‘মার্ডারার ইন ল’
শাহদীন মালিক , রবিবার, মে ২৬, ২০১৩


এটা ছাপা বা বানানবিভ্রাট নয়। এ লেখার শিরোনাম আসলেই ‘মার্ডারার ইন ল’। পাঠক নিশ্চয় ফাদার-ইন-ল, ব্রাদার-ইন-ল বা সিস্টার-ইন-ল ইত্যাদি ইংরেজি শব্দগুচ্ছের সঙ্গে পরিচিত। সবাই জানেন, এসব শব্দগুচ্ছের অর্থ শ্বশুর, শ্যালক বা ভায়রা ভাই, শ্যালিকা ইত্যাদি। ননদ না ননাশ, অর্থাৎ একজন বিবাহিত মহিলার স্বামীর ছোট বোনকে ননদ এবং বড় বোনকে ননাশ বলার বাংলায় যে রীতি, ইংরেজি ভাষায় ছোট এবং বড় বোনের এই ফারাকটা বোঝানোর জন্য পৃথক শব্দ বা শব্দগুচ্ছ নেই। ননদ এবং ননাশ উভয়েই সিস্টার-ইন-ল। আত্মীয়তা-সম্পর্কিত এই শব্দগুচ্ছের মধ্যে ড্যাশ বা হাইফেন (-) থাকা প্রয়োজন।

ইংরেজি শব্দ হাইফেন (hyphen) এক শব্দের বাংলায় অর্থ বোঝার মতো কোনো শব্দ যে নেই তা পাঠকমাত্রই জানেন। হাইফেনের বাংলা অনুবাদ করতে হলে বলতে হবে ‘শব্দগুচ্ছ বা কোনো শব্দের অংশবিশেষের মধ্যে চিহ্নবিশেষ অর্থাৎ—। ইংরেজি ‘ড্যাশ’-এর ব্যাপারেও এই দশা। ক্রিয়া হিসেবে ‘এই ড্যাশ’-এর একটা বাংলা হতে পারে ‘জোরে ধ্বনিত হওয়া’ কিন্তু হাইফেন অর্থে ‘ড্যাশ’ শব্দটাও ব্যবহূত হয়।

যাহোক, মাদার-ইন-ল বা সিস্টার-ইন-লতে ড্যাশ বা হাইফেন লাগবে। অধমের মার্ডারার ইন লতে লাগবে না। শ্রদ্ধেয় পাঠককুলের সদয় বিবেচনার জন্য আমাদের আইন ও বিচারব্যবস্থা নতুন সংযোজনরূপে সবিনয়ে মার্ডারার ইন ল শব্দগুচ্ছকে উপস্থাপন করছি।

২৪ মে ২০১৩-এর প্রথম আলোর প্রথম প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘খুনের দায়ে সাজাপ্রাপ্তরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা চান’। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ভিন্ন ভিন্ন খুনের মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করেছেন। রোজিনা ইসলাম বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতির ভয়াবহ এসব ক্ষমা প্রদর্শনসংক্রান্ত রিপোর্ট করেছেন বেশ কয়েকটি।
একদিকে রাষ্ট্র বিচারবহির্ভূত হত্যা চালাচ্ছে, করছে গুম, আর অন্যদিকে বিচারে যাদের খুনের দায়ে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তারা অত্যন্ত বিশেষ বিবেচনায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির মহান ক্ষমার উপঢৌকন পাচ্ছেন।

এই ক্ষমাসংক্রান্ত জিজ্ঞাসাবাদ বা প্রশ্নের উত্তরে যেমনটি আছে ২৪ মে রিপোর্টে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন যে তাঁরা অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে শুধু পাঠিয়ে দিয়েছেন। ভাবখানা, সব সিদ্ধান্ত নেবেন রাষ্ট্রপতি। অর্থাৎ চলছে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা, এখানে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বর্তমানে আর বহাল নেই। যেমন বহাল নেই নাগরিক সভা-সমাবেশ করার অধিকার। সংবিধানে নাগরিকের কী কী মৌলিক অধিকার আছে বা নেই, অতশত ছোটখাটো ব্যাপারে খোঁজ রাখার সময় কি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আছে? তিনি মনে করেছেন, দৃশ্যত এখন নাগরিকদের আর সভা-সমাবেশ করাটা ঠিক হবে না। অতএব, এক মাসের জন্য সব বাতিল।

মনে হচ্ছে, অতিসত্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতি উদারতায় এবং মহানুভবতায় অনেক মার্ডারারকে সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দেবেন। সংবিধানে লেখা আছে যে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা বা দণ্ড মওকুফ করতে পারেন। অতএব, ক্ষমা প্রদর্শনটা হবে আইন অনুযায়ীই। তাই মার্ডারার ইন ল অর্থাৎ যে খুনিরা আইন অনুযায়ী শাস্তি পাওয়ার পরও শাস্তি ভোগ করে না বা যাদের শাস্তি ভোগ করতে হয় না, তারা মার্ডারার ইন ল।

মার্ডারার ইন ল হওয়ার জন্য কী করতে হয়, কী যোগ্যতা লাগে, কী ধরনের রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক যোগ্যতা থাকতে হয়, সে ব্যাপারে অবশ্য সংবিধান নিশ্চুপ। যাঁরা এ-সংক্রান্ত নথিপত্র চালাচালি করেন, শুধু তাঁরাই সম্ভবত এই বিদ্যা রাখেন। তবে আঁচ করা মোটেও কঠিন নয়।

সরকারের শেষ সময়ে এসে ক্ষমার হিড়িক পড়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। বিশ্বের আইন এবং বিচারব্যবস্থায় বাংলাদেশের মহান অবদান—মার্ডারার ইন ল। অর্থাৎ আইনত খুনি কিন্তু আসলে খুনি নয়, কারণ খুনির মতো তাকে সাজা ভোগ করতে হয় না। ব্রাদার-ইন-লর মতো। আইনত ভাই, কিন্তু আসলে ভাই নয়।


আমরা আর কত নিচে নামব? অবশ্য আমরা না, প্রশ্নটা হলো রাষ্ট্র আমাদের আর কত নিচে নামাবে। এ সরকারের খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আরও শক্তিধর মন্ত্রীরা আছেন, যাঁদের বাবারা নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে, অনেকের শাস্তি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু দোষী প্রমাণিত হওয়া কয়েকজন হত্যাকারীকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাই তাদের শাস্তি এখনো কার্যকর করা হয়নি।

বিরোধী দলের নেত্রীর স্বামী নিহত হয়েছিলেন। হত্যাকারীদের শাস্তি অনেক আগেই কার্যকর করা হয়েছে।
এসব হত্যাকারীর শাস্তি কার্যকর না করে রাষ্ট্রপতি যদি তাদের মাফ করে দিতেন?

সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা রাখা হয়েছে মূলত দুটো ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য। যদি সাংঘাতিক কোনো অকল্পনীয় ভুলের কারণে নির্দোষ ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং ভুলটি জানার পর বিচারিক ব্যবস্থায় ভুল শোধরানো অত্যন্ত জটিল, সে ক্ষেত্রে। অর্থাৎ বিচারিক আদালত দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিয়েছেন। হাইকোর্ট সেটা বহাল রেখেছেন। আপিল বিভাগেও ভুল ধরা পড়েনি। যাবজ্জীবন সাজার ১০ বছর খাটার পর দেখা গেল বা জানা গেল, যাকে খুন করার জন্য সাজা হয়েছে, সেই ‘নিহত’ ব্যক্তিটি বহাল তবিয়তে আছে। বিচারব্যবস্থায় খুনের ঘটনায় এ রকম ভুল ৩০-৪০ বছরে দু-এবার ঘটতে পারে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমার দ্বিতীয় প্রয়োগ বা কারণটা হলো সম্পূর্ণ এবং নিতান্তই মানবিক। সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সব ডাক্তারই একমত হলেন যে রোগী অপরাধী আর মাস দুয়েকের বেশি বাঁচবে না। সেসব ক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যুর আগে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী যাতে শেষ কয়েকটি দিন ছেলেমেয়ে বা নিকটাত্মীয়ের সান্নিধ্যে কাটাতে পারে, সে জন্য নিতান্তই মানবিক কারণে রাষ্ট্রপতি তার সাজা মওকুফ করতে পারেন।

যে সমাজে ইনসাফ থাকে না, সেটা সভ্য সমাজ হিসেবে টিকে থাকতে পারে না। পচনের হিড়িক লেগেছে চতুর্দিকে। পচনটা আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি, দুর্গন্ধ সবাই পাচ্ছি। সারা দেশে ব্যতিক্রম মাত্র দুজন।