বাঙালি ।। মুহম্মদ নূরুল হুদা
সংগ্রহ, শনিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১২


জয় হোক জয়
বাংলার জয় হোক বাঙালির জয়
মাতৃভাষার জয়, ভাষাযুদ্ধে গাজী ও শহীদ সব সহযোদ্ধার জয়,
জাতিত্বের মুক্তিযুদ্ধে অকুতোভয় জাতিযোদ্ধার জয়
জলেস্থলে-অন্তরীক্ষে একাত্তরের বাঙালির জয়
স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশে সার্বভৌম বাঙালির জয়
জয় হোক
জয় হোক
জয় হোক
জয়

বাঙালি, তোমার সুরক্ষা মানে জয় বাংলা, আর কিছু নয়
জয় বাংলা মানে চিরমুক্তিবুভুক্ষু গণবাঙালির জয় অক্ষয়
জয় বাংলা মানে জলেস্থলে বিবর্তিত নৌকা, নদী, বঙ্গভুমিরূপী বেহুলার জয়
জয় বাংলা মানে স্বাধীন সার্বভৌম মনোভূমি আর লাল-সবুজের জয়
জয় বাংলা মানে প্রতি ইঞ্চি ভূমিজুড়ে শান্তিযোদ্ধা বাঙালির অভয় অক্ষয়
জয় বাংলা মানে বিজয় সিংহের সাজ, গোপাল রাখালরাজ,
আর তার ধারাস্রোতে জাতিপিতা বঙ্গবন্ধুর অনস্ত উদয়
জয় বাংলা মানে ইতিহাস কথা কয়,
যুদ্ধে যুদ্ধে বাঙালির নয় মাস,
অতঃপর ভবিষ্যলীন বাঙালি নির্ভয়

হানাদার আসে আর হানাদার যায়
বিশ্বাসঘাতক আসে, বিশ্বাসঘাতক যায়
সুযোগে যুদ্ধাপরাধীরাও রাজা হতে চায়
ছলেবলে, কখনো-বা তত্ত্বাবধায়কের আলখেল্লায়
এইমতো গণতন্ত্র পাশ কেটে রাজা আসে, রাজা ভেগে যায়

তবে সে-মুহূর্তে জয় বাংলার ডাক শোনা যায়
ধ্বনি থেকে জয়ধ্বনি, রূপ থেকে অরূপের শিঙা বেজে যায়,
অনন্তর আজান ও উলুধ্বনি, পবিত্র প্রার্থনা শুরু মন্দিরে-মসজিদে-গির্জায়

বাংলার মিলিত ধ্বনি বাঙালির গণরক্তে তোলে বিষফণা
বাঙালি করেনি কভু দাসত্বের অলঙ্কৃত অহং-বন্দনা।

শুরু হয় গণযুদ্ধ। লাঠি ও বৈঠার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে বাঙালির অনিবার্য জয়।
সেই জয় আনে মুক্তি দেহ-ও-মনের। সীমানার। মানবিক সব স্বাধীনতার।
তাহলে বলবো সেই স্বাধীনতার কথা।
অনাগত কাল ধরে বলবো সেই সমাগত মুক্তির কথা।
জনকের আকাশ-ছোঁয়া তর্জনী থেকে বজ্রবিদ্যুতের মহিমায় উদগীরিত সেই অগ্নি-কথা।
এক বজ্রবাঙালির পললস্রোতে অনাগত কালের সকল বাঙালির অগ্নিজঙ্গমের কথা।
তোমার আমার আর সকলের বুকে-মুখে প্রসারমান
ভাষাভূমির সত্তালীন নবপ্রজন্মের কথা।
এই ধানকাউন আর নবান্নের দেশে মাটিবর্তী
গণবাঙালির সার্বভৌম স্বপ্নের আবাদের কথা।

বাঙালি মানে এই দেশে, এই কালে, সর্বকালে, সীমানাসীমান্তহীন এক ভাষাভূমির উত্তরাধিকার।
বাঙালি মানে সর্ববর্ণ, সর্বধর্ম, সর্বগন্ধ, আচার-বিচার আর একবৃন্তে তামাটে মানুষের অঙ্গীকার।
বাঙালি মানে বায়ান্নটি অক্ষরের আদিচৈতন্যে নিজেকে সমর্পিত রাখার ভাষিক অধিকার।
বাঙালি মানে দিকে দিকে, জলেস্থলে, নভোতলে স্বপ্নসঙ্গমের ইতিহাসসম্মত অধিকার।

না,
বাঙালিত্ব নয় আত্মকু-য়ন, বাঙালিত্ব নয় বাংলার খালেবিলে ঘোনায়-মুড়ায় নিজেকে গুটিয়ে রাখা।
বাঙালিত্ব নয়সব দেশ মহাদেশ জুড়ে অগণন জনগোষ্ঠির ভাষিক সংস্কৃতিকে অগ্রাহ্য করা।
বাঙালিত্ব নয় পরধন লোভে লোকবাঙালির সৃষ্টি-সম্পদের মেধাসম্পদ অন্যের কাছে বিলিয়ে দেয়া।
বাঙালিত্ব নয় ঔপনিবেশিক প্রভুর পরিয়ে দেয়া সোনার কাঁকন মনে ও মননে আরো শক্ত করে বাঁধা।
বাঙালিত্ব নয় ঔপনিবেশিক নব্যবেনিয়ার হাহা উৎসবে উচ্ছিষ্টভোজী ভিখিরির হাত এগিয়ে হেয় হওয়া।
না, বাঙালিত্ব নয় বিশ্বের দূরতম প্রান্তে প্রস্ফুটিত মানবসৃষ্টির রূপরং আর বৈচিত্র্যকে অস্বীকার।

বাঙালিত্ব মানে সৃষ্টিবৈষম্যের কার্নিভালে আত্মবিক্রয়ের অবমাননানকর প্রদর্শনী সগর্বে প্রত্যাখ্যান।
বাঙালিত্ব মানে আগ্রাসী বৈশ্বিকতার বাণিজ্যভোজে আত্মবিক্রয়ের আমনন্ত্রণপত্রে সদর্পে অগ্নিসংযোগ।
বাঙালিত্ব মানে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সূর্যসেনের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, ফাঁসির মঞ্চে ক্ষুধিরামের গান।
বাঙালিত্ব মানে হাসন-লালন-মদনমোহন, হাজার নদীর স্রোতে লক্ষী, স্বরস্বতী, মা-দুর্গা আর মনসাভাসান।

বাংলায় জন্ম হলে কে নয় বাঙালি? - তুমি বাঙালি, আমি বাঙালি সে বাঙালি : আমরা সবাই জন্ম-বাঙালি।
তুমি জৈন, তুমি বৌদ্ধ, তুমি হিন্দু, তুমি মুসলমান, তুমি খ্রিস্টান, তুমি … তবে কর্মধর্মে আমরা সবাই বাঙালি।
আমি কালো, আমি সাদা, আমি গৌর-অগৌর, আমি অসবর্ণ … না, কালস্রোতে পরিশুদ্ধ আমরা সবাই বাঙালি।
জাতিধর্ম, বর্ণাবর্ণ, কর্মাকর্ম, চাষবাস, সর্বনাম নির্বিশেষে,- এ বাংলায় নৌকোজন্ম বেদের বহর,- সবাই বাঙালি।
সমতলে-উচ্চতলে সাঁওতাল-হাজং-গারো আর সব আদিবাসী : আমরা সবাই মিলে এ বাংলার সুষম সন্তান।
কেননা বাংলার সন্তান মানে এ-বাংলার জন্ম-শিশু;
জীবনে মরণে যারা নিত্য-অধিবাসী; হোক তারা নানামাতৃভাষী।
বাঙালিত্ব মানে পলি ও গিরি মানুষের মিলিত জীবনস্রোতে;
আমরা সবাই বাংলা মায়ের কাছে উদার অন্নপ্রার্থী।

তাহলে কে বাঙালি নয়?
এ প্রশ্নে সে-ই নিরুত্তর,
‘যে বলেনি বাংলার জয় হোক, বাঙালির জয়’।
এদেশে জন্মেও যার জন্মভূমি এদেশ নয়,
যে দূরদেশের তুষার বা মরুর স্বপ্নে বিভোর, সে বাঙালি নয়।
এদেশে জন্মে যার মনোভূমি
এই আউল-বাউল-ভাটিয়ালী-জারী-সারীর পলিভূমি নয়,
সে বাঙালি নয়।
এদেশে জন্মে যে মুক্তিযোদ্ধা নয়,
যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বসমর্পিত নয়,
সে অবশ্যই বাঙালি নয়।

বাঙালি নয় সেই দুষ্কৃতকারী,
যে সজ্ঞানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি।
বাঙালি নয় সেই আত্মঘাতী,
যে একাত্তরের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করেনি।
বাঙালি নয় সেই কূটকৌশলী,
যে প্রভুত্বের লোভে বাঙালিত্বের অখ-তা মান্য করেনি।
বাঙালি নয় সেই লুটেরা বেনিয়া, যে আত্মবিক্রয়ের উর্দি পরে
অর্থ ও বিত্তের লোভে লোকবাঙালির হক হালাক করেছে।
বাঙালি নয় সেই জন্ম-তস্করও,
যে বুকের সংগ্রহশালায় সুরক্ষিত রাখেনি প্রাগৈতিহাসিক প্রত্ন-বাঙালি।

ওম থেকে জলস্থল, ওম থেকে ভূম-ল,
ওম থেকে ব্রহ্মাণ্ডের বিকশিত ধন।
সেই ওমের নির্যাস নিয়ে সম্মোহিত, বিকশিত বাঙালির মনের মনন।
চ্ছলোচ্ছল জলস্রোতে, শালিখের উড্ডীন ডানায়, যখন উন্মন
শালতমালের শাখায় কিংবা বট-অশ্বত্থের ডানায়,
ওয়ারি-বটেশ্বরের তরুবাঙালি মুহূর্তেই ঘুরে আসে এ বিশ্বভুবন।

জাগো বাঙালি জাগো, জাগো প্লিনি টলেমির বাঙালি, জাগো;
জাগো, মানরিক-ফাহিয়েন-হিউয়েন সাঙের বাঙালি, জাগো;
জাগো, ইবনে বতুতার দৃষ্টিজুড়ে বেড়ে-ওঠা অবাক বাঙালি, জাগো;
জাগো, মাহুয়ান, হুহিয়েন, সি ইয়াং চাও কুং টিয়েন লু-র বাঙালি, জাগো;
জাগো, মিংশে-ভারথেমো, শু-ইউ-চুৎ-সিউলি-র বাঙালি, জাগো;
জাগো, দোম জোয়াও, বার্বোসা, জোয়াও দে বাররোসা-র বাঙালি, জাগো;
জাগো, র‌্যালফ ফিচ্, সিজার ফ্রেহাখি, জেসুইট মিশনারির বাঙালি, জাগো;
জাগো, বার্ণিয়ের, তাভার্ণিয়ের, টমাস বাউরির বাঙালি, জাগো;

কাল থেকে কালান্তরে, মন থেকে মনান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে জাগো হে বিশ্ববাঙালি;
হাকিম-আলাওল-মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দের শেকড়ে শেকড়ে হে বিশ্ববাঙালি;
জাতিপিতা মুজিবের রক্তবীজে আলোকের গতিতে তুমি ধারণ করো বিশ্বের সর্বপ্রান্ত;

যদিও তোমার উৎসের নাম এ-বাংলার জলস্থল-নভোতল,
তোমার ব্রহ্মাস্ত্রের নাম জয় বাংলা,
তোমার বিকাশের নাম এই পলি-পদ্মার সন্তরণশীল মনোভূমি,
তোমার যোদ্ধার নাম তিতুমীর কিংবা সূর্যসেন কিংবা সালাম বরকত কিংবা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিংবা নূর হোসেন কিংবা তাদেরই যুযুধান রক্তধারা,

তুমি উড়ে যাচ্ছো স্বপ্ন থেকে বাস্তবতায়,
উচ্চতম গিরিশৃঙ্গ থেকে গভীরতম সমুদ্রদেশ;
বিবর্তনের স্রোতে সিদ্ধ, মনে রেখো,
এই সত্য ভবিষ্যে অশেষ

যতদূর বাংলা ভাষা, ততদূর এই বাংলাদেশ

০৬.১২.২০১২

আর্টস-বিডিনিউজ২৪ এ প্রকাশিত