অর্ধেক তার করিয়াছে নারী... ।। লায়লা আফরোজ
এইদেশ উপস্থাপনা , শনিবার, মার্চ ০৮, ২০১৪


মুক্তক পদাবলির অনুষ্ঠান

আমরা অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করছি...
বাংলা সাহিত্যের প্রম নারী কবি চন্দ্রাবতী
রাজা রামমোহন রায়
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
এবং
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন

এই চার মহামানবের পূণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে। বাংলা সাহিত্যে প্রম নারী-সচেতনতার উন্মেষ, সতীদাহ-প্রারোধ, বিধবা-বিবাহ প্রচলন, নারী-শিক্ষা, নারী-জাগরণ
এবং পর্দা-প্রা বিলোপের জন্য এই সব সূর্যসন্তানেরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন! তাঁদের যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক সিধান্তসমূহ আইন হিসেবে গৃহীত ও বাস্তবায়নের
ফলে হাজার বছরের প্রচলিত সমাজব্যবস্থার অচলায়তনে নেমেছিল ধস। নন্দনতত্ত্বের বিকাশ এবং সমাজ সংস্কারক হিসেবে তাঁদের সে-সব অবদানের কথা যুগ যুগ
ধরে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এই বঙ্গীয় উপ-দ্বীপের বর্তমান ও ভাবীকালের সকল মানুষ।

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী...
১৯১০ সালের ৮ই মার্চ, প্রম 'নারী দিবস' ঘোষিত হয়। ২০১০ সালের ৮ই মার্চ 'আন্তর্জাতিক নারী দিবস' শতবর্ষ অতিμম করেছে। প্রম দিকে, সমাজতান্ত্রিক
রাষ্ট্রগুলোতে নারীর মর্যাদা সমুনড়বত রাখতে প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হত। তখন, স্বপড়বরাজ্য ইওরোপ এবং আমেরিকায় কেবল নারী এবং
অপ্রকৃতিস্থরাই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল! অর্থনৈতিক মুক্তি, মজুরীর সমঅধিকার, শ্রমঘণ্টা, শিক্ষার অধিকার, গর্ভধারণের সিদ্ধান্ত, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি নানা
মৌলিক মানবিক প্রশেড়ব ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সোচ্চার হয়েছে নারী নেত্রীরা কিন্তু তাঁদের সেইসব দাবিগুলো কখনো গুরুত্ব পায়নি। বিশ্বের নারী সংগঠনগুলোর
অব্যাহত আন্দোলন এবং নিরন্তর প্রচেষ্টার ফলে 'প্রম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন' অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে, কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে। নাইরোবি-সম্মেলনের
সাফল্য এবং ব্যাপকতা দেখে বিশ্বের নীতি নির্ধারকেরা নারীদের সম্মানে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের জন্য একটি ‘বিশেষ দিবসে’র তাড়না এবং প্রয়োজনীয়তা অনুভব
করেন। নাইরোবি-সম্মেলনের প্রায় ১০ বছর পর ১৯৮৮ সালে, জাতিসংঘ ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে।
মানুষ যেদিন থেকে গৃহবাসী হয়েছে সেদিন থেকেই নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার শুরু। শারীরিক গঠনের ভিনড়বতা এবং প্রাকৃতিক কারণে নারীকে পুরুষের দৈহিক
শক্তির কাছে পরাজিত হতে হয়েছে বারবার। সভ্যতার এক পর্যায়ে দাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নারী। নারীর সকল অলংকার, চুড়ি-বালা-নথ-পায়েল-বাজুবন্ধ আজো
সেই স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। আরেক পর্যায়ে, সমাজ পরিচালনার ভার ন্যস্ত হয়েছিল নারীর উপর। সমাজবিজ্ঞান বলে, সেই মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাই ছিল সবচেয়ে
নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা। আমাদের এই ভূ-খ-ের তিন পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত বিভিনড়ব নৃ-গোষ্ঠী যেমন খাসিয়া, গারো, মারমা ইত্যাদি জাতি গোষ্ঠীর
মধ্যে আজো সেই সামাজিক কাঠামো বিরাজ করছে। সেখানে, ভূ-স¤পত্তির মালিক এবং পারিবারিক সিধান্ত গ্রহণ করে নারী। জুমচাষ থেকে সন্তান-ধারণ, সকল কঠিন
কাজ করে নারী। অথচ, পাহাড়ি সমাজ ব্যবস্থায় কোনো অশান্তি নেই, নেই তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সামাজিক অপরাধও!

ফিরে আসি সমতলের কথায়। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প দক্ষিণ এশিয়ার অনেক
দেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ‘ইমারজিং টাইগার’। আর এই বস্ত্রশিল্প খাতের মূল চালিকা
শক্তি হচ্ছে এ দেশের নারীরা। ৩০ লক্ষেরও অধিক নারী শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঘামের বিনিময়ে বাংলাদেশ প্রতি বছর উপার্জন করছে সর্বাধিক বৈদেশিক মূদ্রা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, অধিকাংশ পোশাক নির্মাণ কারখানা আজো নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, সেনিটেশান, মাতৃত্বকালীন ছুটি, শ্রমের ন্যায্য মজুরী এবং শ্রমঘণ্টা ইত্যাদি
বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল লেবার’ল এবং ল’অফ্ ল্যান্ড মেনে চলছে না!

তবু, শত বাধা অতিμম করে বাংলাদেশের নারীরা আজ বিচরণ করছে জলে, স্থলে, নভোতলে। সকল ক্ষেত্রে, ধারাবাহিকভাবে তারা তাদের সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে
চলেছে। ইতিমধ্যে, এই দেশের মেয়েরা এভারেস্ট শৃঙ্গ ¯পর্শ করেছে, এভারেস্টের চূড়ায় উড়িয়েছে বাংলাদেশের পতাকা। আমাদের সেনা বাহিনীর নারীরা আজ
ইউএন মিশনে কাজ করছে। বিমান বাহিনীর নারী প্যারাট্রুপাররা হাজার ফুট উপর থেকে লাফিয়ে নেমে ভূমি ¯পর্শ করছে। নৌ বাহিনীর নারী সদস্যরা গভীর সমুদ্রের
উত্তাল ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যুঝে চলেছে। বাংলাদেশের নারী এখন আন্তঃনগর ট্রেনের হট-সিটে বসে হুইসেল বাজিয়ে ছুটে যাচ্ছে শহর থেকে জনপদে।
আমাদের নারী শ্রমিকেরা পাথর ভাঙার মত কঠিন কাজে অংশগ্রহণ করছে। নির্মাণ শ্রমিক হিসেবেও এই দেশের নারীদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।
এই দেশের নারীরা যেমন হাতুড়ির ঘায়ে পাথর ভাঙছে তেমনি কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে মাটি কাটার মতো কঠিন কাজেও শ্রম বিনিয়োগ
করছে। বিগত বছরগুলোতে শিক্ষা ক্ষেত্রেও এদেশের নারীরা পুনরুপি তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। সংসারের সকল দাবি পূরণ করে আজ বাংলাদেশের নারীরা
রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে পুরুষের পাশাপাশি তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে চলেছে। যদিও, জিডিপিতে আজো নারীদের শ্রমের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটছে না!
এই দেশে বারবার ব্যাহত হচ্ছে নারীর অগ্রযাত্রা। ঘরে, বাইরে, কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন নারী প্রতিহিংসা, অবমাননা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। হচ্ছে, জেন্ডার
ডি¯িঙঊমিনেশানের শিকার। নারীর অবমাননায় আধুনিক পোশাকের আড়াল থেকে মুহূর্তে বেরিয়ে আসছে বুনো-বর্বর, সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা। সভ্যতার এই পর্বে বাস
করেও ধর্মগুরুরা এই দেশের নারীদের তেঁতুল নামক জড় পদার্থের সাথে তুলনা করে পরিহাস করে, হেয় প্রতিপনড়ব করার ¯পর্ধা দেখায়! অথচ, রাষ্ট্র সেইসব
প্রগতিবিরোধী, মানবতাবিরোধী, ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না, যা প্রকারান্তরে নারীর প্রতি পুরুষের বৈষম্যমূলক আচরণকেই
উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অবহেলিত রেখে, অন্ধকারে রেখে কোনো সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না। তাই, প্রয়োজন
দ্রুত দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন। একমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতার পরিবর্তনই কেবল পারে নারীর প্রতি সকল বৈষম্য দূর করে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও
স্বপেড়বর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। আর, এটি মোটেও কোনো ই¤েপাসিবল ড্রিম নয় ! আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে
তাঁর ‘নারী’ কবিতায় নারী-পুরুষের সাম্য এবং সমতার কথা বলেছেন। তিনি ¯পষ্টই বলেছেন-“এ বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে
নারী, অর্ধেক তার নর”! এ এক পরম সত্য ! নারীর যোগ্যতা ও সামর্থ্যের প্রশেড়ব এরচে বড়ো স্বীকৃতি আর কিছু নেই, আর কিছু হতে পারে না!
আমি ব্যক্তিগতভাবে বহুগুণ বেশি খুশি হতাম যদি কোনোদিন জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পরিবর্তে একটি আন্তর্জাতিক মানবিকতা দিবসের ঘোষণা দিত।
কারণ, আমাদের জীবন থেকে মানবিকতা এবং সহিষ্ণুতা নামক শব্দ দুটি μমশ বিলুপ্ত হতে হতে রূপকথার গল্পে স্থান পেতে চলেছে। নারী আদ্যাশক্তি, নারী প্রকৃতি,
নারী ধরিত্রী, নারী কন্যা-জায়া-জননী, নারী হোম মেকার, নারী এক শেষহীন গল্পের নাম। তবু নিত্য-নতুন আঘাত অপমান, আর বঞ্চনাকে নিরবে হজম করে চোখের
জলে ভাত মাখে এ দেশের নারী। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় বলেছেন“শুধু
কবিতার জন্য তুমি নারী,
শুধু কবিতার জন্য এতো রক্তপাত, মেঘে গাঙ্গেয় প্রপাতশুধু
কবিতার জন্য, আরো দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে লোভ হয়”!

না, শুধু কবিতার জন্য নয় বরং মানব-বংশ প্রবহমান রাখার জন্য, সুশিক্ষিত ভবিষ্যৎ নাগরিক সৃষ্টির জন্য, নারীর নিরাপত্তা এবং চলার পথ নিশ্চিত ও সুগম করা জরুরি।
আর এ কাজে নারীকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে অবশ্যই পুরুষ। নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই এক উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে
যাবে আমাদের আগামীর বাংলাদেশ। আসুন, ২০১৪ সালের নারী দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে উচ্চারণ করি-‘জয় হোক নারীর! জয় হোক মানুষ ও মানবতার!
জয় হোক কবিতার’!