তিনি বাঙলা গদ্যের কারিগর ।। লায়লা আফরোজ
এইদেশ উপাস্থাপনা , সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০১৩



মলিয়েরের নাটকের চরিত্র হঠাৎ একদিন এ-কথা আবিষ্কার করে অবাক হয়ে গিয়েছিলো যে, চিরকালই সে কথা বলেছে গদ্যে। ঊনিশ শতকে এসে আমাদের বাঙালিদেরও এরকম বিস্ময় জেগেছিলো। কারণ বাঙালি চিরদিনই কথা বলেছে গদ্যে অথচ লিখে এসেছে পদ্যে। অন্তত ৮০০ থেকে ৯০০ বছর এভাবেই চলেছে। চর্যাপদ থেকে শুরু করে রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্রের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত অর্থাৎ দশম বা একাদশ শতক থেকে ১৮০১ সাল পর্যন্ত বাঙলা সাহিত্য ছিল পদ, পয়ার ও পাঁচালির পদ্য বিশেষ।

পৃথিবীর সব দেশের ভাষা সাহিত্যে গদ্য এসেছে তুলনামূলকভাবে অনেক পরে, অনেক নবীন রূপে। ছন্দোবদ্ধ কবিতা, সাংগীতিক সুর ও ধ্বনিময় ভাষাই ছিলো মানুষের আদিম ভাব প্রকাশের বাহন। তাহলে, গদ্য কখন এলো? গদ্য এলো অনেক পরে, যখন মানুষের সমাজ জীবন ও মানুষে মানুষে এক উচ্চতর জটিল স্তরে প্রবেশ করেছে। যখন বুদ্ধির মুক্তি মানুষের কাংখিত চাহিদা হয়ে দাঁড়ালো, প্রয়োজন পূরণ ও স্বাধীকারের চেতনা যখন মানুষের মনে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো তখনি সে নিজের প্রয়োজনীয়তাকে, চিন্তাভাবনাকে নিজের প্রতিদিনের সাংসারিক ভাষায় প্রকাশের তাগিদ অনুভব করলো। এ অনুভব যেহেতু মানুষের, সেহেতু ভাব-ভাষা ও চেতনের নিয়ন্ত্রক শক্তি হচ্ছে মানুষ। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে আত্মপ্রকাশের বিস্তৃত-বিশাল তাগিদে এক সময় বুঝতে পারলো ছন্দোবদ্ধ পদের নমনীয়তা-কমনীয়তার মাধুর্যে সীমাবদ্ধ থাকা আর সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন সমুদ্র স্নানের। আর, এ সমুদ্র স্নানের ফলেই গদ্যের বিকাশ।

গদ্য ভাষার বিকাশ ঘটেছে আধুনিক যুগে। আধুনিক যুগ মানে, মানুষের জীবনে দ্বন্দ্ব ও প্রচন্ড সংঘাত মুখরতার যুগ। মানুষের জীবনের জটিলতা-যন্ত্রণা, সচলতা-প্রবহমানতা, ভয়-সংশয়-ঘৃণা, ব্যক্তি ও সামাজিক মানুষের মুক্তির আকাংখা এসব নিয়েই আধুনিকতার যুগ লক্ষণ, আধুনিক যুগ। কি ব্যক্তি কি সামাজিক জীবনে, প্রতিটি দ্বন্দ্ব প্রতিটি সংঘাতই নিশ্চিত পরিণতিময়। আধুনিক জীবনে ব্যক্তি ও সমাজের সংঘাতের ফলে মানুষের ভাব-জীবন-চিন্তা-চেতনা ও সংঘাতমুখর হয়ে ওঠে। এ ভাব-সংঘাতের ফলেই সমাজে-সাহিত্যে-শিল্পে আসে নতুন জোয়ার, নতুন বাঁক, নতুন মোড়। কারণ, আধুনিকতা দেবতা-নির্ভর নয়, মানুষ-নির্ভর। মানুষ যেমন, তেমনি মানুষের ভাগ্যও সমাজ সম্পৃক্ত। সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সমন্বয়ের ফলেই মানব ভাগ্য নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত। তাই, আধুনিক মানুষ আত্মপ্রকাশ ও আত্মব্যাখ্যার বাহন হিসেবে পদ্যকে নয়, গদ্যকেই করে নিয়েছে একান্ত বিশ্বস্ত কার্যকর মাধ্যম হিসেবে।

পৃথিবীর অনেক ভাষা থেকে বাঙলা ভাষায় গদ্যের জন্ম হয়েছে অনেক পরে। বাঙলা গদ্যের জন্মের এই বিলম্বের হেতু কি? অনেকেই বলেছেন, বাঙলা পয়ারের অতি নমনীয়তা এবং সহজ প্রকাশ ক্ষমতাই এই বিলম্বের হেতু। একথা সত্য, ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙলায় চলেছে একটানা পয়ার-ত্রিপদীর রাজত্ব। চর্যাপদসহ ধরলে এই একচেটিয়া রাজত্বের সময়সীমা আরো দীর্ঘ হবে। সম্ভবতঃ পয়ার-ত্রিপদী, মানুষের সাংসারিক ভাষার সহজ এবং বিকল্প মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ও গৃহীত হয়েছিল বলেই, মুখের ভাষা গদ্য সাহিত্যের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি কারণ বিশেষভাবে অনুধাবনের দাবী রাখে। আর তা হল, যে যুগ-পরিবেশের দাবীতে গদ্যের জন্ম নেবার কথা সেই আধুনিকতাই আমাদের ঔপনিবেশিক দেশে এসেছে খুব দেরীতে, বড়ো বিলম্বে। আধুনিকতা আমাদের দেশে এসেছে জাহাজে চড়ে, অনেকটা হস্তীগামীতায়। ট্রেনে বা ঘোড়ায় চড়ে এলে অবস্থা অন্য রকম হতে পারতো। অবশ্য, এর জন্য দায়ী আমাদের ঔপনিবেশিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। ইংরেজরা আমাদের ততটুকু আধুনিকতাই শিখিয়েছে, যতটুকু ওদের শাসন ও শোষণের জন্য সহায়ক বলে মনে করেছে। ভাবতেও আশ্চর্য লাগে, ইওরোপ যখন তার মধ্যযুগ ও মহাকাব্যিক পর্ব শেষ করে চিন্তা-চেতনা ও ভাবে আধুনিকতার উত্তুঙ্গে আরোহণ করছে ঠিক তখনই মহাকাব্যের মোড়কে মাইকেল মধুসুদন দত্ত সর্বপ্রথম বাঙলা কাব্যে আধুনিক মানবতাবাদের ভ্রূণের উদ্বোধন ঘটালেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রচনার মধ্য দিয়ে। তিনি পরাক্রমশালী অনার্য দ্রাবিড় রাজা রাবণকে রাক্ষসরূপী খল-নায়কের উপাধী থেকে মুক্তি দিয়ে আপামর পাঠকের কাছে এক মানবিক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করলেন। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’র রাবণ একাধারে সংবেদনশীল পিতা, দায়িত্ববান স্বামী, প্রজাহিতকর-আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শাসক এবং একই সঙ্গে পরিপূর্ণ ট্র্যাজেড়ী কিং। এ বিষয়টিকে সযত্নে মনে রাখলে বাঙলা গদ্যের জন্মের বিলম্বের কারণটিও সহজেই বোধগম্য হয়ে উঠবে।

এ কথা মনে রাখা দরকার যে, বাঙলা গদ্য তখনো পর্যন্ত সাহিত্য মাধ্যম হিসেবে জন্ম না নিলেও ধর্মীয় ও বিষয়ী ক্রিয়া কর্মে তখনো গদ্যের ব্যবহার ছিল। এমনকি পদ্যের একচেটিয়া রাজত্বের যুগেও রাজকার্যে, আদালত, ধর্মবেত্তাদের কাজে বৈষয়িক বিষয়ে ব্যবহৃত কিছু কিছু গদ্যের নমুনা আমরা দেখতে পাই। অষ্টাদশ শতকে বিদেশীরা অর্থাৎ ইংরেজ ও পর্তুগীজরা বিশেষ করে ধর্ম প্রচারের প্রয়োজনে বাঙলা গদ্যের বিকাশে প্রচুর সাহায্য করেছে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, বাঙলা গদ্য তখন বিচ্ছিন্নভাবে সংকীর্ণ গলি পথে নানা প্রয়োজনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে শম্বুক গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। তার প্রমাণ মিলে রাজ-রাজড়াদের চিঠিপত্রে, কড়চায়, দলিল-দস্তাবেজে, সহজিয়া গ্রন্থে এবং ইংরেজদের অনুবাদ কর্মে। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্বে প্রকৃতপক্ষে আমরা ৪টি গদ্যরীতির সন্ধান পাই। এই গদ্যরীতিগুলো হচ্ছে-
০১) আদালতী গদ্য (আরবী-ফারসী-ঊর্দুর সংমিশ্রণে গঠিত)।
০২) পণ্ডিতী বা শাস্ত্রীয় গদ্য (সংস্কৃত-তৎসম শব্দ ভারাক্রান্ত শাস্ত্র পাঠকদের গদ্য)।
০৩) সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত গদ্য (সাংসারিক কেজোগদ্য)।
০৪) পর্তুগীজ ও ইংরেজ বাক্‌রীতি আশ্রিত গদ্য (সাহেবী গদ্য)।
একমাত্র সাহেবী গদ্য ছাড়া অন্য ৩টি গদ্যরীতিতে বাঙলা ভাষার বাক্য গঠন প্রণালীর স্বাভাবিক রীতিই অনুসৃত হয়েছে। বাঙলা বাক্য গঠন প্রণালী যেমন প্রথমে কর্তা, মধ্যে কর্ম এবং শেষে ক্রিয়া পদের ব্যবহার সমূহ যথাযথভাবে প্রথম ৩টি রীতিতে অনুসৃত হয়েছে। এছাড়া সংস্কৃত, তদ্ভব, তৎসম, বাঙলা, দেহাতী, আরবী, ফার্সী, ঊর্দু, হিন্দী ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের দিক থেকেও পরবর্তীকালের বাঙলা গদ্যের অধিকাংশ লক্ষণও এই গদ্যরীত সমূহে বর্তমান।

বাঙলা গদ্যের ধারাবাহিক পরিণতির ইতিহাসকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বিচার করলে এর ৪টি সুস্পষ্ট ক্রম পরলক্ষিত হয়। এই ৪টি গদ্য রীতি হচ্ছে-
০১) পত্র রচনা
০২) পাঠ্য বিষয়ক রচনা
০৩) আখ্যান বা কাহিনী বিষয়ক রচনা
০৪) সর্বার্থসিদ্ধি

আবার এই ৪টি গদ্যরীতিকে কেন্দ্র করে গদ্য সাহিত্যের ৪টি রূপও গড়ে উঠেছে। সেগুলো হচ্ছে-
০১) ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক প্রয়োজনে দলিল পত্র, প্রশ্নোত্তরময় কড়চা ও আইনের অনুবাদ
০২) জ্ঞান-বিজ্ঞান-সংস্কৃতি বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক, সাহিত্যানুবাদ ও ধর্মপ্রচার পুস্তিকা
০৩) কাহিনী আখ্যান বা আখ্যায়িকা ও নিবন্ধ
০৪) উপন্যাস ও গল্প
বাঙলা গদ্যের বিকাশের ধারায় লক্ষণের দিক থেকেও এর ৩টি পর্যায় রয়েছে। পর্যায়গুলো হচ্ছে-
০১) গদ্য
০২) গদ্য সাহিত্য
০৩) সাহিত্যিক গদ্য

মোটামুটিভাবে এ কথা বলা চলে যে, বাঙলা গদ্যের একটা রীতিগত খসড়া, শব্দ ব্যবহারে বৈচিত্র্য, ক্রিয়াপদের পূর্ণাঙ্গতা, বিরাম চিহ্নের ব্যবহার অর্থাৎ গদ্য সাহিত্য গড়ে উঠার অধিকাংশ মাল-মসলা আমরা ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বেই পেয়েছি। পূর্ব-পুরুষের ঐতিহ্য-ঐশ্বর্য ও তাদের সমস্যাকে গ্রহণ করেই ঊনবিংশ শতকে শুরু হয় আরো উন্নত গদ্য সাহিত্য রচনা। ১৮০১ সালে ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’র মধ্য দিয়েই মূলতঃ সূচনা ঘটে ঊনবিংশ শতকীয় গদ্যের।

এ কথা সত্য যে বিশেষ সমাজতাত্বিক কারণেই ঊনিশ শতকে এসে বাঙলা গদ্যের বিকাশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এ কাজটা করেছে ইংরেজ। ইংরেজরা যখন আমাদের দেশে আসে, তখন ভারতবর্ষে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিকতার যুগ। সমগ্র সমাজ জুড়ে তখন অবক্ষয় ও গতিহীনতা। ধনতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি শিল্প বিপ্লবের প্রতিভূ ইংরেজদের উন্নত শিক্ষা-সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক সমাজ আরো নড়বড়ে আরো ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। ফলে, তৎকালীন ক্রমশঃ ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ব্যবস্থায় নতুন শিক্ষা-সংস্কৃতির সংঘর্ষে আমাদের বাঙালি সমাজ জীবনেও সুচনা হয় নতুন চিন্তা, নতুন জীবনবোধ ও নব-জাগরণের। জন্ম নেয় এক নতুন শ্রেণী, যার নাম বাবু শ্রেণী। প্রসঙ্গক্রমে মনে রাখা দরকার যে, এই বাবু শ্রেণী ও বাবু-কালচার কিন্তু ইংরেজ আগমনের সাথে সাথেই গড়ে উঠেনি। একটা দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে গড়ে উঠেছে। এই দীর্ঘ সময়টা লেগেছে ইংরেজদের শাসন ও শোষণের একটা পাকা ভিত্তি তৈরী করার কাজে।

এই পাকা ভিতটি তৈরী হবার পরই অর্থাৎ শাসন ও শোষণ সম্পর্কে ইংরেজরা যখন আশ্বস্ত ও বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে তখনি তারা অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে অনেকটা নিজেদের উদ্যোগেই এই বাবু শ্রেণীর পত্তন করেছে। বাবু শ্রেণীর পত্তনের ঋণাত্মক দিকটির সাথে সাথে এর ধনাত্বক দিকটি শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ভাব জাগরণের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে প্রধান হয়ে উঠে। ফলে, ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এসে দেখি, বাংলাদেশে বাঙালির চিন্তা ও প্রাণশক্তির স্ফুরণ ঘটেছে বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলনে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে, আচার-আচরণে। এর ফলে, ভাবজগতের আন্দোলনের সাথে সাথে ভাব প্রকাশের বাহনের ও প্রয়োজনীয় মুক্তির তাগিদ এলো, অনিবার্য হয়ে উঠলো চিন্তা ও মনন প্রকাশের মাধ্যম গদ্যের বিকাশ। আর, এই যুগের বিদ্বৎ সমাজের ঋত্বিক পুরুষ সমাজ চিন্তানায়ক বিদ্যাসাগর হয়ে উঠলেন বাঙলা গদ্যের প্রধান কারিগর, কর্ণধার।

বাঙলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশে বিদ্যাসাগরের স্মরণীয় কীর্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করতে হলে প্রয়োজন সে কালের বিভিন্নমুখীন গদ্য রচনা প্রচেষ্টার স্বরূপ ও প্রকৃতি নির্ধারণ। তাই বিদ্যাসাগরের প্রতিভা বিচার, ভাষারীতি ও শিল্পী সত্বার বিশ্লেষণে ৩টি পর্যায়কে অবশ্যই অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। পর্যায়গুলো হচ্ছে-
০১) বিদ্যাসাগর-পূর্ব বাঙলা গদ্যের রীতি প্রকৃতি।
০২) বিদ্যাসাগরের সমকালীন বাঙলা গদ্য ও রীতি প্রকৃতি।
০৩) বিদ্যাসাগরীয় গদ্যের বৈশিষ্ট্য ও বিশিষ্টতা এবং পরবর্তী গদ্য প্রবাহে তাঁর অবদান।

ঊনিশ শতকের পূর্বের গদ্যকে পরবর্তীকালের গদ্য সাহিত্যের ভিত্তি ধরে নিয়েও গুণগত বিচারে এ কথা বলতে হয় যে, সে গদ্য ভাষা গদ্য-সাহিত্যের চারিত্র অর্জন করেনি। চারিত্র বিচারে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ পর্ব থেকেই বাঙলা গদ্য-সাহিত্যের সূচনা বলে ধরে নেয়া যায়।
বাঙলা গদ্য-সাহিত্যের বিকাশের ক্ষেত্রে একজন ইংরেজের ভূমিকা অনস্বীকার্য, তিনি হচ্ছেন কেরী সাহেব। বাঙলা গদ্য-সাহিত্যের বিকাশে যাঁর অসীম অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য। কেরী সাহেব ছিলেন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের বাঙলা বিভাগের অধ্যক্ষ। ইংরেজ সিভিলিয়ানদের বাঙলা শেখাতে গিয়ে বাঙলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তকের অভাব দেখে তিনি তাঁর সহকর্মী মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু, রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় প্রমূখ পণ্ডিতদেরকে গদ্য রচনায় উৎসাহিত করে তোলেন। নিজেও গদ্য রচনায় হাত দেন। তবে, তাঁর রচনার চেয়ে তাঁর উৎসাহ উদ্যোগই ছিলো মহত্তর কর্ম। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পণ্ডিতদের সংস্কৃত শব্দ ও অলংকার-বহুল পণ্ডিতি গদ্য ভাষা পরবর্তীকালে রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিম চন্দ্র হয়ে বিকাশের পথে প্রাঞ্জল সাধুভাষা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রাঞ্জল সাধুভাষা আরো সহজ-সরল নিরালংকার হয়ে কথ্যভাষার আশ্রয়ে আলালী-হুতোমী এবং পরবর্তীকালে প্রমথীয় সবুজপত্রের যুগে একটি সর্বজনগ্রাহ্য, সাহিত্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সামগ্রিক বিচারে ফোর্ট উইলিয়মের পণ্ডিতরা আকস্মিকভাবে বাঙলা গদ্যের চর্চা শুরু করেছিলেন। এসব পণ্ডিতদের প্রতিভা থাকা সত্বেও তাদের রচনারীতির প্রধান ত্রুটি হচ্ছে দূরান্বয়, প্যারেনথিসিসের অতিমাত্রায় ব্যবহার, ছেদ বা বিরতি চিহ্নের অল্প প্রয়োগ।

ফোর্ট উইলিয়ম পণ্ডিতদের মধ্যে রামরাম বসু বাঙলায় প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থের লেখক হলেও গদ্য সৃষ্টির যোগ্যতায় মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারই সে যুগের শ্রেষ্ঠ লেখক, একথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। তিনি সংস্কৃত-প্রেমি মানুষ ছিলেন। ‘বাঙলা, সংস্কৃতের দুহিতা’ এ মতবাদ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছিলেন। মৃত্যুঞ্জয় ছিলেন প্রতিভাবান লেখক। বাঙলা গদ্য তার হাতেই গদ্য-সাহিত্য হয়ে উঠেছে। তাঁর রচনায় বাঙলা গদ্যের বিভিন্ন রীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষার নিদর্শন আছে। সংস্কৃত, সাধু ও কথ্য এই ৩টি রীতির চর্চাই তিনি করেছেন। তা সত্বেও বাঙলা গদ্যের প্রাথমিক পর্বের দ্বিধা সংশয় দুর্বলতা তার রচনায় বিদ্যমান। ফলে, মৃত্যুঞ্জয়ের অনুসৃত সাধুরীতির সঙ্গে বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমীয় সাধুরীতির সুস্পষ্ট ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়।

বাঙলা গদ্যের প্রাণ শক্তি তখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। স্বচ্ছন্দ স্বাভাবিক গদ্যের যা গুণ সুষম বাক্যবিন্যাস, যথাযথ ও সুসংগত শব্দাবলির ব্যবহার তা মৃত্যুঞ্জয়ের কলম ধরতে পারেনি। সত্যিকার অর্থে বিচার করলে এ কাজ তার পক্ষে সম্ভবও ছিলোনা। মৃত্যুঞ্জয় প্রতিভাবান ছিলেন সত্য কিন্তু যে যুগধর্ম ও ভাবধর্মে গদ্যের বিকাশ সেই প্রাণরসে তিনি উদ্দীপিত ছিলেন না। (২য় পর্বে সমাপ্য)

লায়লা আফরোজঃ লেখক, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষক এবং আবৃত্তিকার।