার হবে না। বেশী তো দূর না। এক ব্লক হাঁটলেই সাবওয়ে স্টেশন। বাড়ি ফিরে যেতে পনের মিনিটও লাগবে না।’
‘বুঝলাম। এখন কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে ওঠ।’ কিন্নরীর কন্ঠে মালিকের ওজনটা ফিরে এল আবার। কালো ক্যাডিলাক এসকেলেড চালায় কিন্নরী। বিশাল গাড়ি। আটজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতে পারে। রোহিত উঠে এল কিন্নরীর পাশের সিটে। রমণীর স্পর্শ মাখা মিষ্টি একটা সৌরভ ছড়িয়ে আছে গাড়িতে। অনুভব অবশ হয়ে যায়। কিছুদূর এগিয়ে একটা রেস্তোরাঁর পার্কিং লটে গাড়ি থামাল কিন্নরী।
‘তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে খাওয়া হয় নি। আমিও খাই নি। চল তোমাকে ডিনার খাওয়াই।’ কিন্নরীর কথাই সিদ্ধান্ত। তাতে প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ রোহিতের নেই। ওরা ঢুকল টিজিআই ফ্রাইডে-তে। শুক্রবার রাতে এই স্পোর্টস-বার আর রেস্তোরাঁ লোকের ভিড়ে জমজমাট। কোলাহলে কান ঝালাপালা হবার যোগাড়। সাধারণ টেবিলে কোনো জায়গা ছিল না। দু’টো চেয়ার খালি ছিল বারে। ওরা সেখানে এসেই বসল।
‘ও, আই নিড এ ওয়াইন। তুমি কি খাবে? বিয়ার?’
‘চলতে পারে।’
রেড ওয়াইনের গ্লাশ রোহিতের বিয়ারের বোতলে ঠেকিয়ে ‘চিয়ার্স’ করল কিন্নরী। গ্লাশে ছোট চুমুক দিয়ে মুখটা হাসিতে ভরে উঠল ওর। সারাদিন যে গাম্ভীর্যের খোলসে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিল তা ঝেড়ে ফেলে পার্টির কিন্নরী হয়ে উঠল নিমেষে। ভুলে গেল রোহিত আর ওর মাঝের ব্যবধান। গল্পে ডুবে গেল ওরা।
‘তোমার দেশে কে কে আছে?’
‘মা-বাবা, দু’টো ছোট বোন। স্কুলে পড়ে ওরা।’
‘তোমাকে একা একা আসতে দিল?’
‘আসলে আমাকে তো স্পন্সর করেছে বড় মামা। মার ধারণা ছিল বড় মামার বাড়িতে আমি থাকব। বড় মামা আমার দেখ-ভাল করবে। এখানের মাটিতে পা দেবার সাথে সাথেই যে বড় মামা আমাকে আলাদা করে দেবে তা জানলে হয়তো বা ওরা নাও পাঠাতে পারতো। তা ছাড়া বাবা আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে আছে। বোনদের দায়িত্ব নেবার। বাবা কলেজে ফিজিক্স পড়ায়। তার সাথে ব্যাচে ছাত্র পড়িয়ে আমাদের সংসার বেশ ভালো মতোই চলে যায় কিন্তু বোনদের বিয়ে মানে তো একটা বিরাট খরচ। আমি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দাঁড়িয়ে যাব। ততদিনে ওদেরও পড়াশুনা শেষ হয়ে আসবে। এ সব হিসেব বাবার মাথায় আছে।’
‘বাবা, তাহলে তো তোমার অনেক দায়িত্ব! এই ‘সাবওয়ে’তে ঘষতে থাকলে তোমার পোষাবে নাকি? শোনো তুমি চেষ্টা কর কোনো একটা ডিগ্রী করার। অনেক ধরণের ডিপ্লোমা আছে। মেডিক্যাল এসিস্টেন্ট, ফার্মাসিস্ট এসিস্টেন্ট। দেড়-দু’ বছরের মধ্যে ডিগ্রী করে ফেলতে পারলে ভালো চাকরি পেয়ে যাবে। অবশ্য সুমিত্র যদি তোমাকে সাহায্য করে তাহলে কিছুদিন কাজ করে এক্সপেরিয়েন্স হলে আরো ভালো কোনো জায়গায় ম্যানেজারের কাজ পেয়েও যেতে পারো। তোমার তো মাস্টার্স আছে। এমবিএ করারও চিন্তা করতে পারো।’
‘পড়াশুনা তো করতে চাই। কিন্তু প্রতিদিন পনের ঘন্টা কাজ করে কখন পড়ব বলুন। আর কাজটা তো করতে হবে। না হলে থাকা-খাওয়ার খরচ আসবে কোত্থেকে?’
‘তা ঠিক। কি জানো প্রথম প্রথম সবাইকেই এ কষ্টগুলো করতে হয়। তোমার বয়স কম। ভিসার সমস্যা নেই। তোমার জন্য বড় জোর দু’ বছর লাগবে নিজেকে গুছিয়ে নিতে। ভাবো যারা জীবনের অর্ধেক পার করে আসে তারা কি রকম ভয়াবহ ডিপ্রেশনে ভোগে?’
ওদের খাবার চলে এসেছিল। কিন্নরীর পরামর্শে রোহিত নিয়েছিল ক্যাজুন চিকেন। নিউ অরলিন্স ঘরানার ঝালঝাল রান্না রোহিতের বেশ ভালো লাগছিল। বিয়ারের আবহে স্বাদটা যেন আরো সম্পৃক্ত হয়ে উঠছিল। কিন্নরী নিয়েছিল এক বাটি সালাদ। ওয়াইনের দ্বিতীয় গ্লাসটা শেষ করে চুমুক দিচ্ছিল তৃতীয় গ্লাসে।
‘তোমার মানি-ব্যাগে যে ছবিটা আছে সেটা দেখাবে না?’
‘মানি-ব্যাগে ছবি? কার ছবি?’
‘লুকিও না। সব ছেলেরই মানি-ব্যাগে একটা ছবি থাকে। তুমি তো জাস্ট দেশ থেকে এসেছ, তোমার মানি-ব্যাগে তো আরো বেশী থাকার কথা। মন একটু খারাপ হলে বের করে দেখ না?’
‘কিসের কথা বলছেন, আমি তো কিছুই বুঝছি না।’
‘দেশে কাউকে রেখে আস নি? যার জন্য মন পোড়ে। তার ছবি নেই তোমার মানি-ব্যাগে?’
‘এ রকম কেউ থাকলে তো, তার পর না ছবি।’
‘বল কি, কেউ নেই তোমার? ভালোবাসার মানুষ।’
‘না, সে সুযোগ হয় নি। বাবা-মা এত কড়া শাসনে আমাদের বড় করেছেন যে ওসবের কথা ভাবার সাহসই হয় নি।’
‘আনবিলিভেবল। একটা ইয়াং ছেলে তুমি আর প্রেম করো নি? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না!’
‘কিভাবে বিশ্বাস করাব আপনাকে? আমার কোনো প্রেম হয় নি, কোনো প্রেমিকা নেই।’ রোহিতের কন্ঠে ঈষৎ ঝাঁঝ ফুটে ওঠে। বিয়ারের তৃতীয় বোতলটা লম্বা চুমুকে শেষ করে কাউন্টারের ওপর শব্দ করে রাখে। ওকে রেগে উঠতে দেখে যেন মজা পায় কিন্নরী। ওকে আরো একটু খোঁচায়।
‘কোনো মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হয় নি?’
‘না হয় নি। ইউনিভার্সিটিতে কথা হয়েছে, গল্প হয়েছে, কিন্তু বন্ধুত্ব বলতে যা বোঝায় তা হয় নি। আমার সব বন্ধু ছেলে, কোনো মেয়ে নেই।’ রোহিতের গলা আরো জোরালো হয়ে ওঠে।
চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক নিয়ে কিন্নরী রোহিতের দিকে ঝুঁকে বলে, ‘আচ্ছা কাউকে চুমু খেয়েছ?’
রোহিতের কান দু’টো গরম হয়ে ওঠে। কথা সরে না। শুধু দু’পাশে মাথা নেড়ে না-বোধক উত্তর দেয়।
‘কারো হাত ধরেছ?’ কিন্নরীর গলা অবরুদ্ধ ঠাট্টার হাসিতে খসখসে হয়ে ওঠে।
‘আপনার হাত ছাড়া আর কারো হাত ধরি নি।’ রোহিতের মাথাটা খাবারের প্লেটের সাথে প্রায় মিশে যায়।
‘তাহলে তুমি পুরোপুরি ভার্জিন? আনবিলিভেবল। তুমি তো এইটথ ওয়ান্ডার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড!’ কিন্নরীর চোখ দু’টো অষ্টমাশ্চর্য আবিষ্কারের আনন্দে চকচক করে ওঠে। কিন্নরীর খোঁচায় দমে-যাওয়া রাগটা আবার ফিরে আসে রোহিতের মনে।
‘আপনি কি থামবেন? এগুলো নিয়ে কথা বলতে আর ভালো লাগছে না।’ রোহিতের হঠাৎ ফেটে পড়ায় চমকে ওঠে কিন্নরী। চটপট ওয়েটারকে ডেকে চেকটা দিয়ে দৌড়ে বেড়িয়ে আসে রেস্তোরাঁ থেকে। কি এক প্রচন্ড তাড়া আছে যেন ওর। রোহিতকে তাড়া দেয়, ‘ওঠো গাড়িতে ওঠো। তাড়াতাড়ি।’
বাকীটা পথ কোনো কথা বলে না কিন্নরী। রোহিত ওর ঠিকানা বলে কিন্তু কিন্নরী যেন শুনতেই পায় না। কি একটা ঘোরের মধ্যে আছে যেন ও। বড় রাস্তা ছেড়ে পাশের ছোট পথে নেমে আসে কিন্নরী। এটা আবাসিক এলাকা। এত রাতে নিদ্রিত, নিঃশব্দ এ অঞ্চল। রাস্তার পাশে বড় একটা গাছের নীচের অন্ধকারে কিন্নরী থামায় গাড়িটা।
‘নেমে এ পাশে এসো।’ কিন্নরীর গলায় আদেশ।
কিন্নরী নিজেও নেমে পড়ে। পেছনের দরজা খুলে গাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। হাতের ইশারায় রোহিতকে আসতে বলে। বিশাল গাড়ির পেছনের সিটটা শুইয়ে দিয়েছে কিন্নরী। মাঝারি মাপের বিছানার মতো সিটে কিন্নরী আধশোয়া হয়ে আছে। রোহিত ভিতরে ঢুকতে দরজা বন্ধ করে কিন্নরী একটানে বুকের ওপর টেনে নিল রোহিতকে। এলকোহলের গন্ধভরা মাতাল উষ্ণ কিন্নরীর শ্বাস ভিজিয়ে দিল রোহিতের মুখ। প্রচন্ড শক্তিতে রোহিতকে জড়িয়ে ধরে কিন্নরী কামড়ে ধরল রোহিতের ওষ্ঠাধর। রোহিতের বোধ-বুদ্ধি-চেতনা-বিবেচনা সব মুছে ঝাপসা হয়ে গেল। কোনো নিয়ন্ত্রণ রইল না নিজের ওপর। ঠিকমত কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবিষ্কার করল কিন্নরীর শরীরের গভীরে প্রবিষ্ট হয়ে আছে ও। দু’পা দিয়ে সাঁড়াশির মতো রোহিতের কোমর আঁকড়ে ধরে কিন্নরী চালিত করছে রোহিতকে। যেন রোহিতকে নিজের শরীরের সাথে পিষে ফেলে একাকার করে ফেলবে। একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল রোহিত। মনে হতে থাকলো সময় যেন স্থির হয়ে আছে। যেন অনন্তকাল ধরে কিন্নরীর সাথে এক সত্ত্বা হয়ে নাগরদোলায় দুলছে ও। তারপর কখন সেই দোলনা থামলো, কখন কিন্নরী রোহিতকে ওর বাড়ির দোরগোড়ায় নামিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেল তার কিছুই মনে রইল না রোহিতের। ভোর ছ’টার সময় এলার্মের শব্দে সুষুপ্তি থেকে এক ঝটকায় বের হয়ে রোহিত আবিষ্কার করল ওর পরনে এখনো গত কালের টি-শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট। রোহিতের মনে গত রাতের স্মৃতি তন্দ্রায় ঢুলতে ঢুলতে দেখা কোনো ছায়াছবির মতো টুকরো টুকরো ভেসে উঠতে লাগলো। কিন্নরীর একটু কথা, ঠোঁটে জ্বালা-জ্বালা ভাব, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নখের আঁচড়। কিন্তু রোহিত কিছুতেই গত রাতে যা হয়েছে তার পুরো ছবিটা মনের ভেতর ফুটিয়ে তুলতে পারলো না। ওর মানসপটে কিছুতেই ভেসে উঠল না কিন্নরীর নগ্ন শরীরের ছবিটা। ওর স্বপ্ন ছিল কিন্নরীকে মন্থন করার। সেই স্বপ্ন বাস্তবের অবয়ব নিয়ে নেমে এসেছে মাটিতে। কিন্তু স্মৃতির পাকস্থলীতে সেই ছবি রোমন্থন করতে না পেরে এক অদ্ভুত অতৃপ্তি গ্রাস করে নিল রোহিতকে। কিন্নরীকে পেয়েছে আবার পায় নি। কিন্নরীকে আবার পাবার ক্ষুধা রোহিতের অনুভবে আরো গভীর হয়ে কেটে কেটে বসতে থাকলো।
সারাদিন কি করে কাজ করল রোহিত জানে না। কিন্নরীকে দেখার অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে রইল ওর প্রতিটি নিউরন। কিন্নরী এল। রোহিত হাসি মুখে এগিয়ে এল কিন্তু কোনো ভাঁজ পড়ল না কিন্নরীর মুখে। যেন রোহিতকে চেনে না কিন্নরী। যেন রোহিতকে দেখতে পায় নি। যেন অদৃশ্য মানব হয়ে গেছে রোহিত। কাজ শেষ করে চলে গেল কিন্নরী। একবার ফিরে তাকিয়েও দেখল না রোহিতের দিকে। পরদিন আবার এল কিন্নরী। সেই একই রকম। কিন্নরী মালিক আর রোহিত কর্মচারী। ক্রোধের বোমা বিস্ফোরিত হতে থাকলো রোহিতের মস্তিষ্কে। নিজেকে বড় অকিঞ্চিৎকর মনে হতে থাকলো। মনে হতে থাকলো ওর অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কিন্নরী ধর্ষিত করেছে ওকে। যেখানে রোহিতের বাহুর শৃঙ্খল কিন্নরীকে নিষ্পেষিত করার কথা ছিল সেখানে নিজে কিন্নরীর হাতে ব্যবহৃত হয়ে রোহিতের পৌরুষ জ্বলে উঠছিল।
পরদিন থেকে সুমিত্র আবার ফিরে এল কাজের দেখাশোনায়। প্রতিদিন কিন্নরীর সাথে দেখা হওয়া বন্ধ হয়ে গেল রোহিতের। কি করবে রোহিত? কি ভাবে প্রতিশোধ নেবে? কি ভাবে প্রতিষ্ঠা করবে নিজের অধিকার? সুমিত্রর সাথে থাকলে চলার পথ অনেকটাই মসৃণ হবার সম্ভাবনা আছে। সেটা ঠেলে ফেলে সুমিত্রকে জানিয়ে দেবে সব কথা? সুমিত্র কি বিশ্বাস করবে? সত্যি তো, কেউ কি বিশ্বাস করবে? কিন্নরীর মতো এক অসাধারণ রমনী গাছের নীচে গাড়ির ভেতর রোহিতের মতো সামান্যের সাথে মৈথুনে লিপ্ত হয়েছে। এ কি বিশ্বাস করার মতো কথা? সবাই ভাববে রোহিতের হয়তো মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাহলে কি করে সাহস হয় কিন্নরীর নামে কুৎসা রটনায়? নির্ঘুম রাতে বিছানায় একাকী শুয়ে রোহিত চেষ্টা করে মাথা ঠান্ডা রাখবার। ভাবে যা হবার হয়ে গেছে এখন নিজেকে গুছিয়ে নেবার পালা। সুমিত্রর সাথে থেকে ভবিষ্যতের ভাবনা করা। রোহিত নিজেকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে কিন্তু হঠাৎ দোকানে অথবা অন্য কোথাও কিন্নরীকে দেখলে রোহিতের মাথায় ৎসুনামি আছড়ে পড়ে। অনেক কষ্টে দাঁতে দাঁত চেপে রোহিত নিজেকে শান্ত করে।
দিন গড়ায়। সুমিত্র রেখেছে ওর প্রতিশ্রুতি। নতুন ‘সাবওয়ে’তে ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়েছে রোহিতকে। রোহিত কাজকর্ম ঠিকমতোই শিখে নিয়েছে এর মধ্যে। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না দোকান চালিয়ে নিতে। সুমিত্র খুশী রোহিতের কর্মদক্ষতায়। আর রোহিতের ঘরের সঙ্গীরা কাতর ঈর্ষায়। দেশ থেকে আসার এক বছরের মধ্যেই রোহিত বেশ গুছিয়ে নিয়েছে নিজেকে। সুমিত্রর মতো প্রতিষ্ঠিত একজন নিজের হাতে রোহিতের ভবিষ্যত তৈরী করে দিচ্ছে। রোহিতও প্রাণপণ পরিশ্রম করে সুমিত্রর কাছে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করে তুলছে। জীবন সংগ্রাম মোটামুটি গুছিয়ে আসার সাথে সাথে রোহিতের মনোজগতের সংক্ষোভও অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। এখন আর দেশে ফিরে যাবার জন্য ছটফট করে না। চারপাশের জগতের সাথে মানিয়ে নিয়ে নিজের জীবনটা একটা ছকে নিয়ে এসেছে। আর তার সাথে কিন্নরীর জন্য পাগল-পাগল টানটাও উধাও হয়ে গেছে। তবু সারাদিন পর ক্লান্ত শরীরে বিছানায় গা এলিয়ে দেবার পর একটা ব্যথা চিনচিন করে রোহিতের বুকে বাজে। বুকের ত্বকের ওপর কিন্নরীর নখের আঁচড় যেন অনুভব করতে পারে। অনেক দিন কিন্নরীর সাথে দেখা হয় না। কি নিয়ে যেন ব্যস্ত সুমিত্র আর কিন্নরী। অনেকদিন কোনো পার্টি হয় না ওদের বাড়ি। সুমিত্রর ফোনের আলাপন শুনে রোহিত জেনেছে লং আইল্যান্ডে বাড়ি বানাচ্ছে ওরা। নতুন বাড়ি তৈরী হলে ম্যানহাটনের এপার্টমেন্টটা ভাড়া দিয়ে ওখানে চলে যাবে। হয়তো বা তা নিয়েই এত ব্যস্ততা।
শুক্রবার বিকেলে সুমিত্র দোকানে এসে বলল, ‘রোহিত, রোববার দুপুরে আমার মাসির বাড়িতে একটা পার্টি আছে। তুমি এস। নিউ জার্সি থাকেন। এই যে ঠিকানা।’
‘কি অনুষ্ঠান বস?’
‘তেমন কিছু না। অনেকদিন কোনো পার্টি হয় না আর আমরাও নতুন বাড়ি নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে পার্টি-ফার্টি খুব একটা করে উঠতে পারছি না। তাই মাসির বাড়িতেই পার্টি হচ্ছে। তুমি অবশ্যই এস।’
রোববার পনের বছরের পুরোনো ফোর্ড টরাসে করে কুইন্স থেকে নিউ জার্সির এডিসনে আসতে অনেকটাই দেরী হয়ে গেল রোহিতের। প্রায় আড়াইটা বাজে। পার্টি নিশ্চয়ই এখন শেষের পথে। বিশাল দোতলা বাড়ির সামনে কম করে হলেও একশটা গাড়ি। জমজমাট পার্টি হচ্ছে তাহলে। রোহিত এসে বেল টিপতে বেশ কিচ্ছুক্ষণ পর একটি কিশোরী দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিল।
‘ভেতরে চলে যান। সবাই ওখানে। এই মাত্র শুরু হয়েছে।’
কি শুরু হয়েছে তা রোহিত জিজ্ঞেস করার আগে মেয়েটি দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। তার পিছু পিছু রোহিত। কমিউনিটি সেন্টারের হলঘরের মতো বিশাল লিভিং রুম। সেখানে গোল হয়ে জড় হয়েছে অসংখ্য লোক। তার মাঝখানে কিছু একটা ঘটছে কিন্তু এত মানুষের মাথা গড়িয়ে কিছুই দেখতে পারছে না রোহিত।
‘আপনি এই মাত্র এলেন? যান এগিয়ে যান, না হলে কিছু দেখতে পাবেন না।’ কে যেন বলল রোহিতকে। জনতার ফাঁক গলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল রোহিত। মাঝখানে টেবিলের ওপর থরে থরে খাবার সাজানো। আর তার ওপারে চেয়ারে রাজরাণীর মতো বসে আছে কিন্নরী। পরণে বেগুনী বেনারসী শাড়ি। সারা গা ভর্তি গয়না। মাথায় মুকুট। প্রশান্ত লাজনম্র মুখে মিষ্টি হাসি। কিন্নরীকে এরকম আঙ্গিকে আগে কখনো দেখে নি রোহিত। নতুন বৌয়ের মতো লাগছে ওকে। কিন্নরীর পেছনে চেয়ারের হাতল ধরে গর্বিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সুমিত্র। টেবিলের ওপর একটা কার্ডের ওপর বড় বড় করে লেখা ‘কিন্নরীর সাধ’। কে যেন বলে উঠল, ‘এই সুমিত্র, খাইয়ে দাও কিন্নরীকে। দেরী করছ কেন?’
রোহিতের মাথাটা দুলে ওঠে। সাধ জানি কখন হয়? সাত মাসে না? এখন ফেব্রুয়ারী। কিন্নরী যেদিন ঊর্ণনাভের মতো জড়িয়ে ধরে রোহিতের সারাৎসার শুষে নিয়েছিল সে তারিখটা তো রোহিতের চেতনায় স্থায়ীভাবে এসিড গিয়ে খোদাই করা আছে। সাতই জুলাই। হিসেবটা কি মেলে? এত মানুষের মাঝে রোহিতের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ঠেলে-ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে রোহিত। দেয়ালে হেলান দিয়ে ঠান্ডা হাওয়ায় শ্বাস নিতে নিতে চেষ্টা করে নিজেকে শান্ত করতে। অপূর্বস্পৃষ্ট রোহিতের বীর্য গর্ভাধান করেছে কিন্নরীর? রোহিতের ডিএনএ নিয়ে কিন্নরীর জরায়ুতে বড় হচ্ছে অনাগত নবজাতক? রোহিতের প্রথম সন্তান আর তার ওপর কোনো দাবী থাকবে না তার? সুমিত্রকে বাবা ডেকে রোহিতের চোখের সামনে বড় হবে সেই শিশু? রোহিত আর ভাবতে পারে না। এক দৌড়ে গাড়িতে উঠে উন্মাদের মতো চালিয়ে ঘরে ফিরে আসে। ফাঁকা ঘরে রোহিত অনেকক্ষণ একা একা কাঁদে। ওর রাগ হয় না। বরং নিজেকে বড় বঞ্চিত, ব্যবহৃত মনে হয়। খুব অসহায়, একাকী লাগে।
পরদিন দোকানে এসে সুমিত্র বলে, ‘কি ব্যাপার তোমাকে কালকে দেখলাম না যে?’
‘কনগ্র্যাচুলেন্স বস। আমি গিয়েছিলাম। অত মানুষের ভিড়ে আপনি মনে হয় আমাকে দেখতে পান নি।’
‘বুঝতেই পারছ কেন এত ব্যস্ত ছিলাম আমরা। ডাক্তার কিন্নরীকে প্রথম দিকে সাবধানে থাকতে বলেছিলেন। বিয়ের অনেকদিন পর প্রেগন্যান্সিতো তাই একটু বাড়তি সাবধানতা। তাই এতদিন আমরা একটু লো-প্রোফাইলে ছিলাম। তাছাড়া নতুন বাড়িতো আছেই। বাচ্চার ঘর। ন্যানির থাকার জায়গা। এসব তো আর এ্যাপার্টমেন্টে হবে না। যাহোক, আপাতত বেশ কিছুদিন কিন্নরীর আর আমাকে হেল্প করা হবে না। এখন তোমরা যারা আছ ম্যানেজার লেভেলে তাদের ওপর অনেক দায়িত্ব এসে পড়বে। তোমাদের হেল্প এখন আমার অনেক দরকার। আর ইউ আপ টু ইট রোহিত?’
‘নিশ্চয়ই বস। যা লাগবে বলবেন। আমি করে দেব।’
রোহিত আক্ষরিক অর্থেই সুমিত্রর ডান হাত হয়ে উঠল। এত নানা ধরণের ব্যবসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সুমিত্রর তা সুমিত্রর সাথে না ঘুরলে রোহিতের ধারণাই হতো না। সুমিত্র ওকে ব্যস্ততার চরমে নিয়ে গেল যেখানে নিজের অনুভবের, বঞ্চনার, ক্ষোভের কথা ভাবার কোনো সুযোগই রইল না রোহিতের। সুমিত্র রোহিতকে অনেক, অনেক উপরে ওঠার পথ খুলে দিতে থাকলো। অনেক নতুন নতুন যোগাযোগ তৈরী হতে থাকলো রোহিতের। সুমিত্র ভালোবাসে রোহিতকে। দায়িত্ব দিয়ে নির্ভর করে। রোহিত তা বোঝে আর সুমিত্রর প্রতি কৃতজ্ঞতায় কিন্নরীর বিরুদ্ধের সমস্ত অনুযোগ-ক্রোধ-ঘৃণা অবচেতনের গভীরে চাপা দিয়ে রাখে। কখনো প্রকাশিত হতে দেয় না।
দুপুরে ফোন এল সুমিত্রর, ‘রোহিত আমাদের মেয়ে হয়েছে আজ সকালে। মেট্রোপলিটনে। তুমি পারলে এস।’
বিকেলে এক ফাঁকে বেরিয়ে পড়ল রোহিত। বিশাল একটা ফুলের তোড়া কিনল। কিনল ‘ইটস এ গার্ল’ লেখা একটা কার্ড। নার্স ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল কিন্নরীর ঘরে। কিন্নরী চোখ বুঁজে শুয়ে আছে। প্রশান্ত, পরিপূর্ণ চেহারা। পাশের সোফায় বসে আছে সুমিত্র। ওর হাতটা কিন্নরীর হাত জড়িয়ে আছে। রোহিতকে দেখে উঠে দাঁড়াল সুমিত্র। বিছানার পাশের দোলনায় হাসপাতালের সাদা চাদরে মোড়া ছোট এক শিশু অঘোরে ঘুমাচ্ছে। রোহিতের চোখ দু’টো ছলছল করে ওঠে। এই কি সে? রোহিতের প্রথম উত্তরসুরি? কি অপূর্ব সুন্দর। নিটোল, নিখুঁত। একে কোনোদিন রোহিতের কোলে নেওয়া হবে না। আদর করে দুলতে দুলতে ঘুমপাড়ানি গান গাওয়া হবে না। এর বেড়ে ওঠার সাথে রোহিতের কোনো সম্পৃক্ততা থাকবে না। একটা প্রগাঢ় দুঃখবোধ অন্তঃসলিলা নদীর মতো রোহিতের বোধে বয়ে যেতে থাকে।
কিন্নরী চোখ খুলল। রোহিতকে দেখে একটা অদ্ভুত হাসিতে ভরে উঠল ওর মুখ। কি লেখা আছে ওই হাসিতে? কৃতজ্ঞতা? উপহাস? রোহিত পড়তে পারে না। কিন্নরীর প্রতি ওর বিরূপতা আবারো ছোবল-তোলা নাগের মতো জেগে ওঠে।
‘কনগ্র্যাচুলেশন্স। কেমন আছেন?’ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বলে রোহিত।
‘ভালো, খুব ভালো। একটা নাম দাও না, রোহিত। আমরা অনেকগুলো ভেবেছি কিন্তু কোনটাই ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। তুমি তো বাংলা খুব ভালো জানো। ঠিক করো না একটা নাম।’ কিন্নরীর কন্ঠ থেকে মিনতি ঝরে পড়ে। এটাই কি রোহিতকে দেয়া কিন্নরীর সম্মান? সন্তানের নাম ঠিক করতে দিয়ে রোহিতকে একটু অধিকার দেয়া? ভাষা-তত্ত্বের ছাত্র রোহিতের মনে হঠাৎ করেই অনেক কঠিন কঠিন শব্দ জেগে ওঠে। জারজাত, ক্ষেত্রজ, ভ্রামরী, পরভ্রূণ, স্খলিতা, ব্যভিচারিণী, জাতিভ্রষ্টা। কিন্তু মাৎসর্য অতিক্রম করে রোহিত কিছুতেই ফুলের মতো ফুটফুটে, নিষ্পাপ, নিরব শিশুর জন্য উপযুক্ত নাম খুঁজে পায় না॥