তিনি বাঙলা গদ্যের কারিগর(শেষ পর্ব)।। লায়লা আফরোজ
এইদেশ উপস্থাপনা , বুধবার, অক্টোবর ৩০, ২০১৩


আমাদের সাহিত্যে এবং সমাজে এক আধুনিক যুগমানস নিয়ে এলেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি বাঙলা গদ্যের শরীরে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করলেন। রাজা রামমোহন ছিলেন ধর্ম সংস্কারক, সমাজ সংস্কারক এবং শিক্ষা সংস্কারসহ তাবৎ সংস্কার আন্দোলনের নেতা। এই তরুণ তুর্কী ইংরেজদের সাথে মিলে প্রবর্তন করেন যুগান্তকারী ‘সতীদাহ-প্রথা রোধ আইন’। এই আইন প্রবর্তনের ফলে কোটি-বর্ষের প্রচলিত অচলায়তন ভেঙে যায়, চিরদিনের জন্য সহমরণের হাত থেকে রক্ষা পায় এই উপমহাদেশের সহস্র-কোটি হিন্দু নারীর জীবন।

বাঙালির মানসভূমে তখনো বিপর্যয়ের ঘূর্ণিপাক চলছে। তাই, যুগনেতা রামমোহন নিজেকে কেবল সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাঙলা গদ্যের শরীরে প্রাণপ্রতিষ্ঠার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন। যুক্তি-বুদ্ধি ও মননের দীপ্তিতে তাঁর কলম নিঃসৃত বাঙলা গদ্য হয়ে উঠে আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত, বলিষ্ঠ ও গতিমুখর। রামমোহনের গদ্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ বাঙলা গদ্যকে তিনি গ্রানাইট স্তরের উপর দাঁড় করাইয়াছিলেন”। রবীন্দ্রনাথের এ উক্তি অনেকাংশে সত্য কারণ, বেদান্তের আলোচনা ও শাস্ত্রীয় তর্কের মতো কঠিন বিষয়কে তিনি একান্ত নিজস্ব নিয়মে বলিষ্ঠ গদ্যভাষায় প্রকাশ করেছেন। যদিও সমসাময়িকদের কাছ থেকে তিনি এ-বিষয়ে তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি।
রামমোহনই প্রথম ব্যক্তি যিনি পাঠ্যপুস্তকীয় পরিমন্ডলের বাইরে গিয়ে বাঙলা গদ্যের চর্চা করেছেন। সাহিত্যরস বলতে যা বুঝায় তা তাঁর রচনায় ছিলোনা। তবে, তাঁর ভাষা ছিলো সহজ-সরল-প্রাঞ্জল। এ গদ্য কাব্যশ্রীহীন বিবৃতি এবং প্রচারধর্মী, তবে অন্তর প্রেরণায় যুক্তিনিষ্ঠ ও বুদ্ধিদীপ্ত। কারণ, নির্ভেজাল সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্যে তিনি গদ্য রচনায় হাত দেননি । একান্ত প্রয়োজনে, বক্তব্য ও তর্কীয় বিষয়কে পাঠকের কাছে উপস্থাপনের মহৎ উদ্দেশ্যেই তাঁর গদ্য রচনা। এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, গদ্য রচনায় তাঁর আন্তরিকতা ছিলো সীমাহীন ও প্রচন্ড। রামমোহনের গদ্য সম্পর্কে পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর মশায় বলেছেন, “দেওয়ানজী জলের ন্যায় সহজ সরল বাঙলা লিখিতেন.....এই জন্য পাঠকেরা অনায়াসে হৃদয়ঙ্গম করিতেন কিন্তু সে লেখায় তাদৃশ পরিপাট্য ও মিষ্টতা ছিলনা।”

রামমোহনের পরে বাঙলা গদ্যের রঙ্গমঞ্চে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। রামমোহনের মতো বিদ্যাসাগরের হাত ধরেও এলো আর এক যুগান্তকারী সংস্কার-আইন। এই উপমহাদেশের হিন্দু নারীদের তিনি উপহার দিলেন ‘বিধবা-বিবাহ প্রথা চালু আইন’। এই আইন প্রবর্তন করে প্রকৃত অর্থে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন। শুধু আইন প্রবর্তন করেই ক্ষান্ত হননি তিনি, নিজের ছেলেকে বিধবা-বিবাহ করিয়ে আইনটিকে বাস্তবায়িতও করে গেলেন।

হিউম্যানিস্ট চেতনাবোধ ও কর্মাদর্শের আন্তরিক প্রেরণাবোধ থেকেই সারাটা জীবন তিনি ধর্ম, শিক্ষা, সমাজ সংস্কার ও জনহিতকর কাজে নিজেকে ব্যস্ত ও ব্যাপৃত রেখেছিলেন। আবার, ওই হিউম্যানিস্ট আদর্শকে সমাজ জীবনে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে লেখনীও ধারণ করেছেন। বাঙলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক সমস্যার সমাধান-কল্পে একদিকে তিনি রচনা করেছেন পাঠ্য বিষয়ী গ্রন্থ, অপরদিকে গ্রহণ করেছেন আধুনিক সাহিত্যের বুনিয়াদ রচনার মহান দায়িত্ব। তাঁর সমকালী শ্রীছন্দহীন গদ্য-ভাষাকে তিনি সুসংসত ও সুবিন্যস্ত করেছেন। বাঙালির নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হলে যে এক নতুন ভাষা-সাহিত্য গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন, এ সত্য তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। সেইসাথে, কিভাবে কোন পদ্ধতিতে এই নতুন ভাষা-সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় তার জন্য নিরলস পরিশ্রম এবং সাধনা করে গেছেন। বিদ্যাসাগরের সেই পরিশ্রম এবং সাধনার ফলই হচ্ছে আমাদের আজকের এই বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য।

আসলে বিদ্যাসাগর এমন এক প্রতিভাবান পুরুষ ছিলেন, যাঁকে তাঁর পূর্বেকার ও সমসাময়িকদের সাথে কোনোভাবেই একাতারে দাঁড় করিয়ে তুলনা করা চলেনা। কারণ, তিনি অত্যন্ত সচেতনতার সাথে তাঁর সমসাময়িক ও পূর্বেকার সকল গদ্যরীতিকে বর্জন করেছিলেন। ফোর্ট উইলিয়মীয় পাঠ্যপুস্তকিয় ভাষা, রামমোহনের শাস্ত্রীয় পণ্ডিতি ভাষা, অক্ষয়বাবুর তত্ত্বপ্রচারের ভাষা এবং সমকালীন সংবাদ ও সাময়িক পত্রাদির ভাষা কোনোটিকেই তিনি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেননি। তিনি সৃষ্টি করেন এক নতুন গদ্যরীতি-যা একান্তই বিদ্যাসাগরীয়-গদ্যরীতি।
পূর্বসুরী গদ্যকারদের রচনা ও সাধনা পূর্ণতা পেল বিদ্যাসাগরে এসে। পূর্বতনদের ত্রুটিমুক্ত হয়ে তাঁর রচনা হয়ে উঠলো প্রাঞ্জল এবং সাহিত্যিক সরসতার গুণে ঋদ্ধ। তিনি কেবল বাঙলা গদ্যের শরীরি কাঠামোই নির্মান করেননি, তাতে মেদ-মাংস দিয়ে যৌবন-লাবণ্যও ঢেলে দিয়েছিলেন। ফলে বিদ্যাসাগরের হাতে এসে বাঙলা গদ্য, সাহত্যিক-গদ্যে রূপান্তরিত হয় অর্থাৎ বাঙলা সাহিত্যিক গদ্যের সৃষ্টি বিদ্যাসাগরের হাতেই। পরবর্তীকালে এই সাহিত্যেইক-গদ্য বিচিত্রপথে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে পরিণত ও উন্নততর হতে হতে ক্রমশঃ এগিয়ে গেছে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে, পূর্ণতার দিকে।

যে কোনো ভাষাকেই সাহিত্যিক ভাষার উচ্চতর স্তরে পৌঁছাতে হলে বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরক্রম পার হয়ে যেতে হয়। প্রথম স্তরটা অর্থগত। দ্বিতীয় স্তরটা অর্থাতিরিক্ত অর্থাৎ অর্থ সাধারণত যা বলতে এবং বুঝাতে পারে, ভাষা তার বিশেষ গুণ ও যোগ্যতার কারণেই অর্থের অতিরিক্ত কিছু বলে এবং ইঙ্গিত দেয়। গদ্যভাষা যখন এই গুণাবলি অর্জন করে, তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্যিক-গদ্য। সাহিত্যিক গদ্যে, লেখকের ব্যক্তিত্ব ও যুগছায়া অবশ্যম্ভাবী।

বিদ্যাসাগরের পূর্বেকার গদ্য ভাষাকে অস্বচ্ছ কাঁচের সাথে তুলনা করা চলে। এ ভাষায় লাবণ্য এবং পরিমিতি বোধের অভাব ছিলো প্রকট। ফলে এ ভাষায় না ধরা পড়েছে যুগচিত্র, না ধরা পড়েছে লেখকের অবয়ব। বক্তব্যের অতিরিক্ত কিছু এ ভাষায় প্রকাশিত হয়নি। ফলে, এ ভাষা গদ্য সাহিত্যের ভাষা ছিলোনা। বিকাশের ক্রমপরিণতিতে গদ্য-শিল্প শৈলীর সোনা-সোহাগা সংযোজনে বিদ্যাসাগরের হাতে এই গদ্য-সাহিত্যের ভাষা, সাহিত্যিক-গদ্যের পদমর্যাদায় অভিষিক্ত হয়।

নিছক সংস্কারবাদী মানসিকতা নিয়ে এরকম বিশাল দুরূহ কর্মের আয়োজন ও সম্পাদন অসম্ভব। সম্ভব হলে, রামমোহন ব্যর্থ হতেন না! তিনি গদ্যকে শিল্প মনে করে, শিল্পী-মানসিকতা নিয়ে কলম ধরেননি। নেহাৎ প্রয়োজনের, বক্তব্য-প্রচারের বাহন হিসেবে মনে করেছিলেন বলেই তিনি ভাষার স্বাভাবিক রূপ-প্রকৃতিকে আবিষ্কার করতে পারেননি । মৃত্যুঞ্জয়ের মধ্যে শিল্পবোধ থাকলেও যুগ চেতনা ও ক্রম পরিশীলনের শ্রমসাধ্য সাধনার অভাবে সাফল্য লাভে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ বিচারে বিদ্যাসাগরই বাঙলা গদ্যের আদিশিল্পী, রূপকার। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “বিদ্যাসাগরের মহান কীর্তি বঙ্গভাষা”।

বিদ্যাসাগর পণ্ডিত পুরুষ ছিলেন, ইংরেজী এবং সংস্কৃত উভয় সাহিত্যেই তাঁর দখল ছিল অগাধ। মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং বিশ্লেষণ-ধর্মিতা তাঁর রচনাকে শুদ্ধতা দান করেছিলো। তিনি সাহিত্যিক-গদ্যের মৌলিক প্রাণশক্তি অর্থাৎ অন্তঃপ্রবাহী-ছন্দকে আবিষ্কার করেছিলেন। মধুসূদন যেমন বাঙলা পয়ারের হাজার বছরের সীমাবদ্ধ বেড়ী ভেঙ্গে ভাষা ও চিন্তার অন্তঃপ্রবাহী মুক্তির মাধ্যমে এক বিস্ময়কর কর্ম সম্পাদন করেছিলেন, ঠিক তেমনটি ! এ-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের উক্তি প্রণিধানযোগ্য, “বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের উছৃংখল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুপরিচ্ছন্ন ও সুসংযত করিয়া তাহাকে সহজ-গতি ও কার্যকুশলতা দান করিয়াছেন”।

বিদ্যাসাগরের গদ্যাংশ থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি দিলেই অনায়াসেই রবীন্দ্রনাথের এ বক্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ মিলবে-“কতিপয় পদ গমন করিয়া, শকুন্তলার গতিভঙ্গ হইল। শকুন্তলা, আমার অঞ্চল ধরিয়া টানিতেছে.....এই বলিয়া মুখ ফিরাইলেন। কন্ব কহিলেন, বৎস! যাহার মাতৃবিয়োগ হইলে তুমি জননীর ন্যায় প্রতিপালন করিয়াছিলে......সেই মাতৃহীন হরিণশিশু তোমার গতিরোধ করিতেছে”। পড়লেই মনে হয়, এ ভাষা আমাদের দারুণ চেনা ! বিদ্যাসাগরের ‘শকুন্তলা’ এবং ‘সীতার বনবাস’-এর ভাষা অনেকাংশেই একেবারে আধুনিক বাঙলা ভাষা। সংস্কৃত শব্দের যথাযথ, পরিমিত এবং সংহত ব্যবহার, প্রসাদগুণ ও ছন্দ-লালিত্যে লাবণ্যময়ী এ গদ্য তাঁর সমসাময়িক কোনো লেখকের কলম থেকে বের হয়নি।
বাঙলা গদ্যকে সাহিত্যিক-গদ্যে রূপান্তরের ক্ষত্রে বিদ্যাসাগরের নতুন কারিগরী কীর্তি সমূহ তা-হলে কি ছিল? বাঙলা গদ্যের শরীরে শিল্পীত ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠাই বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি। গদ্যেরও যে একটি আলাদা ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবোধ আছে তা বিদ্যাসাগর আমদের প্রথম বুঝিয়ে দিলেন। বাঙলা গদ্যের শরীরে এই শিল্পসম্মত গাদ্যিক-ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করতে গিয়ে তিনি পালন করেন এক বিস্ময়কর সংস্কার ও নবনির্মিতির মহৎ নির্মাতা বা কারিগরের ভূমিকা। এই সংস্কার ও নতুন সৃষ্টির আওতায় তাঁর অভিনন্দনযোগ্য কাজগুলো হচ্ছে-

০১) যথার্থ পরিমিতিবোধের মাধ্যমে বিরাম চিহ্নের ব্যবহার, যা উশৃংখল বাঙলা গদ্যকে সুশৃংখল করেছে।
০২) সংস্কৃতানুকরণপ্রিয়তা ত্যাগ করে সংস্কৃত-সাহিত্যের ঐতিহ্য এবং সাবলীল মার্জিত শুদ্ধ রসকে যৌক্তিক বিচারে গ্রহণ-বর্জনের নীতিতে রচনায় প্রয়োগ করেছেন।
০৩) অখন্ড অন্তঃপ্রবাহী ধ্বনি-স্রোত সৃষ্টির প্রয়োজনে তিনি ধ্বনি-মাধুর্যসৃষ্টিকারী সরল-বাক্য নির্মাণে ব্রতী হয়েছিলেন এবং সেই লক্ষ্যে ভাব ও বিষয়সম্পদ বহনে পারঙ্গম শব্দাবলি ব্যবহার করেছেন।
০৪) বিষয়ানুগ শব্দ ব্যবহার, দূরান্বয়ক ত্রুটি মুক্তি এবং সাহিত্যিক শিষ্টতা অক্ষুন্ন রেখে সূক্ষ্ম হাস্যরস সৃষ্টির মাধ্যমে সাহিত্যের রসধারাকে প্রবহমান রেখে বাঙলা গদ্যরীতিকে অসামান্য সাহিত্যিক গুণসম্পন্ন করে তুলেছেন।
০৫) পূর্বের গদ্যরীতির অপ্রয়োজনীয় দাঁত ভাঙ্গা, শ্রুতিকটু সন্ধিবদ্ধ-সমাসবহুলতা ত্যাগ করে, শব্দ ব্যবহারের বিশেষ রীতি চালু করেন। ফলে, বাঙলা গদ্য সর্বস্তরে ব্যবহারের যোগ্যতা অর্জন করে।
০৬) ভাষা থেকে গ্রাম্য পাণ্ডিত্য ও অসভ্য-বর্বরতা দূর করেন।
০৭) বিদ্যাসাগরের রচনায় ভাবই প্রধান। ভাষা, বিষয়ের বাহন মাত্র।
০৮) সংস্কৃত সাহিত্য থেকে বাঙলা ভাষায় ব্যবহার উপযোগী ও ভাবপ্রকাশে সক্ষম সমার্থক সুকুমার শব্দাবলি আহরণ করেন।
০৯) বাক্যের উদ্দশ্য ও বিধেয়’র ভাব-সংগতিকে সুসংহত করেছেন ফলে, ভাষার মধ্যে একটা প্রবহমান রিদম্‌ সৃষ্টি হয়েছে যা অন্যদের রচনায় ছিলোনা।

বিদ্যাসাগর, কবি বা উপন্যাসিকদের মতো সৃজনধর্মী মৌলিক শিল্পী ছিলেন না। তবে, মৌলিক সৃজনী প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমকে অক্লান্ত পরিশ্রম ও কারিগরী নিষ্ঠায় বিকশিত করে তোলাতেই তাঁর কৃতিত্ব। আর এই একটিমাত্র কারণেই তিনি মহৎ শিল্পী এবং মৌলিক শিল্পীরা তাঁর কাছে চিরঋণী। অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি কোনো সাধারণ অনুবাদক বা আক্ষরিক অনুবাদক ছিলেন না বরং স্বাধীন শিল্পীর মতো প্রয়োজনীয় গ্রহণ-বর্জন করেছেন! তাই, সামগ্রিক বিচারে বাঙলা ক্লাসিক সাহিত্য-গদ্য নির্মাণে এবং বাঙলা ভাষার বিকাশে বিদ্যাসাগর প্রথমতঃ একজন আশ্চর্য কারিগর, দ্বিতীয়তঃ একজন মহৎ শিল্পী।

এই বিরাট-বিশাল ভাষা কীর্তি স্বত্বেও বিদ্যাসাগরীয় রচনারীতির দোষ-ত্রুটি নিয়ে পরবর্তীকালে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। এই বিতর্কগুলো থেকে দুটো মত বেরিয়ে এসেছে-
০১) অপ্রচলিত, কঠিন সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার ও রচনার নীরসতা।
০২) সহজবোধ্য সরল রচনা।

প্রথম মতটির ধারক বঙ্কিমচন্দ্র এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তাঁরা উভয়েই বিদ্যাসাগরীয় ভাষার পরিবর্তে আলালী ভাষার প্রশংসা করেছেন। যদিও সুকুমার সেন তাঁদের এ মতের বিরোধীতা করে বলেছেন, বঙ্কিমের বক্তব্য অযৌক্তিক ও বিদ্বেষ-ভাবাপন্ন।
এ-কথা সত্য, বিদ্যাসাগরের রচনায় সমাসাধিক্য, পুনরুক্তি দোষ ও কৃত্রিম অলংকার ব্যবহারের ত্রুটি রয়েছে। এসব দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও বিদ্যাসাগরের বিশাল কর্মযজ্ঞ বিচার করে একথা অনায়াসেই বলা যায় যে, বাঙলা চলিত-গদ্যে প্রমথ চৌধুরীর যে ভূমিকা, বাঙলা সাধু-ভাষার রূপ নির্মাণে বিদ্যাসাগরের কীর্তি তার চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশী।

প্রত্যেক ভাষাতেই প্রকাশের বিষয়ী রূপ, ২টি। একটি মনন, জ্ঞান ও তথ্য-সংগ্রহমুখী। অপরটি ভাবকে কেন্দ্র করে রস-সৃষ্টিমুখী। ভাষার শিল্প ও প্রকাশগুণের দুটি ক্ষেত্রেই বিদ্যাসাগর অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে বিচরণ করেছেন। তাঁর প্রতিভার বড়ো গুণ, তিনি বাঙলা ভাষার আভ্যন্তরীণ প্রকৃতি ও অভিরুচিকে যথার্থভাবে ধরতে পেরেছিলেন। ভাষার আভ্যন্তরীণ রুচি-প্রকৃতির সাথে নিজস্ব নন্দনতাত্ত্বিক মানসের মিলন ঘটিয়ে বিদ্যাসাগর হয়ে উঠেছিলেন একজন প্রকৃত শিল্পী। তা-নাহলে তিনি চিরকালই পণ্ডিত অথবা ব্যয়াকরণবীদ থেকে যেতেন।

যে কোন ভাষার প্রকৃতিগত আদলের মধ্যে যখন লেখকের চেহারাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন তা ওই লেখকের স্টাইল বলে বিবেচিত হয়। স্টাইল গড়তে ২টি বিষয়ের প্রয়োজন হয়। একটি লেখকের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য-জারিত কলমের-গুণ। অপরটি ভাষার নিজস্ব প্রকৃতিগত-গুণ। এ দুটি গুণের সমাহার ঘটিয়েই বিদ্যাসাগর একজন যথার্থ গদ্য-শিল্পী হয়ে উঠেছেন। ভাষা নির্মাণ, শব্দচয়ন ও অলংকার ব্যবহারে শিল্প চেতনার সাথে শক্তিমান দূরদর্শিতার সফল কেমেস্ট্রি ঘটানোর কারণেই বিদ্যাসাগর আহরিত সংস্কৃত শব্দাবলি ও অলংকারমালা বাঙলা গদ্যের অধুনা-বিবর্তিত রূপের মধ্যেও শিল্পীত অবয়বে ঝিলিক মেরে ওঠে। এখানেই বিদ্যাসাগরের কীর্তি, এখানেই তাঁর মহৎ কর্মের সাফল্য ও সার্থকতা।

লায়লা আফরোজঃ পেশায় ব্যাংকার, নেশা আবৃত্তি। সৌখীন লেখক, ভাষা ও সাহিত্যের একজন নিবিষ্ট পাঠক।