আলী আনোয়ারের চিন্তার ডানা ।। ইমতিয়ার শামীম
এইদেশ সংগ্রহ , শনিবার, মার্চ ০৮, ২০১৪


বিদ্যাসাগরের গভীর কোনো ইচ্ছা বা অবকাশ ছিল না সমাজ প্রক্রিয়াকে সামগ্রিকভাবে বুঝে নেওয়ার, এরকমই মনে করেন আলী আনোয়ার; মনে করেন তিনি, বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্বও ছিল এর প্রতিবন্ধক। বিদ্যাসাগরের সাহস ছিল, ছিল আত্মবিশ্বাস, বিবেকবুদ্ধি, সহানুভূতি আর চিন্তার ক্ষমতাও; আরো ছিল রাজনৈতিক আত্ম-অপসারণ বা সমষ্টির রাজনৈতিক ভূমিকার উপলব্ধির সংকট। সব মিলিয়ে আত্মনির্ভরতা ও নেতৃত্বের ক্ষমতায় আস্থা হয়ে উঠেছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের উপকরণ মাত্র। এভাবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মধ্যে দিয়ে আসলে ব্যক্তির সীমানা উপলব্ধির প্রয়াস চালান আলী আনোয়ার। সে-প্রয়াসের কারণে আমরা পৌঁছাই এই সত্যে যে, ‘তাঁর আন্দোলনের সাফল্য যেমন শুধুমাত্র ব্যক্তি নেতৃত্বের ফলাফল নয়, তাঁর ব্যর্থতাও শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা দিয়ে বিচার্য নয়…।’ ধর্মাশ্রয়ী আন্দোলনে সামাজিক মুক্তি আসবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় ছিল তাঁর, শিক্ষাকে তিনি করে তুলতে চেয়েছিলেন ‘যুক্তি-আশ্রয়ী, বিজ্ঞানমুখিন ও ধর্মনিরপেক্ষ’। রক্ষণশীল বিপ্লবাতঙ্ক থেকে তিনি সংস্কার আন্দোলন শুরু করেননি, যদিও বাঙালি সমাজে তাঁর প্রতীকী উদাহরণ হয়ে ওঠার কারণ ছিল তাঁর চরিত্রশক্তি। ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর শানানো রাজনৈতিক চিন্তার তুলনায় পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত তিনি এগিয়ে থাকেন ওই কারণেই।



আলী আনোয়ার তাঁর সদ্যপ্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ সাহিত্য-সংস্কৃতি নানা ভাবনা অবশ্য এই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরবিষয়ক প্রবন্ধ দিয়ে শুরু করেননি। শুরু করেছেন শিল্পের সংজ্ঞা নির্ণয়-সংক্রান্ত সমস্যা নামের প্রবন্ধটি দিয়ে। কিন্তু শিল্পের সংজ্ঞা নির্ণয় থেকে শুরু করে সাহিত্য-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান যেটির কথাই বলা হোক না কেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, পাবলো নেরুদা, ওয়াহিদুল হক, ওরখান পামুক কিংবা শিরিন এবাদি যাঁর কথাই বলা হোক না কেন, সমাজ-প্রক্রিয়াকে বোঝার বিষয়টি কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে থাকেই। আর সমাজটি যদি হয় বাঙালি সমাজ, তাহলে অনিবার্যভাবেই এসে পড়ে এ-সমাজে পরিবর্তনের প্রেরণা নিয়ে সংঘটিত সামাজিক সংস্কারের প্রসঙ্গ, আসে তেমন সংস্কারের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই পথিকৃৎকে বিংশ শতাব্দীর অনেক চিন্তক-শিক্ষাবিদই নানাভাবে উদ্ঘাটন করেছেন; আলী আনোয়ার করেছেন বিষাদে ছোঁয়া নিঃসঙ্গ বিদ্যাসাগরকে, ব্যক্তির সীমানা উদ্ঘাটন করতে থাকা বিদ্যাসাগরকে। আলী আনোয়ারের দুটি লেখা আছে এ-গ্রন্থে বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে (বিক্ষত বিদ্যাসাগরের নির্বেদ ও নৈরাশ্য, বিদ্যাসাগর ও ব্যক্তির সীমানা)। নানা প্রশ্ন জাগান তিনি, চেষ্টা করেন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার এবং এরকম প্রশ্ন ও প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে দিয়ে স্থাপিত হয় আরো প্রশ্নের। ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক এই তিন আপাতবিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রকে স্পর্শ করে বিস্তৃত এই সংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্রে, আলী আনোয়ার বলছেন, পরিবর্তনের প্রেরণা যেমন ছিল, তেমনি ছিল বিপ্লব-সম্ভাবনাজনিত রক্ষণশীলতাও। সংস্কার আন্দোলনের এমনতর ক্ষেত্রবিভাজনের মধ্যে দিয়ে আলী আনোয়ার এরকম অন্যতর গুরুতর অভিযোগ তুলে আনে যে, ‘এদের সামনে ভবিষ্যতের কোনো সামগ্রিক ব্লু প্রিন্ট ছিল না।’ সমাজ নির্মাণের সামগ্রিক কোনো পূর্ণাঙ্গ ইউটোপিয়ান চিন্তা থেকে নয়, এসব ক্ষেত্র সীমিতকরণ ঘটতে থাকে অনিবার্যভাবেই। যে-খণ্ডতা ফুটে উঠতে থাকে, সীমিতকরণ চিহ্নিত হতে থাকে, তা যে এসব আন্দোলনের দুর্বলতা, তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং আলী আনোয়ার সংগতকারণেই প্রশ্ন করেন – ‘এই খণ্ডতাও কি বিবর্তমান ও নির্মীয়মাণ শ্রেণিসংক্ষোভের অনিশ্চয়তার ও আত্মপরিচয় কুণ্ঠার দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিচার্য?’ প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু উত্তর খোঁজেননি আর। বরং ‘জ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যাকে শুধুমাত্র সভা-সমিতি ও পত্রিকার পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক পরিবর্তনের বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন।’ কিন্তু এমন একজন মানুষকে বরং শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করতে হয় নৈরাশ্যের বিরুদ্ধে, বেদনার বিরুদ্ধে, স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-পরিজনদের বিরুদ্ধে এবং এ-সংগ্রামের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায় বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতি; এর মধ্য দিয়েও তিনি তৈরি করে চলেন ব্যক্তিক সংস্কৃতির মানদন্ড। সংসারের প্রতি বৈরাগ্য জমে তাঁর, পিতার কাছে লেখা তাঁর একটি চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে আলী আনোয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করেন – ‘সংসার বিষয়ে আমার মত হতভাগ্য আর দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে যত্ন করিয়াছি। কিন্তু অবশেষে বুঝিতে পারিয়াছি, সে বিষয়ে কোনো অংশে কৃতকার্য্য হইতে পারি নাই। যে সকলকে সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা পায়, সে কাহাকেও সন্তুষ্ট করিতে পারে না।’ আলী আনোয়ার স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন, এই ‘সকল’ শব্দটি কেবল পরিবারের সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; কিন্তু তা যদি সমাজের সকলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়, তাতে কি তেমন হেরফের হয়? সমাজ সংস্কারের আন্দোলনে যুক্ত বিদ্যাসাগর নিশ্চয়ই শুরু থেকেই বুঝতেন, সমাজের সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায় না; কিন্তু পরিবারের ক্ষেত্রেও ওই সত্য মেনে নেওয়ার জন্যে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ জীবন। যে-পুত্র তাঁর বিধবাবিবাহের প্রবর্তনকে গৌরবমণ্ডিত করেছিলেন বিধবাকে বিয়ে করে আর গৌরবান্বিত বিদ্যাসাগর লিখতে পেরেছিলেন তাঁর ভাইকে – ‘আমি বিধবাবিবাহের প্রবর্তক, আমরা উদ্যোগ করিয়া অনেকের বিবাহ দিয়াছি। এমন স্থলে আমার পুত্র বিধবাবিবাহ না করিয়া কুমারী বিবাহ করিলে আমি লোকের নিকট মুখ দেখাইতে পারিতাম না। নারায়ণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া এই বিবাহ করিয়া আমার মুখ উজ্জ্বল করিয়াছে।’ সেই পুত্রের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক এমন দাঁড়ায় যে, তিনি তাঁর সম্পদ বিলি-বণ্টনের দলিলে লিখিতভাবে পুত্রকে বঞ্চিত করেন, কৃষ্ণনগরের উকিল যদুনাথ রায়ের পুত্র-বিয়োগে সহানুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে চিঠিতে লেখেন, ‘পিতা ও মাতা হওয়া অপেক্ষা অধিকতর মহাপাতকের ভোগ আর নাই। পিতামাতাকে প্রকৃত প্রস্তাবে সুখী করেন, এরূপ পুত্র অতি বিরল, কিন্তু অসদাচরণ… প্রভৃতি দ্বারা পিতামাতাকে যাবজ্জীবন দগ্ধ করেন এরূপ পুত্রের সংখ্যাই অধিক।’

এভাবে দুটি প্রবন্ধ মিলিয়ে, বিদ্যাসাগরের নির্বেদ ও নৈরাশ্যের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিক সীমানার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত মিলিয়ে আলী আনোয়ার তাঁর সামগ্রিকতা দাঁড় করান। সেখানে বিদ্যাসাগর এক অর্থে ‘ক্রমেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে থাকেন’, ‘অন্যতর এবং গভীরতর অর্থে তিনি আত্যন্তিকভাবেই নিঃসঙ্গ, শুরু থেকেই’, ‘শুধু চরিত্রগত দিক থেকেই নয়, ভাবাদর্শ ও সামাজিক সংস্থানগত দিক থেকেও’। বিদ্যাসাগরের ছবি হিন্দুদের ঘরে যত না শোভা পায়, তার চেয়েও বেশি শোভা পায় রামকৃষ্ণের ছবি – কেননা, বিদ্যাসাগরের আবেদন ছিল মননের কাছে আর রামকৃষ্ণের আবেদন ছিল মানুষের আবেগের কাছে। আলী আনোয়ারের এই অবলোকনে ঋদ্ধ হতে হতে আমাদের বুঝে নিতে সমস্যা হয় না, কেন আনোয়ার বিদ্যাসাগরের মধ্যে সমাজ প্রক্রিয়াকে সামগ্রিকভাবে বুঝে নেওয়ার গভীর কোনো ইচ্ছা বা অবকাশ খুঁজে পাননি। কেন তিনি বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্বকেও মনে করতেন এর প্রতিবন্ধক। আর কেনই বা শেষ জীবনে বরং তাঁর কাছে অনেক বেশি শান্তিদায়ক ও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠেছিল সাঁওতালদের সঙ্গ। আলী আনোয়ার লিখেছেন, ‘সংস্কার কার্যক্রমে তাঁর সহযোগী বন্ধুদের পশ্চাদপসরণ ও অসাধুতাকে বিদ্যাসাগর বাঙালি চরিত্রেরই দুর্বলতা ও নীতিহীনতা ভেবে বিষণ্ণ হয়েছেন, কিন্তু একে পরাধীনতা ও বণিকতন্ত্র-সৃষ্ট পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেননি।’ এ থেকে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সমাজ প্রক্রিয়াকে সামগ্রিকভাবে বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের সংকট।

বিদ্যাসাগরের এই নিঃসঙ্গ নির্বেদ ও নৈরাশ্যের পাঠ নিতে নিতে, ব্যক্তিক সীমানা জানতে আলী আনোয়ারের আত্যন্তিক নিঃসঙ্গতা সম্পর্কে ভাবতেও প্রলুব্ধ হই আমরা। খুব বেশি লেখা নেই তাঁর। কিন্তু নিখাদ ওই অবলোকন, উপলব্ধি; যেমনটি জানতে পাই সনৎকুমার সাহার লেখা ভূমিকা থেকেও : ‘প্রতিটি লেখায় প্রচুর পড়াশোনার ছাপ। সেটা লোক-দেখানো নয়।’ অনুবাদ ও সম্পাদনা গ্রন্থগুলিকে বাদ দিলে ৭৮ বছরের জীবনে আলী আনোয়ারের প্রকাশ পেয়েছে সর্বশেষ প্রকাশিত এই সাহিত্য-সংস্কৃতি নানা ভাবনাসহ মাত্র তিনটি বই। পত্র-পত্রিকায় যেসব লেখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, সেসব জড়ো করলেও এ-সংখ্যার তেমন হেরফের হবে না। নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে পঠনের আনন্দ দিয়ে তিনি হত্যা করেছেন তাঁর মুখোমুখি দাঁড়ানো আরেক নিঃসঙ্গতাকে। সাহিত্য-সংস্কৃতি নানা ভাবনার ভূমিকায় সনৎকুমার সাহা তুলে এনেছেন আলী আনোয়ারের সেই প্রতিকৃতি, যা এখনকার অনেকেরই জানা নেই : ‘তখন শুনতাম তিনি সারারাত জেগে পড়েন, আর অনেক বেলায় ঘুম থেকে ওঠেন। গড়পড়তা দিন কাটানো আমাদের অভ্যাস। তাঁকে অনুসরণ করার কথা ভাবিনি। তবে তাঁর পড়াশোনার বহর দেখে সত্যি-সত্যিই অবাক হতাম। এখানে এই লেখাগুলোতেও তার আভাস কিছুটা মিলবে। যদিও সবটুকু নয়। নিজের লেখার গৃহস্থালিতে তাঁকে কোনোদিনই খুব মন দিতে দেখিনি। অনেক কাজ তাঁর আধখেচড়া পড়ে থেকেছে। কোনো কোনোটা আবার মনের মতো না হওয়ায় নিজেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। এদের সব খবর আমরা পাইনি। লেখালেখি নিভৃতেই সারতেন। সেসব নিয়ে আলাপ-আলোচনাতেও নিস্পৃহ। তবে নৈর্ব্যক্তিকভাবে মানবভাগ্যের যে-কোনো বিষয়ে তাঁর কৌতূহল অবাধ। সেসব নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনায় তিনি ক্লান্তিহীন। এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখার জ্ঞানকান্ডে নিরলস তাঁর বিচরণ। শারীরিক দুর্ভাবনাও তাঁকে দমাতে পারে না।’

এমন নিস্পৃহ চিন্তাবিদের শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক ভাবনা সংগত কারণেই উঁচু তারে বাঁধা এবং গভীরভাবে রাজনৈতিকও বটে। শিল্পের চরিত্র ও পরিচয়ের আলোচনায় যেসব তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে, এমনকি ঘটবে, সেগুলোর সবই কোনো না কোনো দিক বিবেচনায় সীমাবদ্ধ। আলী আনোয়ার তাই শিল্পতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বরং গভীরভাবে দৃষ্টি রেখেছেন সীমাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধানের দিকে। শিল্পের শেষ উদ্দিষ্ট কী, তা নিয়েও ভাবিত তিনি। শিল্পের এই শেষ উদ্দিষ্টের অন্বেষণ করতে গিয়ে বেশিরভাগ চিন্তক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করলেও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘…তাহলে ওই অনন্য অভিজ্ঞতাকেই সব শিল্পরূপের বিভিন্নতার মধ্যে একমাত্র যোগসূত্র বা সামান্যগুণ বলে ধরা যায় কি?’ এবং তারপর তিনি তুলে এনেছেন এই ধারণা যে, শিল্পের যাথার্থ ও সার্থকতা হলো অভিজ্ঞতার নান্দনিক রূপ নির্মাণে আর তাই নির্মিত নান্দনিক রূপ ও অভিজ্ঞতাকে এক করে দেখার অবকাশ নেই। শুধুই অভিজ্ঞতার মধ্যে যাঁরা শিল্পনির্মাণের কৃতিত্ব দাবি করেন, তাঁদের তিনি এভাবে নাকচ করেছেন এবং অবলম্বন করেছেন মার্সেল দুশ্যাঁর শিল্পের জন্ম-মৃত্যুর ধারণাকে এবং শিল্পের যেহেতু আলাদা জন্ম-মৃত্যু রয়েছে, সেহেতু শিল্পের সংজ্ঞার অন্বেষণ অনিবার্য কারণেই আরো ক্রিটিক্যাল হয়ে উঠেছে। শিল্পকে তিনি দেখেছেন ক. শিল্পীর অভিজ্ঞতা, অথবা খ. অভিজ্ঞতার নির্মিত রূপ, অথবা গ. দর্শকের অভিজ্ঞতা – এই তিন ধরনের ক্রিটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে; তিনটি সম্ভাবনা কেন্দ্র থেকে, যার প্রতিটি পর্যায়েরই রয়েছে বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর নিরীক্ষণ, বর্ণনা ও বিশ্লেষণের সুযোগ। যারা বলার চেষ্টা করেন যে, ‘শিল্প আসলে একটি বিমূর্ত আদর্শ, যা খন্ডকালে বিভিন্ন আধারের মাধ্যমে মূর্ত হয়, আলী আনোয়ারের মতে, তারা আসলে এ তিনটি সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর বিবেচনায়, এমনকি শিল্পকে বিমূর্ত আদর্শ মনে করার পশ্চাৎপটেও রয়েছে পর্যায়ক্রমে শিল্পী, মাধ্যম ও দর্শকের উপস্থিতি। রবীন্দ্রনাথের সংগীত, ভ্লাদিমির নবোকভের অভিনয়স্মৃতি থেকে শুরু করে বার্নার্ড শ কিংবা বেকেট হয়ে হ্যামলেটের নতুন নতুন রূপারোপের সঙ্গে শেক্সপিয়রের হ্যামলেট গ্রন্থের সম্পর্ক খোঁজার মধ্যে দিয়ে তিনি ‘সেট, সাবসেট-সংবলিত এক ক্রমান্বয়ী স্তরীভূত শিল্পপর্যায়ের অনতিক্রম্য ধারণায় উপনীত হয়েছেন এবং উইটগেনস্টাইনের ‘খেলা’ ধারণাসংক্রান্ত আলোচনাকে শিল্পের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে এই উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, ‘খেলার মতো আর্টের ক্ষেত্রেও ‘সংজ্ঞা কী?’ প্রশ্নটি যথার্থ নয়।’ লিখেছেন তিনি, ‘একই শিল্পমাধ্যমের বিভিন্ন রূপের মধ্যে এবং বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পের মধ্যে কারো কারো সঙ্গে কারো কারো কিছু কিছু দিক দিয়ে মেলে, কোনো কোনো দিক থেকে মেলে না। এসব পারিবারিক মিলনসমূহের উপস্থিতির ভিত্তিতেই আমরা আর্টের চরিত্র বিচার করি, কোনো অন্তর্নিহিত সামান্যগুণ বা ঐকান্তিক ঐক্যের ভিত্তিতে নয়। ওইসব আপাত-আপতিক মিলের কারণেই আমরা বলি, অমুক জিনিসটি শিল্প-মর্যাদা পেয়েছে। অর্থাৎ শিল্পের শনাক্তকরণটাই আমাদের লক্ষ্য, সেজন্যই মিল খোঁজা। শিল্প নামক ধারণাটি এভাবেই একটি প্রত্যাভিজ্ঞানমূলক ব্যবহারিক ধারণা, বিশুদ্ধ তত্ত্বাভিসার নয়।’ প্রবন্ধের শেষ বাক্যে তিনি আরো স্থির কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘সব শিল্পের মধ্যে নিহিত গুণের অন্বেষার দ্বারা সমস্যার সমাধান করা যায় না।’

বাঙালির ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির ভেতর ও বাহিরকে আলী আনোয়ার খুঁজেছেন এর অন্তর্নিহিত গভীরতর রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে। তাই ‘মানুষ একটি সাংস্কৃতিক প্রাণী’ কথাটির বলনে যত সরলতাই থাকুক, তা আর তাঁর বিশ্লেষণে তত সরল থাকেনি, থাকবারও কথা নয়। সমাজে যে বিভাজন রয়েছে, সংস্কৃতি তাকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলে, এককথায় বলতে গেলে, সংস্কৃতি সম্পর্কে এই হলো আলী আনোয়ারের গভীরতর অবলোকন এবং যার গূঢ়ার্থ গভীরভাবে রাজনৈতিক, কেননা তাতে বিভাজনের প্রশ্ন জড়িত। ঔপনিবেশিক শাসনপর্ব বাঙালি সংস্কৃতিকে আধুনিক পর্যায়ের পরিসরে নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তারপরও রেনেসাঁস বলতে যা বোঝায়, তা যে বাঙালি সমাজে আসেনি, সে-ব্যাপারে তাঁর কোনো সংশয় নেই। বাঙালির মনোজগতে ইউরোপীয় রেনেসাঁস আলোড়ন তোলেনি, তার কারণ ওই ঔপনিবেশিক শাসনকাল। ফলে বিভিন্ন বিতর্ক বিভিন্ন সময়ে দানা বেঁধে উঠলেও, বুদ্ধিজীবীদের একাংশ নানাভাবে উদ্বেলিত হলেও হিন্দু সমাজকাঠামোর বর্ণব্যবস্থার পিছুটান, সনাতন ও নতুন মূল্যবোধের মধ্যেকার বিরোধ, ইন্দ্রজাল ও রহস্য-উৎসাদনকারী যুক্তিনির্ভর ভাবাদর্শের সর্বগ্রাসিতার কারণে এই রেনেসাঁস ছিল আসলে টলোমলো। একটি অংশ তাই স্বাজাত্যভিমানী হওয়ার পরও তখন চাইছিলেন ধর্ম ও সমাজের নবায়ন, চাইছিলেন জাতীয়তাবাদ, সাম্য ও নারীমুক্তির চেতনাকে স্বদেশি মূল্যমানে উন্নীত করতে। এই অংশভুক্ত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুর মতো ব্যক্তিত্ব যেভাবে উৎকণ্ঠিত হিন্দু পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সান্ত্বনাদায়ক হয়ে উঠতে থাকলেন, তাতে সমাজ পরিবর্তন ও সংস্কার সম্পর্কে পাঠকরা একটি মিশ্র সংকেত পেতে শুরু করলেন, যাকে আসলে নিজস্ব প্রবণতা অনুযায়ী প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল এ দুভাগেই ভাগ করা যায়। মন্তব্য করেছেন আলী আনোয়ার – ‘এদের যুক্তিচয়নকে রক্ষণশীলতার পক্ষে বা পরিবর্তনের অনুকূলে দুভাবেই পাঠ করা যেতে পারে।’ এবং এভাবে এ-রেনেসাঁস চিন্তার কাঠামো-বদলের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলো, ব্যর্থ হলো ভবিষ্যৎমুখী যুক্তিতাড়িত অন্বেষা করতে, পরিণত হলো অতীতাশ্রয়ী, অ্যাটাটিভিস্টিক বিশ্বাসকাতরে। ব্যর্থ হলো তা মুসলিম সমাজকেও স্পর্শ করতে। বাঙালি সমাজে মুসলমানদের যে-জাগরণ ঘটল, তা আসলে হিন্দু জাগরণের ধরনটিকেই অনুসরণ করে ঘটল। ফলে তা পর্যবসিত হলো প্রতিক্রিয়াশীলতায়। এই জাগরণ এত বেশি বিশ্বাসকাতরতায় আক্রান্ত ছিল যে, সমসময়ে বিষাদ সিন্ধু ‘পৌত্তলিকতা-স্পৃষ্ট’ ও ‘হিন্দু চিত্রকল্প-দুষ্ট’ বলে আলেমদের কাছে নিন্দিত হয়েছিল। আলী আনোয়ার আনন্দ প্রকাশ করেছেন এই ভেবে যে, ‘সৌভাগ্যক্রমে উপন্যাস-বুভুক্ষু নতুন মুসলমান পাঠক সমাজ ওই মূল্যায়নকে প্রাসঙ্গিক মনে করেননি।’ জাতীয়তাবাদকে তিনি দেখেছেন তাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের মতো করে, ‘একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রয়োজনে সৃষ্ট সংস্কৃতি-সঞ্জাত নির্মাণ’ হিসেবে। এরই সূত্রে তিনি অনুভব করেছেন সাংস্কৃতিক বলপ্রয়োগও। বলেছেন তিনি, ‘রাষ্ট্রনুমোদিত সংস্কৃতির একটি রচিত ভাষ্য মিডিয়াসমূহের মাধ্যমে, শিক্ষার পাঠ্যক্রমে, ঐতিহাসিক তথ্য গোপনীয়তার মাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকে, যাকে বলা যায় সাংস্কৃতিক বলপ্রয়োগ।’

এইভাবে সাংস্কৃতিক বলপ্রয়োগের ধারণার মধ্যে দিয়ে এগোতে এগোতে আলী আনোয়ার পৌঁছেছেন উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগের ভেতর। ওই উৎকণ্ঠাই যেন ছায়া ফেলেছে সংস্কৃতির কাঠামো ও তার নিয়ন্ত্রণ লেখাটিতে, সাহিত্য ও রাজনীতিতে এবং এ-উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ একটি সামগ্রিক রূপ পেয়েছে ‘উপদ্রুত মানুষ ও অসহায় মানবতাবাদ’ লেখাটিতে। এ-লেখাতে প্রসঙ্গক্রমে এসেছে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিহেভিয়ারিস্ট মনস্তাত্ত্বিক স্ট্যানলি মিলগ্রামের একটি গবেষণার কথা, যেটির বিষয় ছিল কর্তৃত্বের প্রতি আস্থা, বিশ্বাসপ্রবণতা ও আনুগত্যপ্রবণতার মাত্রা নিরীক্ষণ করা। এই গবেষণার ফলাফলের মধ্যে দিয়ে মানুষের প্রকৃতিই আলী আনোয়ারের কাছে প্রশ্নবোধক হয়ে উঠেছে, প্রশ্নবোধক হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো এবং উৎপাদান ও বিপণনের বিন্যাস। এবং তিনি নিঃসংশয়ের সঙ্গে লিখেছেন, রাষ্ট্র পশুশক্তিকে আড়ালই করতে চায়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে দরকারও হয় পশুশক্তির। ক্ষমতার ব্যবহার বিচ্ছুরিত হয় বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এবং আলী আনোয়ার দেখেছেন বিজ্ঞানমনস্কতার বিকাশও প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। তার কারণ বৃহৎ পুঁজি এখন বিজ্ঞানের অধিকার দাবি করছে, সনাতন সমাজের প্রাচীন বিজ্ঞানচর্চা থেকে আধুনিক সমাজের বিজ্ঞানচর্চা আলাদা হয়ে গেছে আর রাষ্ট্রও এখন বিজ্ঞান চর্চার প্রভুত্বের অন্যতম দাবিদার। যুক্তির প্রযুক্তিতে রূপান্তরপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতেই এবং এখন সে-প্রক্রিয়া চরম শিখরে পৌঁছেছে। বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতা সম্পর্কে তাঁর অন্য লেখাগুলি থেকে উপদ্রুত মানুষ ও অসহায় মানবতাবাদ লেখাটি একেবারেই আলাদা হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র ও মানবসমাজের প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ায়, মানুষের প্রকৃতি ও প্রবৃত্তির আলোচনা উঠে আসায়। রাষ্ট্র ও মানবসমাজকে তিনি দেখেছেন বিপরীতমুখী দুটি প্রত্যয় হিসেবে। রাষ্ট্র হলো তাই যেখানে মানুষের ক্ষমতার বিকাশ আকাশস্পর্শী হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কারণে। অবশ্য মানুষের হত্যা, নিষ্ঠুরতা ও বিকারগ্রস্ততা তাঁকে যত ব্যথিতই করুক না কেন, মানুষকে তিনি পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী বা সৃষ্টির মতো মনে করেন না। কেননা তিনি দেখেন, ভাষার আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানুষ অপরাপর প্রাণী থেকে অনন্যতা পেয়েছে। এর ফলে মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়েছে নিজের বাইরে থেকে বিশ্বকে তো বটেই, এমনকি নিজেকেও দেখবার। লিখেছেন তিনি, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার তার ভাষা, তার অনন্যতার সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞান। ভাষা দ্বারা সে-পৃথিবীকে বর্ণনা করে, বিশ্লেষণ করে, আত্মস্থ করে – ভাষা দিয়ে সে একটি বিকল্প ভুবন তৈরি করে, সেটা কেবল তারই, অন্য কোনো প্রাণীর নয়। তা কি পৃথিবীর সঙ্গে মেলে? হয়তো মেলে, হয়তো সবটুকু মেলে না। তাতে কী? ওই তো তার মুক্তির আকাশ। সমস্ত বিশ্বের ওপরে সে ওই ভাষা দিয়েই মানবত্বের ছাপ দিয়ে দেয় দূর আকাশের ‘কালপুরুষে’র মতো। একদল দার্শনিক এখন বলছেন, ওই ভাষাই মানুষের বন্দিত্বেরও কারণ। মানুষের ভাষা বড় অনচ্ছ, বড় প্রতারক। আমাদের যুক্তি ও আবেগ, দর্শন ও বিজ্ঞান, ধর্মবিশ্বাস ও সাহিত্য সবই, ভাষার বিভিন্ন বিন্যাস, তার যত অস্পষ্টতা, স্ববিরোধিতা সবই ভাষার কুহক – আমরা যাকে বলি মন, তাও ভাষাতেই নির্মিত।’ নৈরাশ্যবাদীর মতো তিনি বলেন, ‘মানুষের সমস্ত চিন্তা ওই অন্ধকারে হাতড়ে ফেরার মতো’; আবার তারপরই ভীষণ আশাবাদীর মতো বলেন, ‘ভবিষ্যতে বিশ্বাস না থাকলে ওই হাতড়ে ফেরা যায়?’

আলী আনোয়ারের ‘র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম ও তার পটভূমি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধগুলোও হয়তো এ-গ্রন্থে যুক্ত হতে পারত। তাতে আলী আনোয়ারের চিন্তার প্রকৃতি ও বুদ্ধিচর্চার অন্বেষণের চিত্রটি আরো পূর্ণাঙ্গ হতো। উপদ্রুত মানুষ ও অসহায় মানবতাবাদ এবং র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম ও তার পটভূমি এ লেখাদুটি মিলিয়ে আমরা খুঁজে পেতে পারি তেমন এক আলী আনোয়ারকে, যিনি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাতেই নিবিষ্ট নন, বরং ক্রিটিক্যালি উদ্বিগ্ন মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এবং তাই খানিকটা অ্যাকটিভিস্টও। এ গ্রন্থের ভূমিকায় সনৎকুমার সাহা অবশ্য আলী আনোয়ারের রাষ্ট্র-সম্পর্কিত অনুভূতির সঙ্গে একমত হতে পারেননি, প্রশ্ন তুলেছেন তিনি, ‘রাষ্ট্র বনাম মানবসমাজ, এভাবে না দেখে রাষ্ট্র ও মানবসমাজ, এভাবে বিষয়টি দেখলে তা কি বেশি সংগত হতো না? রাষ্ট্র তো আকাশ থেকে পড়ে না। বর্তমান বিশ্বে তা বিচ্ছিন্ন সত্তাও কোথাও নয়। এই রাষ্ট্র কেমন হবে, কী করবে তা দেখবার দায়িত্ব জনগণেরও আছে। তারা যদি তা অবহেলা করে, অথবা নিজেরা শতধাবিভক্ত থেকে যায়, কিংবা জ্ঞানের অগ্রগতিকে উপেক্ষা করে পেছন দিকে মুখ করে থেকে আখেরে হেফাজত খোঁজে, তবে শুধু র‌্যাডিক্যালিজমের দোহাই পেড়ে – আসলে উন্নয়নের বিরোধিতা করে – একমাত্র রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কি উচিত কাজ হবে?’ কিন্তু গভীরতর অর্থে দেখতে গেলে আলী আনোয়ার বোধকরি ‘একমাত্র রাষ্ট্রকে’ই কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি। তিনি মানুষকেও কাটাছেঁড়া করেছেন। মানুষের খন্ডিত চৈতন্য, অন্ধবিশ্বাস ও মূঢ়তা আর পাশবিকতা কীভাবে সভ্যতার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে তাও তিনি অনুভবের চেষ্টা করেছেন। এবং বলেছেন, ‘মানুষের বিকার, ধ্বংস, বিনষ্টির ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রগতিতে বিশ্বাস স্খলিত হয়ে পড়ে।’ আশার কথা, তিনি এও বলেছেন, ‘প্রগতিতে বিশ্বাস হলো মানুষের আত্মিক প্রবণতা।’

(বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে আলী আনোয়ারের গ্রন্থ ‘সাহিত্য-সংস্কৃতি নানা ভাবনা’ বিষয়ক আলোচনা)

[প্রথম প্রকাশ : কালি ও কলম, বর্ষ ১১, সংখ্যা ১, ফেব্রুয়ারি ২০১৪]

সংগ্রহঃ মুক্তাঙ্গন