জাহানারা ইমাম: মায়ার চির বন্ধন ।। প্রভাষ আমিন
এইদেশ উপস্থাপনা , শনিবার, জানুয়ারি ১৮, ২০১৪


পাকিস্তানী নাগরিক গোলাম আযমকে যখন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির করা হয়, তখন আমি ‘প্রিয় প্রজন্ম’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করি। তখনও পুরোপুরি সাংবাদিক হয়ে উঠতে পারিনি, শরীরে-মননে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের উত্তেজনা। যে কোনো উপলক্ষ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি। গোলার আযমের আমিরত্বের প্রতিবাদে তখন ফুঁসে উঠেছে দেশ। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনে একাত্ম আমরাও।

প্রিয় প্রজন্মের অফিস তখন ৭৬ সেগুনবাগিচায়। বিচিন্তার ধারাকবাহিকতায় প্রিয় প্রজন্মও আমাদের আবাসিক অফিস। সেখানেই থাকি, খাই। রাতে যেটা আমাদের বেডরুম, দিনে সেটাই সম্পাদক ফজলুল বারীর অফিস। আমি আর রোকন ছিলাম ফুলটাইম আবাসিক স্টাফ। এছাড়া মিন্টু আনোয়ার, জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল, মীর মাসরুর জামান রনি, জুলফিকার আলি মাণিক, নঈম তারিক, ইমন শিকদার, ফজলুর রহমান, হাফিজুর রহমান কার্জন, নজরুল কবির, বিপ্লব রহমান, পল্লব মোহাইমেন, প্রিসিলা রাজ, নাফিস আহসান, মেহেদী হাসান, মানস ঘোষ, উত্তম সেন, সাঈদ খোন্দকারসহ আরো অনেকেই ছিলেন সেই প্রজন্মে। নাজিমউদ্দিন মোস্তান, মতিউর রহমান চৌধুরী, মোনাজাতউদ্দিন নিয়মিত লিখতেন। মোনাজাত ভাই ঢাকায় আসলে আমাদের অফিসে বসেই লিখতেন। আর নিয়মিত আড্ডা মারতে আসতেন তখনকার ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা, পরে বিএনপিতে সক্রিয় নুরুল ইসলাম ছোটন।

আক্কাস মাহমুদ খুব ভালো ছবি তোলেন। তবে তারচেয়েও ভালো মানুষ এবং বিচিন্তা ও প্রিয় প্রজন্মের সবার বন্ধু ও শুভাকাঙ্খী। তার ইস্কাটনের পদ্মা স্টুডিও ছিল আমাদের বৈকালিক আড্ডার জায়গা। দুপুরে খাওয়ার সময় হুট করেই লোকের সংখ্যা বেড়ে যেতো। তবে রোজার সময় দুপুরে খাওয়ার লোকের সংখ্যা অনেক বেড়ে যেতো। প্রেসক্লাবের এত কাছে ফ্রি খাওয়ার এমন ব্যবস্থা আর কোথাও ছিল না। আমরা সবার এই সঙ্গ দারুণ উপভোগ করতাম। ঝামেলাটা যেতো ইলিয়াস আর ডালিমের ওপর দিয়ে। সবুরা বুয়াও মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যেতেন। প্রিয় প্রজন্মের প্রিন্টার্স লাইনে সবার নাম ছাপা হতো বর্ণানুক্রমিকভাবে; অফিস সহকারী, কাজের বুয়া সবার নাম। সেই প্রিন্টার্স লাইনে আইনবিদ হিসাবে ছাপা হতো নিজামুল হক নাসিম এবং আদিলুর রহমান খান শুভ্রর নামও। আজ ভাবলে অবাক লাগে কী বৈপরিত্য ছিল সেই প্রিন্টার্স লাইনে। অবশ্য সময় তাদেরকে এমন বিপরীত মেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আইনবিদ হিসাবে ছিলেন নুরুল মজিদ হুমায়ুনও। কম্পিউটারে ছিলেন রানা আর নয়ন। শাহীন উল হক সাংবাদিকতা ছাড়া বাকি সব সামলাতেন। মাঝে মাঝে আড্ডার সময় বেড়ে যেতো। রাতভর হই হুল্লোড়, আড্ড... আহা বড় মধুর ছিল সেই দিনগুলো। থাকা-খাওয়া তো ফ্রি।

বিজ্ঞাপনের বিল পেলে বারী ভাই মাঝে মাঝে কিছু টাকাও দিতেন। তাতে সিগারেটের দোকানের বাকি শোধ, এক দুবার পিয়াসী বার আর দুয়েকদিন বাকুশায় যাওয়া যেতো। তাতেই আমরা হাওয়া মে উড়তা যায়ে। আমাদের অফিসের কাছেই নয়াপল্টনে ছিল সাপ্তাহিক পূর্বাভাসের অফিস। মোজাম্মেল বাবুর সম্পাদনার সেই পত্রিকাটি এরশাদ আমলে তুমুল জনপ্রিয় ছিল। বিশেষ করে শিশির ভট্টাচার্যের কার্টুন আর আনিসুল হকের গদ্যাকার্টুনের জন্য অপেক্ষায় সপ্তাহটা বড় দীর্ঘ মনে হতো। তবে আমরা যখন প্রিয় প্রজন্ম নিয়ে ব্যস্ত, ততদিনে বন্ধ হয়ে যায় পূর্বাভাসের প্রকাশনা। আমাদের মত পূর্বাভাসের অফিসও ছিল আবাসিক। পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলেও আনিসুল হক আর আমিনুর রশীদ থাকতেন সেখানে। আমরা তখন মাঝে মাঝে আড্ডা মারতে আনিসুল হকের কাছে যেতাম। গম্ভীর আমিনুর রশীদকে দেখতাম দূর থেকেই। পরে অবশ্য আমিনুর রশীদের সঙ্গেই আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেধে যায় আমার জীবন। পেশাগত ও পারিবারিক দুই ব্যাপারেই আমিন ভাই আমাকে কৃতজ্ঞতার এমন বাঁধনে জড়িয়েছেন, যা ছেড়ার সাধ্যও নেই আমার, ইচ্ছাও নেই। পরে আনিসুল হক আর আমিনুর রশীদ উৎপল শুভ্র ৬৫০/১ মগবাজার, গাবতলা মোড়ে একটি বাসা নিয়েছিলেন। সেখানে আমিন ভাইয়ের রুমে আমি এবং আমরা যা করেছি, তা নিয়ে ভবিষ্যতে উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আছে আমার। ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া আমার পুরোনো অভ্যাস। তবে আজ প্রিয় প্রজন্মের গল্প করতে বসিনি।

আমাদের অফিসের কাছেই তোপখানা রোডে ছিল নির্মূল কমিটির অফিস। আমরা কাজ শেষে বিকালে নির্মূল কমিটির অফিসে গিয়ে বসে থাকতাম, ভালো লাগতো। সম্পাদক বারী ভাই খুবই সক্রিয়, নানা জায়গায় যান, অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। আমরা একপায়ে খাড়া থাকি, কোনো নির্দেশ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ি। ধীরে ধীরে গণ আদালতে গোলাম আযমের বিচারের দাবি তুঙ্গে ওঠে। ছোট প্রিয় প্রজন্মই তখন আন্দোলনের মুখপত্র। নির্মূল কমিটির নেতারা এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারাও জানতের আমাদের আবাসিক অফিস, মানে সার্বক্ষণিক পাওয়া যায়। জরুরী কিছু হলেই ছুটে আসতেন। ছাত্রদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় জাহাঙ্গীর সাত্তার টিঙ্কু আসতেন, তার সঙ্গে অনেকেই আসতেন। কোনো লিফলেট, কোনো কম্পোজ লাগলেই ছুটে আসতেন। আমরাও মনের আনন্দে করে দিতাম। অসময়ে হলে কম্পিউটার কম্পোজের কাজটা আমাকেই করতে হতো। প্রিয় প্রজন্মের কর্মীদের সবাই সাংবাদিক কাম আন্দোলনের কর্মী।

আস্তে আস্তে ঘনিয়ে এলো সেই ঐতিহাসিক ২৬ মার্চ, গণআদালতের দিন। আগের দিন সিদ্ধান্ত হলো প্রিয় প্রজন্মের পক্ষ থেকে গণআদালত উপলক্ষ্যে একটি বুলেটিন বের করা হবে। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে লিখলেন। সব লেখার কথা মনে নেই। তবে ছাত্রনেতা কাম সাংবাদিক মিন্টু আনোয়ার গণআদালতের সুইসাইডাল স্কোয়াড নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন। মিন্টু ভাই নিজেও ছিলেন সেই স্কোয়াডের সদস্য। প্রিয় প্রজন্মে আমাকে জুতা সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ সবই করতে হতো। তাই আমি অন্যদের মত আন্দোলনে বেশি সময় দিতে পারতাম না। তবে গায়ে খেটে তা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতাম। যথারীতি বুলেটিনের দায়িত্বও পড়লো আমার ঘাড়ে। প্রিয় প্রজন্ম তখন ছাপা হতো এফডিসির পাশে হলিডে প্রেসে (এখন যেটা ‘নিউ এজ’ অফিস)। ছাপা হওয়ার পর বাধাইয়ের জন্য যেতাম মগবাজারে আক্তারের বাইন্ডিংখানায়।

আক্তারের বাইন্ডিংখানা ছিল জামায়াতে ইসলামীর অফিসের ঠিক উল্টোদিকে। জামায়াতের বিরুদ্ধে সবকিছু বাধাই হতো তাদের অফিসের উল্টোদিকেই। গভীর রাতে আমরা সেখানে যেতাম ঝূঁকি নিয়েই। ঝূঁকির মাত্রাটা তখন বুঝতে পারিনি। এখন ভাবলেই ভয়ে শিরদারায় ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। গণ আদালতের আগের রাতেও আমরা ব্যস্ত বুলেটিন নিয়ে, জামায়াতে ইসলামীর অফিসের উল্টোদিকে। রীতিমত বাঘের গুহায় রাত কাটানোর মত। লেখালেখির কাজ শেষ করে সবাই ঘুমাতে চলে যায়। সকালে যেতে হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আমার ওপর পড়লো বুলেটিন নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু বুলেটিন শেষ করতে করতে সময় পেরিয়ে যায়। বুলেটিনের বান্ডিল নিয়ে আমি আর রোকন রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। মানুষের ভিড়ে এগোনোর উপায় নেই। কোনোরকমে মৎস্য ভবন পর্যন্ত যেতেই শুনি গোলাম আযমের অপরাধ মৃত্যুদন্ডতুল্য ঘোষণা করে রায় দিয়েছে গণআদালত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে একটি মিছিল বের হয়। দ্রুত বুলেটিন বিলি করে আমিও মিশে যাই মিছিলে। কিছুক্ষণ আগেও ছিলাম সাংবাদিক, তখন বনে গেলাম কর্মী। মিছিল প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে বাধভাঙ্গা পানির মত সামনে দিয়ে এগিয়ে যায়। অনেকটা গন্তব্যহীন সেই মিছিল দৈনিক বাংলা হয়ে মতিঝিলের দিকে যেতে থাকে। দৈনিক বাংলা মোড় থেকে ফকিরাপুলের দিকে যাওয়ার গলিতে ছিল ফ্রিডম পার্টির মুখপত্র দৈনিক মিল্লাতের অফিস। মিছিলের একটি অংশ থেকে সেখানে হামলা চালানো হয়। তবে মিছিলের সামনের অংশ শাপলা চত্বর হয়ে ইনকিলাব অফিসের দিকে এগিয়ে যায়। তাদের লক্ষ্য সাম্প্রদায়িকতার ঘাঁটি ইনকিলাব ভবন। কিন্তু সেখানে হামলার চেষ্টা করতেই পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করে, টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে। আমরা জড়িয়ে যাই সংঘর্ষে। এক পর্যায়ে টিয়ার গ্যাসের প্রবল ঝাঁঝে আমাদের অনেকেই আর কে মিশন রোড ধরে গোপীবাগের দিকে ঢুকে পড়ি। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ থামলে ফিরে আসি অফিসে।

এভাবেই চলছিল দিন। তখনও শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। সিনিয়রদের কাছে মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনি আর দূর থেকে দেখি।
এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে বিচিন্তা, যায়যায়দিন, পূর্বাভাস, খবরের কাগজ, দেশবন্ধু- এ ধরনের সাপ্তাহিক পত্রিকার রমরমা বাজার ছিল। কিন্তু এরশাদ পতনের পর এই ধরনের পত্রিকা আর পাঠকদের আকৃষ্ট করতে পারছিল না। সেই ধাক্কা লাগে আমাদের প্রিয় প্রিজন্মের গায়েও। বারী ভাইয়ের বন্ধু প্রিয় প্রজন্মের উপদেষ্টা সম্পাদক মৌলভিবাজারের মুহিব ভাইয়ের বিনিয়োগের পুরোটাই জলে যায়। এরমধ্যেই সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলাবাজার পত্রিকা নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। মতিউর রহমান চৌধুরী তখন দুই হাতে বিভিন্ন সাপ্তাহিকে খ্যাপ মারতেন। আমাদের পত্রিকায়ও লিখতেন। একসময় আলোচনা শুনলাম প্রিয় প্রজন্ম বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বাংলাবাজার পত্রিকার কাছে। সাথে আমরাও।

সম্পাদক ফজলুল বারী যোগ দিলেন রিপোর্টার হিসাবে। সহকারী সম্পাদক হিসাবে আমার দায়িত্ব প্রতি সপ্তাহে বাংলাবাজার হাউস থেকে প্রিয় প্রজন্ম বের করা। এরমধ্যে তোড়জোর শুরু হলো বাংলাবাজার পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যা বের করার। বাংলাবাজার পত্রিকা বেরিয়েছিল ১৯৯২ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। জুন মাসের শেষ দিকে বারী ভাই আমাকে বললেন, আপনি আম্মার (শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে মুক্তিযোদ্ধারা সবাই আম্মা ডাকতেন, দেখাদেখি আমরাও আম্মা ডাকি) বাসায় যান। বাংলাবাজার পত্রিকার জন্য একটি লেখা নিয়ে আসেন। এই এসাইনমেন্ট পেয়ে আমি রীতিমত উত্তেজিত। অনেকগুলো কারণে, জাহানারা ইমাম তো তখন আমাদের নেত্রী। তার বাসায় যাবো, তাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবো, এটাই বিশাল। তাছাড়া একাত্তরের দিনগুলি পড়ার কারণে আম্মার বাসা ‘কনিকা’র প্রতিটি কোনা আমার কল্পনায় আঁকা আছে। সেই বাসায় যাবো ভেবেও আমি উত্তেজিত। অনেক উত্তেজনা নিয়ে গেলাম। লেখা তৈরিই ছিল। নিয়ে চলে এলাম। আম্মাার সঙ্গে তেমন কথাও হয়নি। এনে দেখলাম লেখায় কোনো শিরোণাম দেয়া নেই। আন্দোলন নিয়েই লেখা।

শিরোণাম আমিই দিয়ে দিলাম ‘সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে’। পত্রিকা ছাপা হওয়ার পর বারী ভাই বললেন, শিরোণামটি আম্মার খুব পছন্দ হয়েছে। আপনাকে যেতে বলেছেন। আমি তো খুশীতে আত্মহারা। ছুটে গেলাম। আম্মার প্রশংসায় লজ্জা পেলাম, পেলাম প্রশ্রয়। সেই শুরু। আম্মার বিশাল ছেলের বাহিনীতে ঢুকে গেলাম। তারপর যতদিন বেঁচে ছিলেন; তার স্নেহে, প্রশ্রয়ে, শাসনে মেতে থাকলাম একাত্তরের ঘাতক বিরোধী আন্দোলনে। আমি তখনও নির্মূল কমিাট বা সমন্বয় কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। সরাসরি যোগাযোগ আম্মার সঙ্গে। তখন সময়টাই ছিল অন্যরকম। কাজ করি বাংলাবাজার পত্রিকায়, পড়াশোনা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে, আর সময় দেই আন্দোলনে। আমাদের প্রিয় প্রজন্মের কর্মী জুলফিকার আলি মাণিক আগে থেকেই আম্মার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আম্মা লাই দিতে দিতে এতটাই মাথায় তুললেন, আমি সময়ে অসময়ে কী এক আকর্ষণে ছুটে যাই কনিকায়।

আমাদের জন্য অবারিত দ্বার, প্রায় নিজেরই বাসা। হুট করে ক্যাম্পাস থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম এলিফ্যান্ট রোডে। গিয়েই আবদার, আম্মা খিদা লাগছে। তিনি ব্যস্ত থাকলে বলতেন, আমি জানি না, দ্যাখ ফ্রিজে কিছু আছে কিনা। নিজ দায়িত্বে নামিয়ে গরম করে খেয়ে ফেলতাম। আম্মা তখন খুবই ব্যস্ত। অনেক সময় বাসায় গিয়ে আম্মাকে পেতাম না। মাঝে মাঝে আবার সময় পেলে গল্প করতেন পুরোনো দিনের, আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। একাধিক অপারেশনে আম্মার মুখ তখন বাকা। কখনো কখনো কথা বলতেও কষ্ট হতো। তবুও তার চারপাশ ঘিড়ে থাকতো অদ্ভূত এক ভালোলাগা; আধুনিকতা আর রুচিশীলতার চমৎকার আবহ। তার মুড ভালো থাকলে বাসায় বাধাই করা পুরোনো দিনের ছবি দেখিয়ে বলতাম, আপনি তো সুচিত্রা সেনের চেয়েও সুন্দর। আপনার তো নেত্রী না হয়ে নায়িকা হওয়ার কথা ছিল। আম্মা হাসতেন। মুখটি বাচ্চা মেয়েদের মত করে লাজুক হাসি। বেশি মজা করলে কান মলে দিতেন। আমাদের সেই আম্মা আর সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক জাহানারা ইমাম যেন এক ব্যক্তি নন। আন্দোলনের প্রশ্নে, আদর্শের প্রশ্নে অনমনীয় জাহানারা ইমামই আবার আমাদের কাছে নিছক স্নেহময়ী মা। কুসুমিত ইস্পাত বুঝি একেই বলে। একবার ঈদের দিন দুপুরে তার বাসায় গেলাম। বিটিভিতে তখন বাংলা ছবি চলছিল, নায়িকা অঞ্জনা। আমরা ছবি দেখছিলাম না। তবে আলোচনাটা ঘুরে গেল সিনেমার দিকেই। আম্মা বললেন, অঞ্জনা আমার খুব প্রিয়, খুব ভালো নাচে। তারপর বাংলা সিনেমার নানা বিষয় উঠে এলো। একদম ছেলেমানুষের মত নানা পছন্দ-অপছন্দের কথা বললেন। আমরা বিস্মিত, আম্মা সিনেমা নিয়েও এতকিছু জানেন!

তখন ফেব্রুয়ারি, বইমেলা চলছে। একদিন আমাকে আর মাণিককে বললেন, তোরা কাল সকালে একটু বাসায় আসিস। এক জায়গায় যাবো। পরদিন সকালেই হাজির। বললেন ঠিক দুপুরে, যখন ভিড় কম থাকবে, তখন বইমেলায় যাবো। তোরা সঙ্গে যাবি। বললেন, আন্দোলন শুরুর পর এখন আর যেখানে সেখানে যেতে পারি না, ভিড় হয়ে যায়। আর বিকালে মেলায় গেলে সব প্রকাশকই তাদের বইটি তাকে দিতে চান। তাই তার ইচ্ছা দুপুরে গিয়ে নিজের মত মেলায় ঘুরবেন, বই দেখবেন, কিনবেন। আমরা তো সানন্দে রাজি। জাহানারা ইমামের সঙ্গে বইমেলায় যাবো। কিন্তু আম্মার কৌশল পুরো কাজে লাগলো না। মেলায় ভিড় কম থাকলেও, জাহানারা ইমার মেলায় এসেছেন, এটা জানাজানি হতেই পুরো মেলা তার পেছনে।

সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অটোগ্রাফপ্রত্যাশী, লেখক, প্রকাশক- সবাই। আমি আর মাণিক রীতিমত যুদ্ধ করে আম্মাকে নিয়ে মেলায় হাঁটছিলাম। নিজের পছন্দের বই কিনলেন, সাহিত্যপ্রকাশে গিয়ে নিলেন একাত্তরের দিনগুলির সর্বশেষ সংস্করনের অনেকগুলো কপি। প্রায় সব প্রকাশকই তাদের বই দিতে চাইলেন। অনেককে ঠেকানো গেলেও সবাইকে ঠেকানো গেল না। আমার আর মাণিকের অবস্থা তখন কেরোসিন, বইয়ের জন্য আর আমাদের দেখা যায় না। কোনোরকমে বাসায় ফিরলাম। ক্লান্ত আমরা ড্রয়িং রুমে বসে বই নিয়ে নানা আলোচনায় মেতে উঠলাম। আম্মা মেলা থেকে কিনেছিলেন, আবুল হাসান রচনাসমগ্র। বললেন, আমার খুব প্রিয় কবি। স্বগতোক্তির মত আউড়ে গেলেন ‘ঝিনুক নিরবে সহো, ভেতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও’। অনেকক্ষণ সবাই চুপ করে থাকলাম। ভাবলাম, সত্যি তো আম্মা তো ঝিনুকের মতই। একাত্তরে ছেলে হারিয়েছেন, স্বামী হারিয়েছেন, আরেক ছেলে থাকে সাত সাগর তের নদীর ওপারে। ক্যান্সার কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তার জীবন। তবুও দেশের ক্যান্সার দূর করতে একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিরুদ্ধে এক মহৎ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমাদের প্রজন্মের জন্য মুক্তা ফলিয়ে যাচ্ছেন। কৃতজ্ঞ করছেন গোটা জাতিকে।

নিরবতা ভাঙলেন তিনি নেজেই। আমাকে বললেন, আচ্ছা বলতো এত বই থাকতে, একাত্তরের দিনগুলি এত জনপ্রিয় হলো কেন? একটু ভেবে আমি বললাম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত বই পড়েছি, সবগুলোতেই লেখক নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন। পড়লে মনে হয়, লেখক না থাকলে দেশ স্বাধীন হতো না। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম একাত্তরের দিনগুলি। এখানে লেখক খুব নির্মোহ, নিস্পৃহ। লেখক শুধু ঘটনার বর্ননা দিয়ে গেছেন, নিজেকে মহান করতে চাননি। তাই এই বইটি হয়ে উঠেছে একাত্তরের অবরুদ্ধ ঢাকার দিনপঞ্জি। তিনি হাসলেন, প্রশ্রয়ের হাসি। বললেন, ভালো বলেছিস। গর্বে আমার বুক ফুলে উঠলো।

গণআদালতের বর্ষপূর্তিতে ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ সমন্বয় কমিটির কর্মসূচি ছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে। কিন্তু পুলিশ সেদিন গোটা এলাকা অবরুদ্ধ করে ফেলে। সাধারণ কাউকেই আসতে দেয়া হচ্ছিল না। মানুষ সব দূরে দূরে, স্টেডিয়ামের নানা চিপায় দাড়িয়ে আছে। সাংবাদিক পরিচয়ে আমরা ততক্ষণে পৌছে গেছি জিপিওর উল্টাদিকে জাসদ অফিসের সামনে। আমরা চিন্তিত আম্মা আসতে পারবেন কিনা, তাকে আসতে দেয়া হবে কিনা। পুলিশের সঙ্গে তর্কাতর্কি করে নেতা গোছের কয়েকজন এসেছেন। আসাদুজ্জামান নূর তখন জনপ্রিয় অভিনেতা। তখন বিটিভিতে চলছিল হুমায়ূন আহমদের জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল ‘অয়োময়’। নূর ভাই সেই সিরিজে জমিদারের চরিত্রে অভিনয় করতেন। বোঝা গেল পুলিশেও তার অনেক ভক্ত আছে। এই সুযোগটাই নিলেন তিনি। পুলিশ কাউকে বাধা দিলে বা আটক করলেই নূর ভাই এগিয়ে গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনছিলেন। এক পর্যায়ে নূর ভাই হাসতে হাসতে বললেন, আগে জানলে তো আমার হাতিটা নিয়ে আসতাম। অয়োময়ে নূর ভাই যে জমিদার চরিত্রে অভিনয় করতেন তার একটি হাতি ছিল, সে কথাই বলছিলেন তিনি।

এক পর্যায়ে আম্মা আসলেন। পরে জেনেছি, উনি অনেক ঘুরে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসেছেন। মূলত অল্প কয়েকজন নেতা আর বিপুলসংখ্যক সাংবাদিকের সামনে বক্তব্য রাখেন জাহানারা ইমাম। দূর থেকেই সমবেত মানুষ করতালি দিয়ে জবাব দেয়। পুলিশী বাধার মুখে কোনোরকমে সমাবেশ শেষে আমরা যাই আম্মার বাসায়। সেদিন পত্রিকা বন্ধ ছিল। তাই পরদিন পুলিশের এই নিপীড়নের খবর পত্রিকায় আসার সুযোগ ছিল না। তখন বেসরকারি টেলিভিশনও ছিল না। তাই আম্মার বাসায় বসে আমরা সিদ্ধান্ত নেই একটি বুলেটিন বের করার। আমান-উদ-দৌলা, জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল, জুলফিকার আলি মাণিক আর আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম লেখার কাজে। আম্মার বেডরুমের পশ্চিম দিকের রুমে বসে আমরা লিখছিলাম। মূল রিপোর্ট লেখার শিরোনাম দিলাম ‘স্বাধীনতা দিবসে অবরুদ্ধ ঢাকা’। সব নিয়ে যখন আম্মার কাছে গেলাম, দেখে তিনি বললেন, এই হেডলাইনটা কে করেছে? মুখ কাচুমাচু করে বললাম, আমি। তিনি হেসে বললেন, আমিও ঠিক এটাই ভাবছিলাম। গ্রেট ম্যান থিংকস এলাইক। লজ্জা আর কৃতজ্ঞতায় আমার মাথা নুয়ে গেল। আম্মা সত্যি সত্যি গ্রেট, কিন্তু আমি তো চুনোপুটি। তবু তার এই সার্টিফিকেট আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিল অনেকগুণ।

সব কাজ শেষ করে আস্তে আস্তে এক দুজন করে বেরিয়ে গেলেন। সব শেষে বেরুলাম আমি আর আমান ভাই (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক আমান-উদ-দৌলা)। তখন রাত ১২টার মত বাজে। আম্মার বাসার সামনে তখন সবসময় গোয়েন্দারা ঘুরঘুর করতেন। আমরা যারা আসা-যাওয়া করতাম কখনো কখনো তাদেরও অনুসরণ করতো। অন্যদিন পাত্তা দিতাম না। সাংবাদিকের পরিচয়পত্র তো ছিলই পকেটে। কিন্তু সেদিন একটু ভয় পেলাম। আমাদের কাছে বুলেটিনের সব কাগজ। যদি কোনো কারণে টিকটিকির হাতে ধরা পড়ি সারা সন্ধ্যার সব পরিশ্রম মাঠে মারা যাবে। কিন্তু সেই লেখাগুলো শাহরিয়ার ভাইয়ের মহাখালীর বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। বাসা থেকে বেরোনোর আগে আমি আর আমান ভাই পরামর্শ করলাম যে কোনো মূল্যে লেখাগুলো রক্ষা করতে হবে। প্রথমে আমরা লেখাগুলো দুই ভাগ করে নিলাম। তারপর দুজন আলাদাভাবে বাসা থেকে বেরুলাম। পরিকল্পনা হলো, পেছনে টিকটিকি লাগলে আগে সেটা খসাতে হবে। পরে আমরা পরিস্থিতি বুঝে সায়েন্স ল্যাবরেটরীর কাছাকাছি এসে মিলিত হবো। শার্টের নিচে কোমরে গুজে নিলাম লেখাগুলো। তারপর আল্লার নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। যথারীতি দুজন টিকটিকি আমাদের ফলো করলো। মূল রাস্তায় এসে আমরা তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য দুজন দুদিকে- একজন নীলক্ষেতের দিকে, একজন ঢাকা কলেজের দিকে চলে গেলাম। তারপর এলোমেলো হেঁটে, সিগারেট কিনে টিকটিকিকে বিভ্রান্ত করে আবার ঘুরে ঢাকা কলেজের দিকে গেলাম। তারপর সায়েন্স ল্যাবরেটরির কাছাকাছি গিয়ে আমি আর আমান ভাই নির্ধারিত স্থানে মিলিত হলাম। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রাতের নির্জন রাজপথে হাঁটতে লাগলাম আমি আর আমান-উদ-দৌলা।

স্বাধীনতা দিবসে পুলিশের বাড়াবাড়ির প্রতিবাদে পরদিন বিক্ষোভ সমাবেশ ডেকেছিল সমন্বয় কমিটি। আমি আর বারী ভাই বাংলাবাজার পত্রিকার গ্রিন রোডের অফিস থেকে রিকশায় রওয়ানা হলাম। আগের দিন সমাবেশ হয়েছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউর জাসদ অফিসের সামনে। সেদিন দেখলাম জাসদ অফিসের সামনে ফাঁকা, আরেকটু এগুতেই দেখলাম আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে সমাবেশ হচ্ছে। আমরা রিকশা থেকে নামতেই পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। তখন আওয়ামী লীগ অফিসের গেটে একটি চায়ের দোকানের ওপর দাড়িয়ে জাহানারা ইমাম, আবদুর রাজ্জাকসহ অন্যান্য নেতারা বক্তব্য রাখছিলেন। রিকশা থেকে নেমেই আমি লাঠিচার্জের মুখে পড়ে যাই। সাংবাদিক পরিচয় দিয়েও রক্ষা পাইনি। পুলিশের লাঠির আঘাতে আমার মাথা ফেটে যায়। রক্তে ভিজে যায় পুরো মুখ, শরীর। পড়তে পড়তে দেখছিলাম সিনিয়র নেতাদের ওপরও হামলা চালাচ্ছে পুলিশ। হঠাৎ দেখলাম আমার সহকর্মী ফটোসাংবাদিক আমিনুল ইসলাম শাহীনকে। তাকে ডাকলাম। তিনি এক পলক আমার দিকে তাকালেন, কয়েকবার ক্লিক করলেন। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই। অপরিচিত এক তরুণ আমাকে রিকশায় করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

পরে জেনেছি সেই তরুণের নাম লিটন, বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। তখন নবম শ্রেনীতে পড়–য়া লিটনও সমাবেশে এসেছিল আন্দোলনের সাথী হতে। ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে পড়ে থাকি অনেকক্ষণ। এক পর্যায়ে একজন এসে বললেন, অপারেশন করতে হবে। তাই সেভ করার ব্লেড লাগবে। আমি বললাম, আমার কাছে টাকা আছে, কিন্তু সাথে তো কোনো লোক নেই। কিন্তু ব্লেড আনার মত লোক ছিল না। তাই অপারেশন থিয়েটারে একটি ছুরি দিয়ে ধান গাছ কাটার মত পুচিয়ে আমার চুল কাটা হয়। সে ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ব্যথা পেয়েছিলাম চুল কাটাতে গিয়েই। নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল তখন। হঠাৎ খুব পরিচিত গলা পেলাম, প্রভাষ কই, প্রভাষ কই? আমাকে খুঁজতে খুঁজতে উত্তেজিত আমান ভাই অপারেশন থিয়েটারেই ঢুকে পড়েন। তখন আমার অপারেশন শেষ দিকে। আমান ভাই বললেন, পুলিশ নির্বিচালে লাঠিচার্জ করেছে।

আম্মাসহ অনেকেই আহত হয়েছেন। সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় আহতদের ঢাকা মেডিকেলেই আনা হয়। কিন্তু সেদিন আমি ছাড়া বাকি সবাই গিয়েছিল তখনকার পিজি হাসপাতালে। আমান ভাই বললেন, চলেন, চলেন। কোনোরকমে ব্যান্ডেজ করিয়ে আমান ভাই আমাকে নিয়ে চললেন পিজি হাসপাতালে। এখন যেখানে বিএসএমএমইউর কেবিন ব্লক, তখন সেখানে ছিল জরুরি বিভাগ। সেখানে গিয়ে দেখি এলাহী কান্ড। অনেকেই আহত হয়েছেন। পুলিশ, সাংবাদিক, সমন্বয় কমিটির নেতাকর্মী আর স্বজনদের ভিড়। বিভিন্ন রানৈতিক দলের নেতারা আসছিলেন আহতদের দেখতে। নির্মলদা (প্রয়াত নির্মল সেন) অনেকটা জোর করে আমার এক্স-রে করালেন। আমি এক ফাঁকে গিয়ে আম্মাকে দেখে আসলাম। তখনও তিনি অচেতন। ক্যান্সারের রোগী আম্মা এমনিতেই একটু দুর্বল। তিনি আন্দোলন করছিলেন মনের জোরে আর চেতনার দৃঢ়তায়। সেদিন সাংবাদিকদের মধ্যে একমাত্র আমিই আহত হয়েছিলাম। তাই জাতীয় নেতাদের পাশাপাশি পরদিন প্রায় সব পত্রিকায় আমারও ছবি ছাপা হয়েছিল। বাংলাবাজার পত্রিকায় ঘটনাস্থলে শাহীন ভাইয়ের তোলা রক্তাক্ত চেহারার ছবি আর অন্য সব পত্রিকায় পিজি হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে তোলা মাথায় ব্যান্ডেজ বাধা ছবি। পরদিন বাংলাবাজার পত্রিকার অফিস সহকারী মাহবুব অনেকগুলো পত্রিকা বাসায় দিয়ে গিয়েছিল। তখন বাংলাবাজার পত্রিকার অফিস ছিল গ্রিন রোডে, আর আমার বাসা ছিল রাজাবাজারে। আমার তখনকার সহকর্মী দীপু ভাই (বাংলাভিশনের বার্তা প্রধান মোস্তফা ফিরোজ) প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় তার ফিফটি সিসি মোটর সাইকেল আমার নিচতলা বাসার জানালার কাছে এসে হর্ন দিতেন, একবার খোঁজ নিয়ে যেতেন।

বিচিত্রার নিয়মিত পাঠক হওয়ায় শাহরিয়ার কবিরের নামের সঙ্গে পরিচয় ছিল আগে থেকেই। তার লেখা বইও পড়েছি ছোটবেলায়। একবার দুবার বিচিত্রা অফিসে গিয়ে দূর থেকে গম্ভীর শাহরিয়ার কবিরকে দেখেছিও। গোলাম আযমবিরোধী আন্দোলনের সময়ও দূর থেকেই তাকে দেখেছি। প্রথম কবে কিভাবে পরিচয় হয়েছিল মনে নেই। তবে সেটা আম্মার বাসাতেই। আম্মাই আমাকে তুলে দিয়েছিলেন শাহরিয়ার ভাইয়ের হাতে। আমার এখনও মনে আছে, শাহরিয়ার ভাই যখন প্রথম তার বাসায় যেতে বলেছিলেন, ঠিকানা দিয়েছিলেন, গ-১৬, মহাখালী, বন ভবনের পেছনে। তারপর আমাদের অনেক স্বর্ণালী ব্যস্ত সময় কেটেছে শাহরিয়ার ভাইয়ের বাসায়। আমি অবশ্য বন ভবন হয়ে যেতাম না। মহাখালী নেমে বাজারের পেছনের একটি গলি আছে, সেখান দিয়েই শর্টকাটে চলে যেতাম। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিশনের একটি সেক্রেটারিয়েট ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন শাহরিয়ার কবির। আমরা ছিলাম সেই সেক্রেটারিয়েটের মাঠের সৈনিক। ’৭১-এর শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের অপকর্ম অনুসন্ধানের জন্য জাতীয় সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত হয়েছিল গণতদন্ত কমিশন। তখন জানতাম না, পরে শাহরিয়ার ভাইয়ের বইয়ে পড়েছি, শেষ মুহুর্তে এই কাজটি তার কাঁধে চাপে। তাই তাকে দ্রুতগতিতে কাজটি করতে হয়েছে। কিন্তু আমি দেখেছি, তদন্তের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেননি তিনি। বিচিত্রার নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার কবির অনেক কড়া ছিলেন। কিন্তু আমাদের সঙ্গে ছিলেন অনেক বন্ধুসুলভ। একসাথে খানাপিনা, আড্ডা সবই হতো। আমার বন্ধু মন্টিও (মিজানুর রহমান খান, বর্তমানে লন্ডনে বিবিসিতে কাজ করেন) ছিলেন আমাদের সঙ্গে। সে বলতো, তোদেও তো অনেক সাহস। তোরা কিভাবে শাহরিয়ার ভাইয়ের সামনে এভাবে হেসে হেসে কথা বলিস। তবে যতই বন্ধুসুলভ হন, কাজের সময় ছিলেন খুবই কড়া। তদন্তের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেননি। তার কথা ছিল, এমনভাবে তদন্ত করতে হবে, যাতে যে কোনো আদালতে তা ব্যবহার করা যায়। সব সাক্ষির লিখিত বক্তব্য নিতে হবে, তার স্বাক্ষর থাকতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হলে সেই সাক্ষি নথিভূক্ত করা হয়নি। প্রথম দফায় যে ৮ জনের ব্যাপারে তদন্ত করা হয়েছিল, তার মধ্যে মাওলানা মান্নান ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তদন্ত করতে গিয়েছিলাম আমি।

বাংলাবাজার পত্রিকা থেকে ছুটি নিয়ে প্রথমে লঞ্চে চাঁদপুর, সেখান থেকে লঞ্চে পিরোজপুর গিয়েছিলাম। আমাদের তেমন টাকা পয়সা ছিল না। কোনোরকমে যাওয়া আসার খরচ দিয়েছিলেন শাহরিয়ার ভাই। তাঁর কাছে শুনেছি জাহানারা ইমাম রংপুরে নিজের জমি বিক্রি করে গণতদন্ত কমিশনের খরচ মিটিয়েছিলেন। তদন্ত করে ফেরার পর দিনের পর দিন সেটা নিয়ে আমরা বসেছি শাহরিয়ার ভাইয়ের বাসায়। চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে। তারপর রিপোর্ট চূড়ান্ত হয়েছে। সেই রিপোর্ট তুলে দেয়া হয়েছে গণতদন্ত কমিশনের হাতে। আমার মনে আছে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের রাজাবাজারের বাসা এবং অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশীদের ধানমন্ডির বাসায় গণতদন্ত কমিশনের একাধিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম আমরা। কমিশনের সদস্যরা সবাই সম্মানিত নাগরিক। আমরা সেক্রেটারিয়েটের কর্মীরা পেছনে বসে থাকতাম। মাঠ পর্যায়ের কোনো তদন্ত নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সংশয় দেখা দিলে আমাদের ডাক পড়তো। আমরা তখন সামনে গিয়ে আসামীর মত মাথা নিচু করে ব্যাখ্যা করতাম। কখনো সহজে ছাড় পেয়ে যেতাম। কখনো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হতো। ১৯৯৪-এর ২৬ মার্চ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে সমন্বয় কমিটির মহাসমাবেশে কমিশনের সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট পাঠ করেন কবি শামসুর রাহমান। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের চেয়ারম্যান কবি সুফিয়া কামাল ও জাহানারা ইমামসহ গণকমিশন ও কমন্বয় কমিটির নেতৃবৃন্দ। যেদিন এই ৮ যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলো, মনে হলো বিশ্বজয় করে ফেলেছি। এতদিনের পরিশ্রম সার্থক হলো। মনে আছে আম্মা খুব খুশী হয়েছিলেন। তাতেই আমাদের সব কষ্ট গলে পানি হয়ে যায়।

শাহরিয়ার ভাইয়ের বাসায়ই পরিচয় তার বন্ধু কাজী মুকুলের সঙ্গে। মুকুল ভাইয়ের জন্য দুটি লাইন আলাদা করে না লিখলে ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায় করা হবে। নির্মূল কমিটির মূল লোক শাহরিয়ার ভাই। খ্যাতি-পরিচিতি-ডেডিকেশন সব মিলিয়ে সব আলো ছিল শাহরিয়ার ভাইয়ের ওপর। মুকুল ভাই আড়ালে থেকে সব কাজ সামাল দিতেন। মহাখালীতে থাকা শাহরিয়ার ভাইয়ের বাসার চৌহদ্দিতে থাকা ডানা প্রিন্টার্সের ব্যবসায়িক কাজও সামলাতেন মুকুল ভাই। শাহরিয়ার ভাইয়ের ভাগ্যে আমি ইর্ষান্বিত, মুকুল ভাইয়ের মত একজন বন্ধু না থাকলে তিনি এভাবে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পারতেন না। ডানা ভাবিকেও যে আমরা কত বিরক্ত করেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু মজার কথা হলো, ভাবি কখনো বিরক্ত হতেন না। যে আবদার করতে আমরা নিজেরাই কুণ্ঠিত থাকতাম, সেটা শোনার পর ভাবি এমন হাসি দিতেন যেন এটা আমাদের পাওনা। আসলে একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিরুদ্ধে যারা কাজ করছে তাদের জন্যই ভাবির এমন উদার আপ্যায়ন। ডানা ভাবি যে শাহরিয়ার কবিরের স্ত্রী, শাহাদত চৌধুরীর বোন; এমন দুজন মুক্তিযোদ্ধার সংস্পর্শে থাকলে, মুক্তিযুদ্ধের জন্য তার জান কোরবান তো হবেই। শাহরিয়ার ভাইয়ের মেয়ে মুমু, আর ছেলে দীপ তখন ছোট। মাঝে মধ্যে তাদের সঙ্গে দুষ্টুমিতেও কেটে যেতো আমাদের সময়। শাহরিয়ার ভাইয়ের বাসায় অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে। তবে ভুলতে পারিনি বীর প্রতীক মোজাম্মেল হকের কথা। একাত্তরে কিশোর মোজ্জাম্মেল গভর্নর মোনায়েম খানকে তার বাসার ড্রয়িং রুমে হত্যা করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। এখনও মোজাম্মেল ভাই মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে একাত্তরের মতই উজ্জীবিত। আমাদের সেই সেক্রেটারিয়েটে অনেকেই ছিলেন। মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন মিজানুর রহমান খান মন্টি, জুলফিকার আলি মাণিক, ফজলুর রহমান, মেহেদী হাসান ও ইমন শিকদার। এই লেখাটি চূড়ান্ত করার আগে আমি অনেককেই পাঠিয়েছি। অস্ট্রেলিয়া থেকে বারী ভাই ফোন করে জানালেন, কাদের মোল্লাই যে একাত্তরের ‘কসাই কাদের’ সেটা প্রথম উঠে এসেছিল গণতদন্ত কমিশনের তদন্তে। ইমন শিকদার তুলে এনেছিলেন সেই সত্য। ইমনের বাসা ছিল মিরপুরে। তাই তদন্তে সে এমন অনেক অজানা তথ্য পেয়েছিল। শুধু কাদের মোল্লা নয়, অন্য অনেকের ক্ষেত্রেই গণতদন্ত কমিশনের সেই তদন্ত পরে মিলে গিয়েছিল যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনালের তদন্তের সঙ্গে। সেটা আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন ও গর্বের।

আমার মাকেও আমি আম্মা ডাকি। কিন্তু জাহানারা ইমামকে আম্মা ডাকতে কোনো দ্বিধা ছিল না। জাহানারা ইমাম আমাদের ছেড়ে গেছেন ১৯৯৪ সালেই। আমি সৌভাগ্যবান আম্মার স্নেহ এখনও পাচ্ছি। কিন্তু অল্প কদিনে জাহানারা ইমামের কাছ থেকে যে স্নেহ, ভালোবাসা পেয়েছি তা ভুলবো না কোনোদিন। ‘আম্মা’ সব একইরকম, মায়েরা এমনই হয়;স্নেহ, প্রশ্রয় আর ভালোবাসার অবিরল ধারা। আম্মা যেদিন শেষবার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র গেলেন, সেদিন গেলাম তাঁর বাসায়। অনেক ভিড় ছিল সেদিন। সাধারণত ভিড় বেশি থাকলে আমরা চলে আসতাম বা অন্য রুমে আড্ডা মারতাম, আম্মাকে বিরক্ত করতাম না। কিন্তু সেদিন দেখা করতেই হবে, আম্মা চলে যাচ্ছেন। কবে ফিরবেন জানি না, একেবারেই যে ফিরবেন না, সেটা তখন কল্পনাও করিনি। আম্মার সেই বিদায়ের ক্ষণটি আমার মনে আঁকা হয়ে আছে। জানি না সত্যি কিনা, কিন্তু মনে আঁকা সেই ছবিতে আম্মার বেডরুমের সামনের বারান্দায় একটি টবে বেলি ফুল গাছ ছিল। সেদিন সেই টবে অনেকগুলো মোতিয়া বেলি ফুল ফুটেছিল। আম্মা তার চারপাশে সবসময় আভিজাত্যের আভা ছড়িয়ে রাখতেন, বেলিফুলের শুভ্রতা আর সৌরভও সেদিন কনিকায় অন্যরকম এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। আসলে আমি সত্যি জানি না, সেদিন বেলি ফুল ফুটেছিল কিনা। কিন্তু কেন জানি আমার মনের আঁকা ছবিটা এমনই। ২০ বছর ধরে এই ছবি হৃদয়ে আঁকা। ভিড় ঠেলে একসময় যখন আম্মার বেডরুমে ঢুকলাম, আম্মা তখন বিছানায় শুয়ে। কাছে গিয়ে হাতটা ধরলাম। উনি বললেন, আর মায়া বাড়াইস না। কণ্ঠে ছোট্ট মেয়ের মত বেদনা। বুকটা ধরফর করে উঠলো। আম্মা তো কখনো এমন করে বলেন না। আম্মা আমাদের যে চির মায়ার বাধনে বেধেছেন, তা কি আর মুখে বললেই বাড়ানো-কমানো যাবে?
২৫ ডিসেম্বর, ২০১৩
(আগামী বইমেলায় প্রকাশিতব্য লেখকের ‘রাজাকারের ফাঁসি, সারাবাংলার হাসি’ বই থেকে নেওয়া)