মাহমুদুর রহমান, সাংবাদিকতা ও অশুভ সংঘবদ্ধতা
শেখ বাতেন , সোমবার, মে ২৭, ২০১৩


ঢাকায় ছিলাম না বেশ কিছুদিন । সপ্তাহ খানেক হবে। ঢাকায় লাগাতার থাকা যায় না। ঢাকায় এক ধরনের যুদ্ধ চলছে, বলা উচিৎ যুদ্ধপুর্ব বিশৃঙ্খলা। দুর্নীতিও দৃর্বৃত্তায়নের ঐহিত্যবাহী ধারার সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক উত্থান। লূট- সস্ত্রাস-বেইনসাফীর সঙ্গে বসবাসের অযোগ্য ঢাকা শহরের কিছু ঐতিহ্যবাহী মুছিবততো আছেই। যেমন আর্ন্তজাতিক মানের মেয়র আছে,কিন্তু শহরে মুত্র ত্যাগের ব্যবস্থা নেই। চলতে চলতে কষ্টে পরে গেলে মানুষ যেখানে সেখানে প্রস্রাব করে দেয়, বাধ্য হয়ে। গণপরিবহন নেই।পাশে কলকাতায় তো মাটির নিচে, মাথার উপরে রাস্তায় মানুষ চলছে। অন্তত আটকে থাকছেনা। এখানে ৪০ বছরের একই চিত্র- জনপরিবহনে চাপলে শরীরের সবকটি অংগ-প্রত্যঙ্গ কয়েকবার করে ঘষা খায়। আমার এক প্রবাসী বন্ধু দেশপ্রেম জাতীয় একটাকিছুর টানে ঢাকায় আসে। বলে প্রথম ছয় মাস তার ভালই লাগে। তারপর না কি অকারনে মন ক্রদ্ধ হয়ে থাকে। তার ফেরার পথ আছে। অনেকে যাবার পথ করে নিয়েছেন। আমি ওয়াদাকরে বিদেশ ছেড়ে এসেছি। এখানে জীবন বদলানোর সংগ্রামে মানুষের সঙ্গে শরিক হবো সার্বক্ষণিক, এই প্রত্যাশায়। কিন্তু সংগ্রাম এতো নিচু স্তরের,মানব চরিত্র নিয়া এতো বাজে কথা বলতে হয়, যা দ্রত ক্লান্ত করে ফেলে মন। ফলে ঢাকা থেকে পালাই। কোথায় যাবো? মোল্লার দৌড় এখন মতিঝিল পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। আমার দৌড় আগের মত। যাই কক্সবাজার।কানে এয়ার প্লাগ লাগিয়ে সারাদিন নিজেকে চুবাই সাগরের পানিতে। এবার বেজুত আবহাওয়ার কারনে সেটা হয়নি, উল্টো দিকে পাহাড়ে ঢুকি। লামা-আলীকদম-থানচির গভীর অরণ্য পথে। কোথায়ও জনমানবনেই, মন্ই হয় না বাংলাদেশ। পাহাড়গুলির দলীয় বক্তব্য না থাকার কারনে তা স্বস্তিকর। তবে সম্প্রতি সেখানে বহুজাতিক কোম্পানির কু-প্ররোচনায় মাইলের পর মাইলের পরিবেশ নাশক তামাকের চাষ ঢুকছে। আর অনগ্রসর হেতু পাহাড়ের ভাজে ভাজে অনাধুনিক ধমীয় শিক্ষা প্রতিষ্টানে, যুক্তিবুদ্ধির চর্চা না থাকায়, অনেক রকম প্রপাগান্ডার চাষ হচ্ছে। জনমত শুনলে তাইমনে হয়।



ফিরে এসে দম পাওয়া যাবে ভাবছিলাম। ভাবনা ঠিক হল না। কয়েকমাস ধরে যে প্রচন্ড একটা পোলারাইজেশন শুরু হয়েছিল এখন তার নানান ডাল পালা গজাচেছ। বিশেষভাবে কথা হচ্ছে- ‘সাংস্কৃতিক বিল্পবের’ প্রবক্তা মাহমুদুর রহমানের মুক্তির জন্য কিছু সাংবাদিক সাম্পতিক বিবৃতি নিয়ে। যাদের প্রগতিশীল ভাবতাম, মতামত মনযোগ দিয়ে শুনতাম, তাদের কেউ কেউ সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের মুক্তির পক্ষে বিবৃতি দিচ্ছেন। এটা নাকি পেশাদারিত্বের দায়, কেউ এমন সাফাই ব্যাখ্যা দিচেছন। সেই ব্যাখ্যায় সন্তোষ্ট নন ফরহাদ মজহার। তিনি আজকের (২৭-০৫-২০১৩) নয়া দিগন্তের সম্পাদকীয়তে তার বয়ান দিয়েছেন। তাতে ব্যক্ত করেছেন, আরো উন্নত স্তরের সমর্থন আসা করেছিলেন । তিনি স্বভাব সুলভ উন্নত বুদ্ধিবৃত্তির ঢঙ্গে বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধও এর আদর্শকে প্রশ্ন করেছেন, একটি নতুন সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা দাড় করিয়েছেন। আমি, আমরা মুক্তিযুদ্ধের এক ধরনের সমালোচনা করি। মানুষের শোষণ ব্ঞ্চনার অবসান হয়নি বলে একটা দ্বিতীয় পর্যায়ের সংগ্রামের কথা বলি। ফরহাদ মুক্তিসংগ্রামের পুর্ণতা দেবার জন্য ইসলামি শক্তির আবির্ভাবেব কথা বলেছেন। অনেক কিছু বলেছেন, সমীকরন করেছেন, আপত্তিকর ভাষায়। তিনি শাহবাগের আন্দোলনকারিদের শাস্তির দাবিও উত্থাপন করেছেন। ইতিপূর্বে মাহমুদ এটাকে ফ্যাসীবাদের উত্থান হিসাবে চিত্রিত করেছেন তার পত্রিকায়।আমি জানি না, শাহবাগে আন্দোলন এবং এখানে আগত জমায়েতের মানুষে কয়টা জনপরিবহনে আগুন দিয়েছে, পূলিশকে হত্যা করেছে, রেলালইন থেকে ট্রেন ফেলে নিরীহ যাত্রীকে হত্যা করেছে? সবোপরি রাষ্ট্রকে সরাসরি আঘাত করেছে? অথচ এইসব তান্ডবের সঙ্গে আমার দেশ- এ প্রকাশিত হেডলাইন সাবহেডলাইল গুলিতে প্রকাশিত বিষয়বস্তুর উস্কানিমুলক সস্মর্ক আছে কি নেই, যে কেউ মিলিয়ে দেখুক। পুনর্বার এখানে তার উল্লেখ করতে চাই না। আমি ভাবছি, মাহমুদ এবং আমার দেশ নামক পত্রিকা যে প্রচার- প্রপাগান্ডা করেছে বিল্পবেব নামে । এটা যদি সাংবাদিকের সঙ্গত কাজ বলে ধরা হয়, এমন সুযোগ যদি সবাই পায় তাহলে এমন চার-পাঁচটা পত্রিকার তান্ডবে এই রাষ্ট্র তো বট্ইে এই শহরের অবকাঠামো, দালান-কোঠাও কি আস্ত থাকবার কথা? ফরহাদ নিপুণভাবে সাম্প্রদায়িক তান্ডবকে- ভাঙ্গচুর, অন্যের ধর্মালয়ে অগ্নিসংযোগ, আক্রমন, নারী ও সাংবাদিক পেটানো, মতিঝিলে হকারদের দোকানপাটে অংগ্নিসংযোগ- শোষনমুক্তি ও সামাজ্যবাদী বিরোধী লড়াইয়ের সঙ্গেযুক্ত করে তত্ত্বায়ন (থিওরাইজ) করেছেন। বেশ-ভুষায় চিন্তা-ভাবনায় হঠাৎ ইমানদার হয়ে-ওঠা ফরহাদ বেআইনী কাজকেও এতো শক্তিশালী ভঙ্গিতে উপস্তাপন করেছেন যে, গড়পরতা মানুষ তাতে বিভ্রমে পড়ে। এমনকি আমারও মনে হচিছলো, তাহলে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তাদের পিতা- পিতামহের সঙ্গে যুদ্ধটা করে কি অন্যায় করেছিলাম? সেদিন অনেক আলেম যুদ্ধ করেছেন, আবার এটাও ঠিক শর্ষীনার পীর সহ অনেকে আমাদের বাড়তি রক্ত ঝরিয়েছেন-যুদ্ধক্ষেত্রে ও জনপদে। আজ ফরহাদ মজহার তার পুর্ণজাগরনের পীরালি করছেন। আফগাইন ল্টাইলেবিল্পবেব কথা বলায় একসময় কমরেড ফরহাদের কোমড়ে দড়ি বেঁধেছিল এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র , প্রকাশ্যে।আজ আফগানী বিল্পবেব তত্ত্ প্রচার করছেন আর এক ফরহাদ, এখন পযন্ত তা নিরাপদেই করছেন।


আসলে, হাতে একখান মিডিয়ার মালিকানা থাকলে অনেক কিছুই বলা যায়। ফরহাদ ‘চুরি-ডাকাতি-লুটপাটের মধ্যে’ দিয়া গড়ে ওঠা সংবাদপত্রের মালিকদের শ্রেণি চরিত্র উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মাহমুদুর রহমান কোন পক্রিয়ার মধ্যে দিয়া ওঠে এসেছেন সেই গল্পটা আমাদের বললেন না। নিজের পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় নিজের ছবিসহ বক্তব্য প্রচার করার এই ইমানি দায়িত্ব পেশার বরখেলাপ কি না- এটা তার কাছে অপ্রয়োজনীয় পুরানো তর্ক মনে হয়েছে। আমি জানতে পেরেছি,এদেশে অধিকাংশ গণমাধ্যম/পত্রিকার মালিক নাকি জামাত বিএনপি ঘরানার।অল্প কিছু আওয়ামী লীগের। আর প্রেসক্লাবে আধিপত্য নাকি ভোটদাতা সদস্যদের মেজরিটির কারনে জামাত-বিএনপির। প্রেসক্লাবের এক সাংবাদিক নেতা এলাকায় গেলে মানুষ তাকে ভবিষ্যতের এমপি বলেন। তিনিও শুভেচ্ছা জানিয়ে এলাকায় পোষ্টার ছাপিয়ে দিয়েছেন- একপাশে তারেক অন্য পাশে খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে তিনি পেশাদার সাংবাদিকের সুযোগ নিচ্ছেন ঢাকায় এসে। বক্তব্য রাখছেন সাংবাদিক সমাজদের নেতা হিসাবে। তাদের মত প্রকাশের জোয়ারে প্রতিদিন ভেসে যাচ্ছেআামি, আমরা- বাংলাদেশ। কারন আমার হাতে কোনো পত্রিকার মালিকানা নাই। লেখা পাঠালে লেখকের ঘরানা জানতে চান। একটা সিন্ডিকেট দেশের ভালমন্দের মতামত যোগান দিচ্ছে মনমত। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের উচ্চতা যদি ৪ হাত হয়ে থাকে তার সাড়ে ৩ হাত দলবাজের দখলে। ফলে পেশাদারি সংঘবদ্ধতা কার্যত দলীয় সংঘবদ্ধতায় পর্যবসিত হয়েছে। এটা অবশ্য দেশের সার্বিক দুর্গতির স্থানীয় লক্ষণ। অভিজ্ঞতা থেকে একটা দৃষ্টান্ত দিই। ঢাকা-আরিচা রোডে যদি ট্রাকের বা যানবাহনের নিচে কেউ চাপা পড়ে পরিবহন সমিতি বিশেষ করে মালিক সমিতির কাজ হলো, ক্যাশটাকা নিয়া বা যে কোনো ভাবে নিহতের পরিবারকে ম্যানেজ করা, তাদের বাড়িতে চলে যাওয়া। এমনভাবে লেগে থাকে শেষ পযন্ত আইনী পদক্ষেপ আর চলে না। এক সময় নিহতের লোক এসেই আদালতে বলে- অভিযোগ নাই, মামলা চালাবো না। এই রকম কারনে বার কাউন্সিল কোনো টাউট আইনজীবির বিরদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারে না। প্রেস কাউন্সিল বাড়াবাড়ি আচরনের সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রন করে না, করতে পারে না। পেশার মর্যাদা রক্ষার তদারকী কোনো সংস্থা কর্তৃক এর অভ্যন্তরে দুষ্টব্যক্তির শায়েস্থা করার কোনো পদক্ষেপের খরব পাওয়া যায় না- আচরণের নীতিমালায় স্পষ্ট উল্লেখথাকা সত্তে¡ও। কিন্তু রাষ্ট্র যখনএক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করে তখন ভালমন্দ সর্বক্ষেত্রেই শুরু হয় বিরুদ্ধতা, অশুভ সংঘবদ্ধতা।যা এখন মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রে হচ্ছে।


শেখ বাতেন, লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা