ধান নিয়ে ধান্দাবাজিতে কৃষক সাবাড়
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম , রবিবার, মে ২৬, ২০১৩


এক মণ বোরো ধান আবাদ করতে খরচ পড়ে সরকারি হিসেবে ৬৭২/- টাকা, আর আমার নিজস্ব হিসেবে ৭১০/- থেকে ৭২০/- টাকা (পারিবারিক শ্রমের মূল্য যোগ করলে)। সেই ধান এখন কৃষককে বিক্রি করতে হবে ৫০০/- টাকায়। অর্থাত্ কৃষকের সরাসরি মণপ্রতি লোকসান হচ্ছে ১৭২/- টাকা (আমার হিসেবে ২১০/- থেকে ২২০/- টাকা)। দেশে এবার প্রায় ২ কোটি টন (অর্থাত্ ৫ কোটি মণ) ধান উত্পাদিত হবে। এ থেকে পরিষ্কার যে, এবার এক বোরো মৌসুমেই দেশের মেহনতি কৃষককে 'বাজারের' দ্বারা সরাসরি ৮৬০ থেকে ১,১০০ কোটি টাকা লোকসান গুণতে হবে। এই সরাসরি লোকসান ছাড়াও কৃষক সমাজকে নানাভাবে বিপুল পরিমাণের বঞ্চনার শিকার হতে হবে।

রোরো ধানই এখন বাংলাদেশে উত্পাদিত প্রধান খাদ্যশস্য। কৃষকের ঘরে ঘরে সেই বোরো ধান উঠতে শুরু করেছে। অবশ্য সবার ঘরে যে ফসল উঠবে, সেটা ঠিক নয়। যারা বড় জোতের মালিক, তাদের গোলায় ধান জমে উপচে পড়বে। মাঝারি ও গরিব কৃষকের ঘরেও ধান উঠবে, তবে তার পরিমাণ কম। বর্গাচাষিরাও ধান পাবে 'আধি' অথবা কার্যত 'উল্টো তেভাগা'-র হিসেবে। ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের মাঝেও অনেকেই টাকার বদলে ধানে মজুরি পাবে।

সকলেই অবশ্য তাদের শ্রমলব্ধ ধান ঘরে উঠাতে পারবে না। ধারদেনা, মহাজনের ঋণ, দাদনের টাকা ইত্যাদি পরিশোধ করার জন্য অনেককেই জমির ধান জমিতেই বেচে দিতে হবে। আবার, যারা ঘরে ধান তুলেছে তাদের মধ্যে অনেকেই সারা বছরের খোরাকি ঘরে রাখতে পারবে না। এসব কৃষককে তাদের বিভিন্ন অভাব মেটানোর জন্য মৌসুম-শুরুর হঠাত্ কমে যাওয়া দামেই সেই ধান বা তার অংশবিশেষ অনেককেই বিক্রি করে দিতে হবে। ধনী কৃষক ও বড় জোতদারদের সংসারে সে ধরনের অভাব না থাকায় তারা তাদের বিপুল উদ্বৃত্ত ধান বাজারের কমতি দামে বিক্রি না করে তা ধরে রাখতে পারবে বাজারে দাম চড়া হয়ে ওঠার সময়ের জন্যে।

দেশে যত ধান উত্পন্ন হয় তার সবটাই বাজারে আসে না। পুঁজিবাদী উত্পাদন-বণ্টন-বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার ক্রমাগত প্রসার সত্ত্বেও এখনো বেশিরভাগ কৃষক ধান ফলায় নিজের পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য। এর অতিরিক্ত ফসল বিক্রি করে সে তেল, লবণ, জামা-কাপড়, চিকিত্সা, ঘরবাড়ি মেরামতসহ তার যাবতীয় সাংসারিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করে। উত্পন্ন ফসলের একটি অংশ রেখে দেয়া হয় সরাসরি ভোগের জন্য এবং অপর একটি অংশ নিয়ে আসা হয় ধান-চালের বাজারে। যারা নিতান্তই গরিব, নানাভাবে দায়গ্রস্ত অথবা জমে থাকা জরুরি কোনো ব্যয় নির্বাহের জন্য ক্যাশ টাকার প্রয়োজনে কাতর—তারা খাদ্যশস্য চাহিদা মেটানোর মতো ধান-চাল ঘরে তুলে রাখতে পারার বদলে তা থেকেই একটি কম-বেশি অংশ দ্রুত বাজারজাত করতে বাধ্য হয়। ফসল ওঠার পরপরই যে ধান প্রথম বাজারে আসে সেটা প্রধানত তাদেরই ধান। গরিবের এই ধানে বাজার ভরে ওঠার সাথে সাথে ধানের দাম পড়ে যায়। সে দামেই গরিবকে তার 'রক্তে বোনা ধান-মোদের প্রাণ' বেচে দিতে হয়।

এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধারণা করা যায় যে, এবার বোরো ধানের চাষ হয়েছে ৪৮ লক্ষ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে। হাওর এলাকা ব্যতীত কোথাও বড় কোনো মড়ক, খরা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ফসল সেভাবে নষ্ট হয়নি। তাছাড়া আশা করা যায় যে, সারা দেশে হেক্টরপ্রতি উত্পাদন হবে ৪ টনের কাছাকাছি। অনুমান করা হয়েছে যে, সারা দেশে এবার প্রায় ২ কোটি টন বোরো ধান উত্পন্ন হবে।

মোট উত্পন্ন ধান (বা চাল)-এর একটি অংশই কেবল বাজারে পণ্য হিসাবে হাজির হয়। এই অংশটিই কৃষকের 'বাজারমুখী-উদ্বৃত্ত' (marketable-surplus)। বাজারে যে ধান-চাল আসে তার প্রায় সবটাই ব্যক্তি মালিকানাধীন বাজার ব্যবস্থার অন্তর্গত বিনিময় প্রক্রিয়ায় অন্তর্গত হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতির এটাই আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য ও উপাদান। আমাদের দেশের অর্থনীতি বর্তমানে সেই ধারাতেই পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের নিজস্ব পরিচালনায় কোনো বণ্টন ব্যবস্থা নেই। সরকার কেবল 'ব্যক্তিগত মালিকানাধীন অবাধ বাজারব্যবস্থার সহায়ক' হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। দেশরক্ষা ও আইনরক্ষা বাহিনীর কয়েক লক্ষ সদস্যসহ স্বল্পসংখ্যক মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেও ধান-চাল কিনে খাওয়া মানুষদের মধ্যে বস্তুত সবাইকে 'প্রাইভেট মার্কেটের' ওপর নির্ভর করতে হয়। সাধারণ মানুষের জন্য রেশনিংসহ কোনো গণবণ্টন ব্যবস্থা চালু নেই। সরকার অবশ্য ধান-চাল কিনে গুদামজাত করে থাকে। কখনো বেশি পরিমাণে, কখনো কম। প্রধানত তা করা হয়ে থাকে সঙ্কটের রাজনৈতিক অভিঘাতকে সামাল দেয়ার জন্য। সরকারের ধান-চাল জনগণের কাছে সরাসরি সরবরাহের বদলে প্রাইভেট মার্কেটের মাধ্যমে তার সরবরাহ বাড়ানোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে।

বাজার অর্থনীতির একটি প্রধান শর্ত হলো 'অবাধ প্রতিযোগিতা'। পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির ধ্রুপদী তত্ত্ব রচিত হয়েছে 'বিশুদ্ধ প্রতিযোগিতাকে' (perfect competition) অবলম্বন করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী চাহিদা ও সরবরাহ দ্বারা বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়। কিন্তু পুঁজিবাদী বাজারের সেই তত্ত্বের ক্ষেত্রে অসীম সংখ্যক ক্রেতা, অসীম সংখ্যক বিক্রেতা, পণ্যের অবারিত চলাচলের সুযোগ প্রভৃতিকে প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে সে শর্ত কোথাও পূরণ হচ্ছে বলে দেখতে পাওয়া যায় না। খাদ্যশস্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা বাস্তবে যা দেখতে পাই তা হলো 'অ-বিশুদ্ধ প্রতিযোগিতা' (imperfect competition)।

ক্ষুদে উত্পাদকরাই দেশের সিংহভাগ ধান উত্পাদন করে থাকে। কিন্তু চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে তারা তাদের বাজারমুখী উদ্বৃত্ত সরাসরি বিক্রি করার সুযোগ পায় না। প্রথমেই তাদের ফসলকে ধান থেকে চালে প্রক্রিয়াকরণের পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকরণ কাজটি বড় আকারে সম্পন্ন করার তুলনায় বিচ্ছিন্নভাবে ক্ষুদে আকারে করাটা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। কৃষকের ঘরে ঢেঁকির ব্যবহার এখন প্রায় উঠেই গেছে। ক্ষুদে উত্পাদকরা অনেকজন মিলে যদি সমবায়ের ভিত্তিতে আধা-যান্ত্রিক রাইস মিল স্থাপন করার ব্যবস্থাগত কাঠামো ও সুযোগ পেত, তাহলে তারা ধানকে চালে পরিণত করার প্রক্রিয়ার মূল্য সংযোজনের আর্থিক প্রক্রিয়ায় অংশীদার হতে সক্ষম হতো।

সরকারি মালিকানায় আধুনিক রাইস মিল থাকলে তাতেও ক্ষুদে উত্পাদকরা তার ওপর তাদের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে কিছু সুবিধা পেতে পারত। কিন্তু সে ধরনের অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা না থাকায় বিশাল এই ক্ষুদে উত্পাদক শ্রেণিকে গ্রামাঞ্চলে স্থাপিত রাইস মিলের মালিকদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। এভাবে দেশের বাজারজাতকৃত চালের সরবরাহকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা খোদ কৃষকের হাত থেকে স্থানান্তরিত হয়ে তুলনামূলকভাবে মুষ্টিমেয় সংখ্যক রাইস মিল মালিকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। এই কেন্দ্রীভবন আরেক দফা ঘটে বিপণন ব্যবস্থাপনার স্তরে। এই পর্যায়ে বেপারি, আড়তদার, মোকাম মালিকরা চালের বাজারের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। তারা সকলে মিলে গড়ে তোলে সিন্ডিকেট। 'বিশুদ্ধ প্রতিযোগিতাকে' বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গড়ে ওঠে চালের বাজারের একচেটিয়া-কারবারি গোষ্ঠী। দেশের কোটি-কোটি ক্রেতা তাদের 'নিয়ন্ত্রিত বাজার' ও সিন্ডিকেট ব্যবসার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।

এবার বোরো ধান উত্পন্ন হবে প্রায় ২ কোটি টন। ধারণা করা যায় যে, এর মধ্যে ৪০-৪৫%, অর্থাত্ ৮০/৯০ লক্ষ টন ধান কেনাবেচার পণ্য হিসেবে বাজারে আসবে। এর মধ্যে আনুমানিক ১৫% অর্থাত্ মোট ১২ লক্ষ টন হয়তো সরকার নিজে কিনে নেবে। অবশিষ্ট ৮৫% অর্থাত্ ৭০/৮০ লক্ষ টন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত একচেটিয়া প্রাইভেট মার্কেটের হাতেই থেকে যাবে।

সরকার আবার ১২ লক্ষ টনের মধ্যে প্রায় সবটাই কিনবে চাল হিসাবে। মেহনতি ক্ষুদে-মাঝারি কৃষকরা সাধারণত চাল বিক্রি করে না, জমি থেকে ফসল তোলার সাথে সাথে তা ধান হিসেবেই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। তাই সরকারের এরূপ সিদ্ধান্ত একমাত্র চাতাল ও রাইস মিল মালিকদেরকেই সরকারের কাছে চাল-এর বিক্রেতা হিসেবে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

খোলা বাজারে ক্ষুদে-মাঝারি কৃষকরা দ্রুত ধান বেচে দেয়ার বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ায় দাম পায় কেজিপ্রতি ১৩/১৪ টাকার মতো। একাধিক পত্র-পত্রিকায় এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, বাজারে এখন ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা মণ দরে। আমার নিজের সরেজমিন পর্যবেক্ষণও অনুরূপ। চাতাল মালিকরা এখনই এই কম দামে দেদারসে ধান কিনে স্টক করে রাখবে। মুনাফালোলুপ মিল মালিকরা তাদের ধানের স্টক মজুদ রেখে, চালের বাজার-সিন্ডিকেটের সাথে যোগসাজশে খোলা বাজারে কৃত্রিম সরবরাহ ঘাটতি তৈরি করে কিছুদিন পর চালের বাজার দর বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে। এই মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে তারা ধান-চালের সরকারি ক্রয়মূল্য বাড়ানোর জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। তারা তখন ৫০০ টাকা মণদরে কৃষকের কাছ থেকে এখন কিনে রাখা ধান কমছে-কম মণপ্রতি ১০০ টাকা বেশি দরে সরকারের কাছেই বিক্রি করার সুযোগ নিবে।

গত ২০১০ সালের একটি হিসাবের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক। সে বছর মে মাসে দেশের প্রায় সর্বত্র ১৩/১৪ টাকা দরে ধান বিক্রি হয়েছে। চালকলের মালিকরা সেই দামে ধান কিনে (চালের হিসাবে যা কেজিপ্রতি ২০.৫৮ টাকা) তা সরকারের কাছে বিক্রি করে কেজিপ্রতি ২৫ টাকা পেয়েছে। অর্থাত্, তাদের লাভ হয়েছে কেজিপ্রতি ৪.৪২ টাকা। না -হয় ধরলাম যে, লাভ হয়েছে কেজিপ্রতি ৪ টাকা। তিন মাসে তারা সরকারি গুদামে ২ লক্ষ ৬০ হাজার টন চাল সরবরাহ করেছে। এতে এমনিতেই তাদের মোট লাভ হয়েছে ১১৪ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা। জুলাই মাসে বাজারে যখন ধান-চালের দাম বেড়ে গেল, তখন তারা ৩ টাকা হারে প্রণোদনা মূল্য দাবি করলো। অন্যথায় তারা সরকারকে প্রতিশ্রুত চাল সরবরাহ করবে না বলে জানিয়ে দেয়।

এই অবস্থায় কেজিপ্রতি ৩ টাকা প্রণোদনা মূল্য দিয়ে সরকারকে রাইস মিল মালিকদের নিকট থেকে এই চাল কিনতে হয়েছিল। যে ক্ষুদে ও মাঝারি মেহনতি কৃষক মাত্র ২০.৫৮ টাকা কেজি দরে তার চাল আগেই বিক্রি করে দিয়েছিল, সরকার তাকে প্রণোদনা মূল্য না দিয়ে সেটি দিল রাইস মিল মালিকদের। প্রণোদনা মূল্য যোগ করে যে দাম হয় তাতে সরকারকে অতিরিক্ত ২২২ কোটি টাকা রাইস মিল মালিক এবং আড়তদার-বেপারিদের পকেটে তুলে দিতে হয়েছিল। যদি এমনটা হয়ে থেকে থাকে যে, তারা মৌসুমের শুরুতেই মোট বাজারজাত ধান-চালের ১৫%, তথা মোট বোরো উত্পাদনের ৬%, ২০.৫৮ টাকা কেজি দরে কিনে নিতে সক্ষম হয়েছিল, তা হলে সরকারের প্রণোদনা মূল্য পেয়ে সে বছর তাদের কেজিপ্রতি লাভ হয়েছিল ৭.৪২ টাকা করে। এভাবে সবগুলো হিসাব একত্র করলে দেখা যায় যে, ২০১০ সালের বোরো মওশুমে সরকারের ১২ লক্ষ টন ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম বাবদই রাইস মিল মালিক ও বেপারি-আড়তদার সিন্ডিকেট সোজাসাপ্টাভাবেই ৬৬৩ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা উঠিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এই গোটা টাকাটার আসল পাওনাদার ছিল কৃষক। কিন্তু সরকারের ভুল ও অন্যায় সিদ্ধান্তের কারণে শুধু এক মওশুমের একটি মাত্র ক্ষেত্রে সেই প্রাপ্য থেকে সে পরিপূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়েছিল। কৃষক সমাজকে বঞ্চিত করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করে নিয়েছিল মুষ্টিমেয় লুটেরার দল। কৃষককে বঞ্চিত করে তাকে সর্বস্বান্ত করার এমন আরো শত-সহস্র ঘটনা ঘটে চলেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

এই বঞ্চনা থেকে কি রেহাই পাওয়ার উপায় নেই? অবশ্যই আছে! কৃষকের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে হলে প্রয়োজন কৃষিব্যবস্থা ও গ্রাম-জীবনে আমূল বিপ্লবী পুনর্গঠন। একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজবিপ্লব ব্যতীত কৃষকের মুক্তি আসবে না। সেরূপ সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। কিন্তু সেজন্য কাজ করার পাশাপাশি, তার আগেও কৃষকের কল্যাণে অনেক কিছু করা সম্ভব। একই সাথে সে জন্যও কাজ করতে হবে। কৃষক তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে সম্পদ সৃষ্টি করে তার ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে কৃষকের ওপর পরিচালিত বঞ্চনা লাঘবে কয়েকটি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

(১) খোদ মেহনতি কৃষকদেরকে নিয়ে বাজার-সমবায়, ক্রেতা-বিক্রেতা সমবায় ইত্যাদি গড়ে তোলা।

(২) রাষ্ট্রের উদ্যোগে রেশনিংসহ গণবণ্টন ব্যবস্থা চালু করা।

(৩) সরকারের উদ্যোগে সরাসরি কৃষকের নিকট থেকে কিংবা তাদের সমবায় থেকে শস্যসহ কৃষি সামগ্রী ক্রয় করা।

(৪) রাইস মিলগুলোতে মেহনতি কৃষকের মালিকানা অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং কৃষক সমবায়ের উদ্যোগে রাইস মিল প্রতিষ্ঠায় উত্সাহ ও সহায়তা প্রদান করা।

(৫) সরকারের উদ্যোগে পর্যাপ্ত সংখ্যক আধুনিক রাইস মিল স্থাপন করা।

নাকের কাছের এসব জরুরি 'মিশন'-এর দিকে দৃষ্টি না দিয়ে যতই শুধু দূরের 'ভিশন' নিয়ে হৈচৈ করা হোক না কেন, কৃষকের দুর্দশা তাতে মোটেও দূর হবে না।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

E-mail: selimcpb@yahoo.com