‘মহাশ্বেতা দেবী’র সাথে এক সন্ধ্যা
আইভি রহমান , বুধবার, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৪


আমাদের মনুষ্য সমাজে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত অহরহ ঘটে চলেছে কতশত ঘটনা যার কিছুটা আমরা প্রতক্ষ্য করি কিছুটা রয়ে যায় অন্তরালের আড়াল অন্তরে।
যেটুকু আমরা প্রতক্ষ্য করি সেটুকুও এক সময় তলিয়ে যায় –হারিয়ে যায় –মুছে যায় স্মৃতির অতল তলে। মাঝে মাঝে বেদনার বেহাগ সুর তোলে কারও কারও মগ্ন চৈতন্যে –মাঝে মাঝে কেউ কেউ নিশ্চুপ নীরবতায় একাকী প্রবাহিত হতে থাকে যন্ত্রনার নীল সাগরে।
সময় ধীরে ধীরে ভুলিয়ে দেয়, মুছিয়ে দেয়, সরিয়ে দেয় যন্ত্রণার দেয়াল, বেদনার সুর, ক্রন্দিতের হাহাকারের সবটুকু- মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনাচারে যাপিত জীবনের সকাল সন্ধ্যা কাটায় সেই আগেরই মত।
কিন্তু আমাদের মনুষ্য সমাজেরই কেউ কেউ আছেন যারা প্রতক্ষ্য করেন নিজস্ব সমস্ত স্বত্বার সব টুকু আবেগ ও অনুভুতি দিয়ে- যারা মিলে মিশে একাকার হয়ে যান ঐ সব চরিত্রগুলোর গোপন গহিন দুঃখের বহমান নীল ধারায়, তারা নিশ্চুপ নীরব হয়ে বসে থাকার দলের নন। তারা বয়ে যেতে দেন না তাদের প্রতক্ষ্য করা ঘটনার সবটুকু রঙ ব্লটিং পেপারের শোষণের মাঝে- তারা লিখে যান তাদের মনের আবেগের সব টুকু রঙ মিশিয়ে সেই সব চরিত্রের সুখ দুঃখের হাহাকার বেদনার সম্পূর্ণ চিত্র এবং সমাজের প্রতন্ত্য অঞ্চলের সব খানে পৌঁছাতে চেষ্টা করেনতাদের কাহিনী যারা আমাদের সমাজেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ অথচ তারা কখনো অবহেলিত , কখনো উপেক্ষিত , কখনো প্রত্যাখ্যাত।
যাদের কণ্ঠস্বর কোনদিন কারো কানে পৌঁছায় না। যাদের কন্ঠ স্বর শূন্যে ধ্বনি তুলে সুদূরে মিলায়,
সেইসব Voiceless মানুষগুলোর জন্য এক জোরালো ও ক্রোধান্বিত এবং তীক্ষ্ণ এক Voice বহু দিন থেকেই সোচ্চার , প্রেরণা দায়ক এবং মমতায় গভীরতায় মগ্ন।
অন্য অনেকের সাথে তাঁর Voice এর পার্থক্য সেখানেই, যেখানে তিনি সমাজের সব চাইতে অবহেলিত মানুষগুলোর দুঃখ বেদনা হাসি কান্না দেখে দেখে তাদের কথা লিখেই ক্ষান্ত হয়ে যান নি –তিনি সমাজের একেবারে মূলকে নাড়া দিয়েই চুপ করে যাননি তাঁর অপূর্ব সুন্দর যাদুকরী মাতাল করা লেখনী শক্তি দিয়ে, তিনি তাঁর জীবনের সবটুকু আনন্দ আর সময় নিবেদন করে দিয়েছেন –উৎসর্গ করে দিয়েছেন ঐসব অবহেলিত জনপদের জন্য।

সেই জন অনেকের মাঝে অন্যতম এক আসনে আসীন – তিনি একজন এবং অনন্য একজন – তিনি ‘মহাশ্বেতা দেবী’।

আমরা যারা বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী , যাদের মনন ও মেধায় মিশে থাকে সমাজের অবহেলিত অংশের জন্য একরাশ সহানুভূতি কিছু করতে না পারার দীর্ঘশ্বাসের আক্ষেপ আবার কখনো বা কিছু করার জন্য উদ্যমী তারা জানি মহাশ্বেতা দেবী’র লেখনী ঠিক কতখানি শক্তি জাগায় নিজস্ব ভেতরবাড়ীকে ঝুঁকে দেখবার।
আমরা জানি নিজস্ব বিবেককে জাগ্রত করার এক অদ্ভুত সুর ধ্বনিত হতে থাকে মহাশ্বেতা দেবী’র লেখার মাঝে।

তাঁর লেখা কোন সচেতন পাঠকের অন্তরমহলে আগুন, ক্রোধ এবং ঘৃণার স্ফুলিঙ্গ না জ্বালিয়ে যেতে পারেনি এবং সচেতন পাঠক মাত্রই জানে তাঁর লেখার ক্ষুরধার তেজস্বী শক্তির রূপ।
কিছুকাল আগে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাস্থ কমিনিউটি রেডিওর বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য ‘মহাশ্বেতা দেবী’ দিদির একটি সাক্ষাৎকার গ্রহন করা হয় দূরালাপনির মাধ্যমে।
জানা গেছে দিদি কাউকে সেভাবে সময় দেন না। সে ক্ষেত্রে আমি বিশেষ ভাগ্যবান। অনেকটা সময় দিদি আমাকে দিয়েছিলেন। তাঁর নির্ধারণ করা সময় ছাড়িয়ে আরও অনেকটা সময়, প্রায় দুই ঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেছে আমরা টের পাইনি।

তার কারন জানতে চাইলে দিদি বলেছিলেন আমার কথা বলবার বিশেষ একটা ধরন তাঁকে ভাল লাগার ছোঁয়া দিয়েছে আর আমার করা প্রশ্নের ধারা তাঁকে এক অন্য রকম বিশেষ ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করে দিয়েছে।
তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা রাশি আর ধন্যবাদ।
সেই সময়টুকু ধরে রেখেছি আমার লেখার খাতায় , স্মৃতির পাতায়।
আমরা আজ সেই অসাধারণ ব্যাক্তিত্ব – সেই অফুরানপ্রান শক্তির আধার সমৃদ্ধ লেখিকার সাথে কথা বলছি।

আইভি রহমানঃ দিদি, ভাল আছেন আপনি? আপনাকে আমাদের ক্যানবেরাস্থ বাংলা রেডিওর পক্ষ থেকে অভিবাদন।
আপনি নিরন্তর লিখে যাচ্ছেন সেই তাদের কথা, যারা বড় বেশি অবহেলিত এবং সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন- ঠিক কখন থেকে আপনি আপনার ভেতরে অনুভব করলেন এদের নিয়ে ভাববার , এদের জানবার বা এদের কথা লিখবার? এবং কেন ? কেন আপনি অন্য সবার মত শুধু দেখেই গেলেন না?

মহাশ্বেতা দেবীঃ হ্যাঁ , ভাল আছি আমি।দেখ, আমি তো লিখছি সেই কবে থেকেই , ঠিক মনেও পড়েনা কবে কিভাবে এলাম লিখতে। কিন্তু দেখ, লেখাই আমার জীবিকা হয়ে গেছে । ১৯৫৬ সালে আমার প্রথম বই বেরোয়। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত লেখাই আমার একমাত্র কাজ হয়ে গেছে।
সমাজের একটা অন্ধকার দিক যাতে কেউ আলো ফেলেনা, চায়না, তাকায় না আমি দেখেছি তাদের কষ্ট। তাদের খুব কাছে গেছি , মিশেছি নিজের অন্তর থেকে সবটুকু আলো ঢেলে দিয়েই।
১৯৭৮-৭৯ সালের দিকে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হয়েছি ওদের সাথে। ওদের জীবন দেখেছি একেবারে মিশে যেয়ে ঐ জীবনে। থেমে থাকিনি, লিখে গেছি এই , এর বেশি কিছু না।
তুমি কি জানো আমি আদিবাসী সমাজ নিয়েই আমার কাজ তাদের নিয়েই আমি লিখে চলেছি, সংগ্রাম করে চলেছি। চীৎকার করে চলেছি।

আইভি রহমানঃ জি, দিদি আমি জানি আপনি আদিবাসী সমাজ নিয়েই কাজ করেন। এবার বলেন, আপনার লেখা চরিত্র গুলো বাস্তব জীবনে কতটুকু সক্রিয় তাদের অধিকার রক্ষায়? বা আদৌ?
ওদের জন্য একদিন অবশ্যই এই সমাজকে পথ ছেড়ে দিতে হবে, কিন্তু সেদিনটি ঠিক কতদুরে বা কবে?

মহাশ্বেতা দেবীঃ এ বিষয়ে ঠিক আলোচনা করে তো কিছু বলা যায়না- আমি যাদের নিয়ে বড় বেশি কাজ করেছি তারা আদীবাসী। আমি সব সময় বলেছি এখনো বলি , স্বপ্ন দেখার যে অধিকার তা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু দেখো, আমাদের এই বিশ্ব এই সমাজে আদীবাসী সমাজ বড্ড বেশি অবহেলিত। পৃথিবীর তাবৎ মানব সন্তানের মত তাদেরও স্বপ্ন দেখার অধিকার থাকা উচিৎ। এটা কেড়ে নিয়ে যারা আনন্দ পায় তাদের কি বলবে তুমি?
পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের মত এই সমাজেরও মানবিক অধিকার স্বপ্ন দ্যাখা, কিন্তু তাদের স্বপ্ন কেড়ে নিয়ে আমরা নিজেদের স্বপ্নের প্রাসাদ বাস্তবে বানাই।
আমি বলতে চাই যে, তাদের স্বপ্ন দ্যাখাতে বা স্বপ্ন পূরণের জন্য চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে, আমাদের সমাজের প্রতিটা অংশের কাজ এটা, এর থেকে বিমুখ হলে চলবে না। এই জন্য চেতনার তীব্রতা আর সামাজিক , সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক একটা মজবুত কাঠামো দরকার।
একটা অন্য রকম জীবনে উত্তরনের স্বপ্ন মানুষ সব সময় দেখে কিন্তু তার একার পক্ষে তো সেটা পুরন করা সম্ভব নয় এর জন্য সকলের সম্মিলিত চেষ্টা দরকার।
আমি তো কোন এন জি ও (NGO) নই যে বলতে পারব একসাথে একদিন সব আদীবাসী তাদের সকলের অধিকার পেয়ে যাবে তাদের স্বপ্ন সব পূরণ হয়ে যাবে। এটা কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। সকলের মিলিত আন্তরিক চেষ্টার আন্দোলন দরকার। সব সময়ই তৈরি থাকতে হবে। সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে এক সাথে সবাইকে। একা কারো পক্ষে তো সম্ভব নয়। এটা সকলের কাজ শুধু আমার নয় তোমার নয় তাদের নয় ......

আইভি রহমানঃ দিদি, আপনার শ্রেষ্ঠ গল্পে ‘তালাক’ নামক ছোট গল্পেটিতে আপনার আসল বানীটা কি? ভালবাসা? ধর্ম, ফতোয়া না সামাজিক কুদৃষ্টির তীক্ষ্ণতা ? ঠিক কোনটা?

মহাশ্বেতা দেবীঃ আইভি , এই গল্পটাতে যে মানুষটি মানে এরশাদ যে কুলসুমকে তালাক দেবে এটা কুলসুম ভাবতেও পারেনি- ছেলে যে সারা জীবন সাথে থাকবে না সেটা তারা মানে কুলসুম বুঝতে পারেনি- ওদের স্বামী- স্ত্রীর জীবন ছিল পরস্পরের উপর নির্ভরশীল – আসলে তখন যা জানতাম বিশেষ ঐ কাস্টমটার বিষয়ে তা নিয়েই লিখেছিলাম যে তালাক দিলে আবার ঐ তালাক প্রাপ্ত মহিলাটিকে আবার বিয়ে করতে হবে, থাকতে হবে তবেই পুনরায় ফিরে আসা যাবে আগের স্বামীর কাছে।
এরশাদ মুখে তালাক বলেছিল কিন্তু আমরা পরে দেখি কুলসুম ফিরে আসে এবং কুলসুম যুবতী ছিলনা সে এরশাদ কে নিয়ে বড় শহর কলকাতায় চলে যায় যেখানে কেউ তাদের চিনবে না। তাদের পরিচয় পাবেনা। তারা মিশে যাবে সমাজের স্রোতে।
ঠিক এই মর্মবানী দিয়েই আমি ‘হারুন সালেমের মাসি’ নামে একটা গল্প লিখেছিলাম, সেখানে হারুনের মা মারা গেলে ঐ মাসি তাকে আশ্রয় দেয় কিন্তু সমাজের মানুষ তাদের অন্য চোখে দেখতে শুরু করে- একদিন খুব ভোরে মাসি ঘুমন্ত হারুন কে জাগিয়ে তুলে বলে , চল আমরা কলকাতায় চলে যাই।
দেখো , কলকাতা তো বড় শহর ওরা সেখানে অনেক মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাবে। ওরা ওদের মত করে বাঁচবে সেই পুরনো পরিচয়ে ভালবাসা আর বিশ্বাস নিয়ে সামাজিক কুপ্রথা অস্বীকার করে।

আইভি রহমানঃ কিন্তু দিদি, আসলে কি তা পারে ওরা , কতদিন পারে? ধর্ম আর সমাজ কি ছেড়ে দেয় যে কোন সমাজেই? সে কলকাতার বা দিল্লির মত বড় শহরই হোক বা অজপাড়া গাঁ হোক , তাই না?

মহাশ্বেতা দেবীঃ আইভি তুমি জানো , আশা করি বুঝতে পেরেছ আমার মুল ইচ্ছাটা কি ছিল ঐ গল্প গুলোতে আমি ভালবাসায় বিশ্বাস করি, ধর্ম আমাদের যার যার তাতে ভালবাসা কেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে? মিথ্যে আর অন্যায় ফতোয়া কতশত জীবন নষ্ট করছে তা তুমি আমি আমরা সবাই জানি তাইনা? ধর্ম থাকবে ধর্মের জায়গায়। তাকে নিয়ে কেন টানাটানি? কেন ব্যাবসা করবে কেউ?

আইভি রহমানঃ আপনার ‘দ্রৌপদী’ গল্পে আমরা দেখেছি, দ্রৌপদীরা এগিয়ে আসছে এই বানী দিয়ে আপনি সমাজের দ্রৌপদীদের জাগাতে চেয়েছেন- গল্পে সেনানায়ককে আমরা ভয় পেতে দেখি- কিন্তু বাস্তবে আমরা কিন্তু আজও তা দেখিনা, দেখিনি, দেখব কি কোন দিন?
দ্রৌপদী’কে লজ্জা দিয়ে যখন চোখের কোল থেকে জল গড়ায় আমাদের সংবেদনশীল পাঠকদের চোখ কিন্তু আর্দ্র হয়ে আসে- ঝাপসা কুয়াশাময় হয়ে যায় সমাজের চেহারা – আমরা চীৎকার করতে চাই এই সব অনাচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে---- আমাদের জন্য আপনার উপদেশ কি?

মহাশ্বেতা দেবীঃ দ্রৌপদী’ গল্প বিশেষ একটা আন্দোলনের কথা নিয়ে লিখেছি। ৭০এর দশকে বিশেষ একটা জায়গায় আদীবাসীদের অবস্থা খুব খারাপ ছিল তাদের জায়গা জমি সব চলে যাচ্ছিল, সমস্ত জিনিসটাই একটা প্রতিবাদ মূলক পটভুমি তৈরি করেছিল , দ্রৌপদী যখন উলঙ্গ হয়ে বেরিয়ে আসে তখন কিন্তু চরম একটা চপেটাঘাত সমাজের মুখেই পড়ে তাই না? গল্পের শেষে সেনানায়ক কিন্তু একেবারেই পরাজিত।
তারা শুধু একটা মেয়েকে উলঙ্গ করতে পারে- লালসা চরিতার্থ করতে পারে কিন্তু সম্মান দিতে পারেনা। কিন্তু দেখো এই ঘটনার পর সমাজের মানুষ কিন্তু দ্রৌপদীকেই সম্মান করে তাইনা? এই সম্মান দ্রৌপদী আদায় করে নিয়েছে। আমি চাই সমাজের দৌপদীরা সবাই এই ভাবেই জেগে উঠুক। কেড়ে নিক তাদের প্রাপ্য। পরাজিত হয়ে যাক ওই সব সেনা নায়ক সব সমাজেই।

আইভি রহমানঃ দিদি,আমরা চাই দ্রৌপদীরা ফিরে আসুক প্রবল ভাবে আমাদের সমাজে-

মহাশ্বেতা দেবীঃ আইভি, দ্রৌপদীরা তোমার আমার আমাদের সবার মাঝেই আছে। আমাদের চারিপাশেই আছে। মানুষের মধ্যে খুব কম যায় লোকজন- মানুষের মধ্যে গিয়ে নিতে হয় শিল্পের আঁচ আমি তো আমার সারাজীবন যা লিখেছি মানুষের মধ্যে গিয়ে তাদের জীবনের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে তবেই লিখেছি , এই কথা আমি সম্প্রতি ফ্রাঙ্কফুটে বই মেলায় গেছিলাম সেখানেও বলে এসেছি যে , মানুষের মধ্যে যাও- মানুষকে জানো তবেই হবে শিল্প –তবেই পূর্ণ হবে তোমার জ্ঞানভান্ডার । মানুষই আমায় লিখতে শিখিয়েছে।

আইভি রহমানঃ অতি সম্প্রতি মনিপুরে ধানিজাম মনোরমার যে ঘটনা ঘটে গেল তাতে ১৭ থেকে ৭০ বছর বয়স্ক মহিলারা যেভাবে বিক্ষোভ করেছে আমরা মনে করি এটা ‘দ্রৌপদী’ গল্পের বিজয়, আপনার কি মনে হয়?


মহাশ্বেতা দেবীঃ আসলে এটা দ্রৌপদী গল্পের বিজয় না, এরা তো দ্রৌপদী গল্প পড়েনি, এরা জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিবাদ করেছে, নগ্ন হয়ে রাস্তায় নেমেছে- তুমি বা আমি কেউ এই সব মহিলাদের দেখিনি কিন্তু দেখ এরা প্রতিবাদ করেছে জীবন থেকে- আসলে জীবনই তোমাকে আমাকে সবাইকে শিখিয়ে দেয় সব কিছু, তবে দ্রৌপদী গল্পেটার একটা নাটক হয়েছিল দুর্ভাগ্যবশত আমার দেখা হয়নি সেটা, ওখান থেকেও কিছু মানুষ অনুপ্রানিত হতে পারে- আসলে প্রতিবাদ করতে চাইলে করাই যায় তাই নয় কি? আসল হোল ইচ্ছে শক্তি।

আইভি রহমানঃ আপনার ‘স্তন্যদায়ীনি’ গল্পে ‘যশোদা’ তার শেষ সময়ে কাউকে পাশে চেয়েছিল –কিন্তু কেউ ছিল না- আপনি যশোদার মৃত্যুকে ঈশ্বরের মৃত্যু বলেছেন- মানুষ ঈশ্বর সেজে বসলে সকলে তাকে পরিত্যাগ করে-তাকে সতত একলা মরতে হয়- এটা বাস্তব সত্যি।
কিন্তু সব সত্যি কি বলা যায় বা উচিত? তাতে কি সমাজের বা পাঠকের মনে ঈশ্বর চিন্তা কি অন্যরূপ নিতে পারে না? আপনার কি মনে হয়?

মহাশ্বেতা দেবীঃ তাতে আমার বয়েই গেল- মানুষের বা সমাজের মনে ঈশ্বর চিন্তা কি হল না হল তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না- যার যেভাবে খুশী চিন্তা করুক- এর পর তিনি খুব হাসতে থাকেন তারপর বলেন আইভি তোমার সুক্ষ দৃষ্টি এবং প্রখর মননের জন্য তোমায় আমার আশীর্বাদ।

আইভি রহমানঃ আপনাকে আমার শ্রদ্ধা দিদি, হুম, আপনার ‘শিশু’ গল্পটি আমাদের সম্পূর্ণরূপে বাক রুদ্ধ করে – এর পটভূমি বা এটা লেখার আগ্রহ কিভাবে আসে আপনার? কতটা কাছে থেকে দেখেছেন ঐ সব চরিত্র গুলোকে? যদিও আমি বা আমরা জানি আপনি খুব কাছে থেকে দেখেই লিখে থাকেন, তারপর ও আমাদের জানতে মন চায়......

মহাশ্বেতা দেবীঃ দ্যাখো সে কথা আমি কাউকে বলব না। আমি কাকে কতটা কাছে থেকে দেখেছি সেটা আমার একান্ত নিজের এটা আমি বলব না , কিন্তু আগেও বলেছি আমি কাছে থেকে না দেখে বা মানুষের মধ্যে না যেয়ে লিখিনা, লিখি নি।
মানুষকে খেতে না দিয়ে দিয়ে খর্ব করে রেখেছে। আমি তো পুরো System টাকেই তর্জনী তুলে দেখিয়েছি তাই না? মানুষের মাঝে গেলে তাদের প্রতিবাদের রূপ বা ভাষা দেখা বা জানা বা অনুভব করা যায়। সমাজের এই ঘুণে ধরা System কে উন্মোচিত করার বা খুলে দেখানোর চেষ্টাই আমার প্রতিটি লেখায় থাকে।
আজকে দ্যাখো, পুরো পৃথিবী জুড়েই মানুষের কি অবস্থা- খেতে না দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে- এইযে আজকে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় কি হচ্ছে? খুব উর্বর জমি বছরে ৪টা ফসল হয় সেখানে, সেইটা পশ্চিমবঙ্গ সরকার টাটা দের একটা Project এ দেবার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু ঐ এলাকার লোকেরা প্রতিবাদ করছে প্রবল ভাবে। আসলে মানুষের মধ্যে যেতে হবে তবেই না দেখতে পাবে প্রতিবাদের আসল রূপ। এই সব অন্যায় কাজের বা System এর স্বরূপ উন্মোচন করার লক্ষ্যেই আমার প্রতিটি লেখায় আমি আমার কথা বলি , তাই না?

আইভি রহমানঃ আমরা জানি ঘুণে ধরা এই সমাজের ভেতরে বসে কারা কি ভাবে কি আদায়ের খেলা করে যাচ্ছে। আপনার মত সচেতন মননের মানুষ যারা আছেন তাদের কাজ তারা করছেন কিন্তু আমাদের সমাজপতিদের হুঁশ এখনো বেহুঁশ। কিন্তু আমরা আশাবাদী।
দিদি, আপনার অরণ্যের অধিকার, হাজার চোরাসির মা, ৩৪ ধারার আসামি এই গল্পগুলোর মাঝে আমরা দেখেছি মৌলিক অধিকার রক্ষায় বা আদায়ে মানুষ যখন প্রতিবাদমুখী হয় তখন সে কতটা বীভৎস ও সহিংস হয়- আপনি এটা কে কিভাবে ব্যাখ্যা দেবেন?

মহাশ্বেতা দেবীঃ দ্যাখো মেয়ে, অহিংসা বা সহিংসা বলে নয় – তুমি হাজার বছর ধরে তাকে মারছো সে একদিনও ঘুড়ে দাঁড়াবে না? সে শুধু মার খেয়েই যাবে? প্রতিবাদ থাকতে হবে। প্রতিবাদ করতেই হবে। আদীবাসী সমাজ বা তার বাইরের সমাজ যেই হউক না কেন প্রতিবাদ খুব জরুরি। মানুষকে তার অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সব সময় প্রতিবাদ করতেই হবে। সব সময় সচেতন থাকতে হবে। তোমাদের অস্ট্রেলিয়াতেও কিন্তু আদিবাসী সমাজ এক নীরব আঁধারেই ঢেকে আছে , তাইনা?

আইভি রহমানঃ জি দিদি, তা আছে কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের জন্য এই সরকারের কিন্তু সত্যিকারের সদিচ্ছারও অভাব নেই। অপেক্ষা শুধু সময়ের।
আপনার লেখা ‘বুধন’ এর ঘটনাকে আপনি কি ভাবে ব্যাখ্যা করবেন দিদি?

মহাশ্বেতা দেবীঃ দ্যাখো এটা তো ব্যাখ্যার বাইরে। ১৮৭১ সালে বৃটিশ সরকার সেই তখনকার ভারতবর্ষ যেখানে বাংলাদেশ বা পাকিস্তান ছিলনা তখনকার সমাজে কিছু কিছু নোমাদি বা যারা ঘুরে ঘুরে সাপ খেলা দেখায়- ওষুধ বেচে বেড়ায় তো এই সব গোত্রকে বৃটিশ সরকার ক্রিমিনাল আখ্যা দিল, যেন তারা জন্ম সুত্রেই ক্রিমিনাল হয়ে জন্মেছে- এই সব গোত্র গুলোকে এবং তাদের সকলকে যে কোন সময় মারতে , পিটতে বা একেবারেই মেরে ফেলতে পারবে এমন ভাব ছিল বৃটিশ সরকারের।
আমার পশ্চিম বাংলায় এমন এক গোত্রের কিছু লোক ছিলেন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে কিন্তু তারপরেও তারাও অনেক নির্যাতন সহ্য করেছে, এমন সব নির্যাতন করেছে যে অনেককে আত্মহত্যা করতে পর্যন্ত হয়েছে। অনেক আন্দোলন হয়েছে। ভাবতে পারো, মেদেনীপুরেও এদের ক্রিমিনাল বলে মারা হচ্ছে।
আমার মনে আছে, ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলো তখন ১৯৭৮-৭৯ তে ৩৭ বা ৩৯ জনকে মেরে ফেলা হোল। আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম তখনও করতাম, আজ এখনও করেই যাচ্ছি।
একটা সময় এলো পুরুলিয়াতে একটা গোত্র ঐ নামে পরিচিত তারাও প্রতিবাদমুখী হোল, এর মধ্যে ১৯৫২ সালে ভারত সরকার ঘোষণা দিল এই সব গোত্রগুলোকে যে তোমরা আর ক্রিমিনাল গোত্র না। এটা বলেই সরকার খালাস- তার কাজ শেষ । কিন্তু গোত্রগুলো যেমন ছিল তেমনি রয়ে গেল। ১৯৮০ সালে একটা ২৫-২৬ বছরের ছেলে তাকে এই সব গোত্রের একজন বলে মিথ্যে অজুহাতে মারধোর করে, ফলে সে মারা যায়, তখন প্রশাসন তাকে আত্মহত্যা ঘোষণা দিয়ে অন্য দিকে প্রবাহিত করতে চায়।
কিন্তু আমাদের একটা সমিতি আছে খুব শক্তিশালী সংঘটন তারা সোচ্চার হয়ে ওঠে – আমি নিজে তখন হাই কোর্টে যাই এবং একটা public litigation case করি – পুরুলিয়ায় কেউ তো জানেনা আমি কলকাতায় কেস করেছি শুধু আমার সমিতি জানে- তো আমার সমিতি বুধনের বঊ কে নিয়ে জেলে হাজির হয় এই দাবী নিয়ে যে তার স্বামী বুধন যে আত্মহত্যা করেছে তার দেহ ফেরত দেওয়া হোক । কিন্তু হাইকোর্ট জজ হুকুম দিলেন আর একবার বুধনের দেহ Post mortem করা হোক। কিন্তু পুরুলিয়ার প্রশাসন ঐ দেহকে জ্বালিয়ে দিতে নিয়ে যাচ্ছে, পুলিশ সমানে চিল্লাচ্ছে বুধনের দেহ জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও বলে। কিন্তু শেষ মেস বুধনের দেহ জজের হুকুমে নিয়ে আসা হয় বুধনের ঘরে তারপর বুধনের বউ ও আমার সমিতির লোকেরা মিলে মাটি খুঁড়ে তক্তা বিছিয়ে বুধনকে আড়াল করে রাখে এবং একটা ঘরে আগুন জ্বালিয়ে পুলিশ কে বুঝানো হয় যে বুধনকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ মহা খুশি হয়ে ফিরে যায়।
তারপর সকালে বুধনের দেহ হাসপাতালে নিয়ে Post mortem করা হোল। হাই কোর্টের অর্ডার বাধ্য হয়ে ওদের করতেই হয়। রিপোর্টে দেখা যায় পুলিশ যেভাবে বলেছে সেভাবে বুধন মরে নি তাকে নিপীড়ন করে মেরে ফেলা হয়েছে ।
এই রিপোর্ট ভিডিও করা হোল সকলকে দেখানো হোল মৃত্যুর কারন কি ছিল। এই সময় আমাকে বড়লায় ডঃ জীন দেবী দাস তিনিও আদীবাসীদের নিয়ে কাজ করেন আমাকে একটা বক্তৃতা দিতে ডাকলেন , আমি সেখানে বলি, এদের ক্রিমিনাল গোত্র নয় বলেই সরকার খালাস কিন্তু এই তো চলছে, এদের তো মেরেই চলেছে এর কি হবে? কেউ উত্তর দেয়নি। দেবেনা। উত্তর নেই যে।
শুধু কাজ করলেই চলবে না এদের জীবনের সুখদুঃখ সব কিছুতেই নিজেকে মিশিয়ে দিতে হয়, ওদের কিছু হলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। পরে বুধনের বউকে এক লাখ টাকা ক্ষতি পুরন ঘোষণা দেওয়া হয় প্রশাসন থেকে।
এই ভাবেই বুধনের নাম ছড়িয়ে পড়ে। আজ বুধনের কেস সমগ্র ভারত বর্ষে প্রথম কেস যা এই সব গোত্রের জন্য করা হয়। প্রতিবাদের তুমুল রূপ দ্যখানো হয়। এর আগে যা হয়নি এই ভাবে।
তারপরেও পুরুলিয়ায় পুলিশ আরও মেরেছে, আমরা প্রতিবাদ করেই চলেছি। আমি লিখেই যাচ্ছি এবং যাবই। এই গুলো করতে হয়। ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় তাই নয়কি?

আইভি রহমানঃ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিদি, কত নতুন তথ্য জানা হয়ে গেল। আসলেই জীবনের আঙিনায় যুদ্ধ জয়ের যুদ্ধ সবার দ্বারা হয়ে ওঠেনা বিশেষ করে সেই তাদের জন্য যাদের কথা কেউ ভাবেনা। কেউ না। আপনাকে অভিনন্দন দিদি।
এবার বলেন , সংস্কারের দাসত্ব ও নারীর অবস্থান সম্পর্কে আপনার যে ক্ষোভ – আপনি লিখে যাচ্ছেন অহরহ- আপনি কতটুকু সার্থক বলে মনে করেন? আপনার লেখা সমাজ কে সমাজের অভিভাবকদের কতখানি নাড়া দিতে পেরেছে বলে আপনি মনে করেন?
আপনার লেখা কতটা বিপ্লব এনে দিতে পারে?

মহাশ্বেতা দেবীঃ দেখো সেটা আমার কাজ নয় বলে আমি মনে করি। আমি কে বিবেচনা করবার। আমি বিচার করার কে? এই যে তুমি বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া এসেছ, ওখান থেকেই আমাকে এই যে প্রশ্ন করছ এর মানে কি? মানে এটাই যে আমি তোমার বা তোমাদের মনে সাড়া জাগাতে পেরেছি। ওটাই আমার কাজ। তার বেশি কিছুই না।

আইভি রহমানঃ আমি আপনার কথা বুঝেছি দিদি, কিন্তু তার পরেও একজন লেখকের একটা মানসিক তৃপ্তি বা অতৃপ্তি আসে বা আসা উচিৎ যে তার লেখায় অন্তত এটা হচ্ছে বা কিছু হচ্ছেই না । এইযে তৃপ্তি বা অতৃপ্তি এর থেকেই তো আর নতুন কিছু করবার তাগিদটা জোরালো হয়। আসে আরও তীব্র বানীর লেখা। আরও আশা জাগানিয়া সাহিত্য।
মহাশ্বেতা দেবীঃ না, আমি কখনোই তা বিচার করিনি। আমি মনে করি আমার কাজ সমাজের তথা সমাজপতিদের স্বরূপ উন্মোচন করে দ্যখানো তাই আমি করে যাচ্ছি। এখন হুগলীতে সিঙ্গুর নিয়ে যে আন্দোলন চলছে তা খুব জোরালো। আমি লিখেছি ভীষণ জোরালো ভাবে আর তা হিন্দিতে অনুবাদ হয়ে পৌঁছে গেছে সমস্ত ভারতবর্ষে তার ফলে সমগ্র ভারতবর্ষ আজ জানে কি হচ্ছে সিঙ্গুরে। এটাই আমার কাজ।আর সমাজ যে জাগছে না তা কিন্তু নয়। বিপ্লবের জোয়ারও কিন্তু আসছে। টের কি পাচ্ছো?

আইভি রহমানঃ অসাধারন আপনার কাজ দিদি, কিন্তু এর মাঝেই কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেল এক ধরনের আত্ম তৃপ্ততার আভাস। এটাই আনন্দ। এতেই পাওয়া যায় লেখকের সার্থক জয়ের স্বাদ।
আপনার জীবনের অনেক গুলো বছর আপনি নিরলস ভাবে কাজ করেই চলেছেন ভারতীয় আদীবাসীদের নিয়ে, তাদের বর্তমান অবস্থা ও অতীতের অবস্থানের কি পরিবর্তন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন বা আদৌ কি হয়েছে?

মহাশ্বেতা দেবীঃ সেই বিচার আমি করব না বা কিছু বলব না শুধু এই টুকুই বলব আমি কাজ করেছি করছি করব। পরিবর্তন এসেছে কিনা তোমরা আমার পাঠকরা বলে দেবে আর আমি যাদের জন্য কাজ করেছি করছি তারা বলে দেবে। একদিন সমাজ বলে দেবে।

আইভি রহমানঃ আপনাকে আমাদের শ্রোতাদের এবং পাঠকদের পক্ষ থেকে অসংখ্য শুভেচ্ছা দিদি আমাদের এই দীর্ঘ সময় উপহার দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
মহাশ্বেতা দেবীঃ আইভি, তুমি আসলে যাদু জানো, তোমায় বলেছিলাম বিশ মিনিট বা আধা ঘন্টা সময় দেব কিন্তু দেখ প্রায় দু ঘন্টা পেরিয়ে গেছে টের পাইনি। ভাল লেগেছে তোমার সাথে কথা বলে। তোমায় আমার সমিতির ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি তুমি যোগাযোগ রেখ। তোমাদের সবাইকে অনেক শুভেচ্ছা।