স্মৃতির মুক্তো মালায় জ্বলে তাঁর নাম
আইভি রহমান , রবিবার, অক্টোবর ২৭, ২০১৩


এই ভাবে লিখতে বসব ভাবিনি। জানতাম চলে যাচ্ছেন, যাবেন, কিন্তু এত জলদী! জানুয়ারি ২০১৩ এ দেশে গেলাম বেশ অনেক গুলো বছর পর। মনে এক ধরনের উচ্ছলতা আর আনন্দ তুফান বইছিল। কারন আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ হচ্ছে।
বই প্রকাশ উৎসব অনুষ্ঠানের দিন ঠিক হবার আগে কাকে কাকে বলব তার তালিকা তৈরি করতে যেয়ে এক নম্বরে লিখেছিলাম কবি বেলাল চৌধুরীর নাম দুই নম্বরে গিয়াস কামাল ভাইয়ের নাম তিন নম্বরে মোবারাক হোসেন চার নম্বরে রাহাত খান ভাইয়ের নাম। একে একে তাঁদের সবার সাথে যোগাযোগ করার জন্য ফোন করি। জানতে পারি বেলাল ভাই কলকাতায় বই মেলাতে।
গিয়াস কামাল ভাইকে ফোন করলে ভাবী জানান , কামাল ভাই একে বারেই শয্যাশায়ী। মাঝে মাঝেই কাউকে চেনেন না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন।

খুশীর তুফানে ছুটতে থাকা মনের নদীতে আচানক কেমন ঝিমানি অনুভব করলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে পড়েছিল আব্বার মুখ। আব্বার খুব বেশি প্রিয় ছিলেন গিয়াস কামাল ভাই। নিজের অজান্তেই গালে বয়েছিল লবন ধারা । ছোট বোন জিজ্ঞাসা করেছিল , এত খুশী হয়ে গিয়াস কামাল ভাইকে ফোন দিয়ে কেন চোখ ভেজা আমার! ভেজা ভেজা কন্ঠে বলেছিলাম তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা। দোয়া করেছিলাম ভীষণ ভাবে।
তার পর ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম নিজের কাজে। দেশে তখন চলছিল তুমুল উন্মাদনা, রাজাকারদের ফাঁসির জন্য আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রানের দাবিতে উতপ্ত দেশ, শাহবাগের জাগরণ মঞ্চ , একুশের বই মেলা সহ নানান ব্যাস্ততায় ডুবে ছিলাম। আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি।
মার্চে আবার অস্ট্রেলিয়া ফিরে আসার আগে কেন যেন হুট করে মনে পড়ে গেল গিয়াস কামাল ভাইকে। ফোন দিলাম। ভাবী জানালেন সেই একই রকম আছেন। ধানমন্ডিতে আছেন। দোয়া করতে বললেন। অস্ফুট কন্ঠে বলেছিলাম, অবশ্যই ভাবী।

তারপর সেপ্টেম্বরের চার তারখে ফেস বুকের ইনবক্সে গিয়াস কামাল চৌধুরীর কাছ থেকে একটা ম্যাসেজ দেখে বুকের ভেতর হাতুড়ীর ধক ধক পিটুনির শব্দ নিয়ে এক নিঃশ্বাসে ঐ ম্যাসেজটা পড়ি, ওটা পাঠিয়েছিল, Jumana Chowdhury, গিয়াস কামাল ভাইয়ের মেয়ে, সে লিখেছিল এখন তার বাবার এই পেইজটা সে দেখে ,আমাকে আন্টি সম্বোধন করে লিখেছিল, গিয়াস কামাল ভাইকে পাঠানো আমার ম্যাসেজটা সে পড়ে শুনিয়েছে আর গিয়াস কামাল ভাই আমাকে চিনতে পেরেছেন। লিখেছিল , আব্বু অনেক অসুস্থ , আন্টি দোয়া করবেন।

দোয়া করেছি মনের অতলে জমানো সম্মান আর শ্রদ্ধা থেকে। বড় ভাইয়ের প্রতি ছোট বোনের চিরন্তন ভালবাসার প্রাবল্য থেকে।
আর আজ সকালে সংবাদ পত্রের পাতায়, ফেস বুকের পাতায় চোখ রাখতেই দেখলাম সেই ভয়ঙ্কর সত্য, সব চেয়ে নির্মম কঠিন সত্য যা থেকে আমাদের কারোই সরে আসবার উপায় নেই। বেশ কিছুটা সময় চুপ করে বসে পড়েছিলাম চিরকালীন খুব বেশি অনুভুতি প্রবণ আমি।
কেমন যেন একটা শূন্যতা খামচে ধরেছিল বুকের খাঁচা। একে একে সবাই চলেই যাবে? কিরন ভাইয়ের পোস্টে লিখতে যেয়ে আবার গালের উপর ঠান্ডা স্রোত টের পাই।

প্রিন্স ( মোহাম্মদ আলী বোখারী) লিখেছে। ওর লেখা পড়ি। মনে পড়ে দু বছর আগে যখন টরন্টো গেলাম প্রিন্স সেই সতের বছর বা তারও আগের আমাদের পুরনো ছবি নিয়ে এসেছিল আমাকে দেখা করতে এসে । ঐ ছবি দেখে কিযে খুশি হয়েছিলাম তা প্রকাশের ভাষা নেই।
বুঝেছিলাম, সেই ভোয়া ফ্যান ক্লাব, রেডিও ক্লাবের উচ্ছল সেই সব দিন গুলো তেমনই জ্বলে আছে মনের গোপন কোনে আজো । মনের ভেতরে স্মৃতির ঠান্ডা হীম শীতল জোছনার আলোয় দেখতে পাই, সেই কামাল ভাইকে, সেই হাসি মুখ, সেই অমায়িক প্রাণবন্ত, ভীষণ আন্তরিক এক ব্যক্তিত্ব।
আজকে যখন ভাবলাম কামাল ভাইকে নিয়ে কিছু একটা লিখি, পারছিনা। অজস্র স্মৃতির টুকরো টুকরো সুবাসিত ফুলের মালা গলায় পরে বসে আছি।

তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, রেডিওতে উত্তরন মাগ্যাজিন অনুষ্ঠান চলছে ( সরাসরি প্রচারিত হোত তখন) শফি কামালের উপস্থাপনায়, তাতে আমি , কিরন ভাই, গিয়াস কামাল ভাই, লাকি আপা, কখনো রেহানা পারভিন আপা যেন একটা পরিবার এক সাথে কথা বলছি। শ্রোতাদের তথ্য জানাচ্ছি তাবৎ দুনিয়ার রেডিও বিষয়ক ব্যাপারে আর আমাদের মধ্যমণি হয়ে আছেন উজ্জ্বল আলোর মত গিয়াস কামাল ভাই।
যে কোন রেডিও সংক্রান্ত বিষয়ক অনুষ্ঠান তা সে হোটেল সোনার গাঁও বা প্রেস ক্লাব বা রাশিয়ান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বা ইউ এস আই এস ভবনেই হোক আমরা প্রায় সব সময়ই পেয়েছি কামাল ভাইকে আমাদের পাশে ছায়ার মত, অভিভাবকের মত, বড় ভাইয়ের মত।
আমার জীবনের বিশেষ দিনটিতে ও তিনি ছিলেন। খুব হাসি মুখে আব্বাকে বলেছিলেন ষোলই জুলাই আইভি কে বিদায় না করে বাইশে জুলাই করলে আমরা ভাই বোন এক সাথে দিনটা পালন করতাম আর একটা কেক কিনলেই হয়ে যেত। আব্বা হেসেছিলেন।

কাঁঠাল খেতে পছন্দ করতেন জেনে আব্বা একবার অনেক গুলো কাঁঠাল কিনেছিলেন কামাল ভাই আমাদের মিরপুরের বাসায় এলে।
কত্ত বছর পেরিয়ে গেছে। কত্ত দিন হারিয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতি গুলো একেবারে টাটকা, ঝকঝকে, চকচকে ইলিশের রুপোলী আঁশের মত চিক চিক করে জমে যাচ্ছে চোখের কোণে।

প্রেস ক্লাবে আবার কখনো গেলে কামাল ভাইয়ের আতিথিয়তা বা চোখের দেখাটাও অথবা নিদেন পক্ষে তাঁর নাম ধরে কাউকে জিজ্ঞাসা করা যে , কেমন আছেন কামাল ভাই ? আর কোন দিন হবে না! এবার দেশে থাকা কালীন সময়ে বেলাল ভাই (বি এস এস) বিরিয়ানি খাওয়ালেন দো’তালায় ক্যান্টিনে নিয়ে যেয়ে। তখনো গিয়াস কামাল ভাইয়ের কথা চলে এসে ছিল কথা প্রসঙ্গে।

আচানক ছবি দেখতে মন চাইলো কামাল ভাইয়ের, কিন্তু পুরনো একটা ছবিও নেই এখানে। সব দেশের আলমারিতে পড়ে আছে।
হয়ত ধুলো জমেছে অনেক ছবির বুকে। হয়ত ঝাপসা হয়ে গেছে অনেক ছবি। হয়ত নষ্টও হয়ে গেছে অনেক ছবি, কিন্তু বুকের ভেতরে যে ছবি আর স্মৃতি ধরে আছি তা কোনদিন মুছে যাবার নয়। হারাবার নয়। ঝাপসা হবার নয়।
কিন্তু চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। চোখের কার্নিশ জুড়ে বিন্দু বিন্দু শাদা মুক্তো কণা জানান দেয় , আসলে জীবনের আঙিনায় যার নাম একবার গাঁথা হয়ে যায় তাকে আর উপড়ে ফেলা যায়না।
সে ধীরে ধীরে বিশাল মহীরুহ হয়ে যায়। আমাদের অনেকেরই জীবনে গিয়াস কামাল ভাই সেই জায়গাটা নিয়ে ছিলেন আছেন থাকবেন আজীবন।

আইভি রহমান
আইনজীবী । ক্যানবেরা।
২৬ /১০/১৩ ।