মাদ্রাসা শিক্ষার রাজনৈতিক অর্থনীতি
এম এম আকাশ , রবিবার, মে ২৬, ২০১৩


মাদ্রাসা শিক্ষা হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের ধর্মীয় শিক্ষা। 'মাদ্রাসা' আরবি শব্দ, যার অর্থ 'বিদ্যালয়'। ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসক ওয়ারেন হেস্টিংসের নির্দেশে কলকাতায় ১৮৬৬ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় Calcutta মাদ্রাসা এবং এটাই প্রথম সুসংগঠিত মাদ্রাসা। ১৯৪৭ সালে কলকাতার মাদ্রাসার আরবি শাখাটি ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় 'মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড'। পরে এর তত্ত্বাবধানে ১৯৫৭ সাল নাগাদ ৭২৬টি আলিয়া মাদ্রাসা পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এ দেশে আলিয়া মাদ্রাসা ছিল এক হাজার। ২০০৮ সালে এই আলিয়া মাদ্রাসার মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫১৮টি।

সরকারি উদ্যোগে গঠিত এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় বিকশিত আলিয়া মাদ্রাসা ছাড়াও সমাজের রক্ষণশীল মুসলমানদের উদ্যোগে বেসরকারি উদ্যোগে গঠিত হয়েছে 'কওমি' মাদ্রাসা। এগুলো প্রধানত গড়ে উঠেছে মসজিদ, মাজার এবং ধর্মীয় ওয়াক্ফ সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে। তাদের আদি আদর্শ হচ্ছে দেওবন্দে প্রতিষ্ঠিত 'দারুল উলুম দেওবন্দ' মাদ্রাসা। তাদের সম্পর্কে তথ্য খুবই অপ্রতুল এবং সব কিছুই অনুমানভিত্তিক। শুরু থেকেই তারা দেশের মূলধারার শিক্ষা বা রাষ্ট্রের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থেকে অগ্রসর হয়েছেন। যদিও মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য ইসলামী দেশের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সম্পর্ক শুধু আদর্শগত নয়, আর্থিকও বটে। পেট্রোডলারের উদ্ভব ও বিকাশের সঙ্গে তাদের উদ্ভব ও বিকাশ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কওমি মাদ্রাসায় বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পাঠদান নিষিদ্ধ। ব্যবহারিক জীবনে তারা যেহেতু পরবর্তী সময়ে গ্রামাঞ্চলে সচরাচর ইমাম, মোয়াজ্জিন, শিক্ষকতা (ধর্মীয়), শরিয়া বিচারক, ফতোয়া প্রদানকারী ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত থাকেন। সমাজের কোনো অংশই যেমন সমাজদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করতে পারে না তেমনি কওমি মাদ্রাসাও নিশ্চয়ই আধুনিক সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত হচ্ছে এবং কিছু কিছু পরিবর্তন ও সংস্কারও নিশ্চয় সেখানে হচ্ছে। কওমি মাদ্রাসার চিত্রকল্প খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ তার 'রানওয়ে' ছবিতে। কওমি মাদ্রাসার নারীবিরোধিতা, শিশুমনের ওপর তার প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ, জঙ্গি আসক্তি, বাঁচলে গাজী, মরলে বেহেশত_ এ জাতীয় অন্ধবিশ্বাস ইত্যাদি বিষয় সঠিকভাবেই এই চলচ্চিত্রটিতে উঠে এসেছে বলে আমার ধারণা।

অবশ্য এই কওমি ধারারই অনুষঙ্গী হচ্ছে ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। এটি আরও সংকীর্ণ। এখানে শুধু 'আরবি বর্ণমালা' ও 'কোরআন পাঠ' শেখানো হয়। এ ছাড়া আছে হিফজুল কোরআন বা হাফেজিয়া মাদ্রাসা। এখানেও বহু বছর পরিশ্রম করে অর্থ জানা ছাড়াই শুধু কোরআনের মুখস্থ আবৃত্তি শেখানো হয়।

এ ছাড়া রক্ষণশীল এলিট গোঁড়া মুসলমানরা নিজেদের জন্য শহরগুলোতে গড়ে তুলেছেন এক ধরনের জগাখিচুড়ি মাদ্রাসা ব্যবস্থা। এগুলোর রয়েছে বিভিন্ন নাম। কখনও কখনও এদের 'ক্যাডেট' মাদ্রাসা নামে অভিহিত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাদের নামেও এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কখনও কখনও ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও আধুনিক পাঠদান করা হয়। তাদের পোশাক-আশাক আধুনিক। কওমি মাদ্রাসার মতো এখানে শার্ট-প্যান্ট নিষিদ্ধ নয়। এখানে সহশিক্ষা চালু আছে এবং মেয়েদের আলাদা ঘরে আবদ্ধ করে শিক্ষা দেওয়া হয় না। মেয়েরা এখানে উচ্চৈঃস্বরে হাসতে পারে, কথাও বলতে পারে। পথ দিয়ে চলতে গেলে পুরুষ দেখলে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ানোর অনুশাসনও এখানে নেই। টিভি-কম্পিউটার-নাটক-নৃত্য-স্পোর্টস-ছবি আঁকা এগুলোর কোনোটিই এখানে ধর্মবিরোধী বলে গণ্য হয় না। খালি একটি বিষয়ই তারা লক্ষ্য রাখেন, সেটা হচ্ছে 'ইসলামের পুনরুজ্জীবন' এবং সমাজে, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে আদর্শগতভাবে ইসলামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করা। ইসলাম তাদের কাছে একটি মৌলবাদী বিশ্বাস। যে জন্য যে কোনো পন্থা তারা অবলম্বন করতে পারেন। সে দিক থেকে এই ধারাটিকে 'আধুনিক রাজনৈতিক ইসলাম' হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই প্রসঙ্গে ড. আবুল বারকাতের পরিচালিত জরিপের একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। সারাদেশ থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত ৬০টি আলিয়া মাদ্রাসা এবং ৬০টি কওমি মাদ্রাসা অর্থাৎ মোট ১২০টি মাদ্রাসার গভর্নিং বোর্ডের সদস্যদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা জরিপ করে তিনি নিম্নোক্ত ক্রমিক গুরুত্বটি পেয়েছিলেন :

প্রথম জামায়াতে ইসলাম সংশ্লিষ্টতা ২৯.১ এবং বিএনপি প্রায় ২৬.৬ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে আওয়ামী লীগ প্রায় ২১.৯ শতাংশ। চতুর্থ_ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এবং খেলাফত মজলিস, প্রায় ১০.৭ শতাংশ। পঞ্চম_ জাতীয় পার্টি প্রায় ২.৭ শতাংশ। অন্যান্য প্রায় ৮.৭ শতাংশ।

উদ্ধৃত পরিসংখ্যান থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়, আধুনিক রাজনৈতিক ইসলামপন্থিরাই তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে বর্তমানে অধিকাংশ মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদে নেতৃত্ব প্রদান করছেন। তবে একটি সুখবর হচ্ছে এই যে, এই মৌলবাদী ও আধুনিক ইসলামপন্থিদের সন্তানরা কেউই সাধারণ কওমি বা আলিয়া মাদ্রাসায় পাঠগ্রহণ করেন না। আমরা আবুল বারকাতের তথ্যভাণ্ডারের শরণাপন্ন হলে আরও দেখতে পাব :

১. আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার যথাক্রমে ৭৬ শতাংশ এবং ৮৪ শতাংশ শিক্ষকেরই প্রধান অভিযোগ বেতনের নিম্ন হার। ড. বারকাতের মতে, এখানে সর্বনিম্ন বেতন হচ্ছে মাসিক ৪৬০০ এবং সর্বোচ্চ মাসিক ১১০০০ টাকা। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসার যেহেতু কোনো বিধিবিধান নেই, সেখানে বেতনের বিষয়টি খুবই নমনীয়। যখন যেমন সংগ্রহ, তখন তেমন বেতন এই ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো চলে থাকে। ড. বারকাতের তথ্য অনুযায়ী তাদের সর্বনিম্ন আয় মাসিক ১৪৫০ এবং সর্বোচ্চ ৪৫০০ টাকা। লক্ষণীয় যে, ড. বারকাত কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের আয়ের যে হিসাব দিয়েছেন সে অনুযায়ী নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তারা প্রায় সবাই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন।

২. এটাও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, এই মাদ্রাসা শিক্ষকরা শিক্ষকতা ছাড়াও অন্যান্য পেশায় জড়িত এবং সেখান থেকেও তাদের পরিপূরক আয় হয়। তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষকদের মোট আয়ের ৫৭ শতাংশ শিক্ষকতা থেকে এলেও ২৩ শতাংশ আয় আসে কৃষি থেকে। পক্ষান্তরে কওমি শিক্ষকদের মোট আয়ের মাত্র ৪৫ শতাংশ আসে শিক্ষকতা থেকে। ৯ শতাংশ আয় আসে ইমামতি করে। কৃষি থেকে আসে ২০ শতাংশ। রেমিট্যান্স থেকে আসে ৪ শতাংশ। অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষকদের বহুমুখী জীবনযাত্রা ও আয়ের উৎস রয়েছে।

৩. যদিও মাদ্রাসার এই শিক্ষক গোষ্ঠী আয় বিবেচনায় দরিদ্র বা নিম্ন মধ্যবিত্তের পঙ্ক্তিভুক্ত; কিন্তু তারা নিজেরা নিজেদের মনে করেন সামাজিকভাবে মধ্যবিত্ত স্তরের অন্তর্ভুক্ত। নিজেদের মধ্যবিত্ত বলে বিবেচনা করেন এ রকম শিক্ষকের সংখ্যা আলিয়া মাদ্রাসায় ৬০ শতাংশ ও কওমি মাদ্রাসায় ৪৮ শতাংশ। পক্ষান্তরে নিজেরাই নিজেদের নিম্ন মধ্যবিত্ত মনে করেন এ রকম শিক্ষকের সংখ্যা আলিয়া মাদ্রাসায় ৩৫ শতাংশ এবং কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ৩৬ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায় যে, আয় কম হলেও সামাজিক মর্যাদার সিঁড়িতে তাদের অবস্থান অতটা নিচুতে নয়। অন্তত সেরূপই তাদের আত্মবিশ্বাস। এই তথ্যটি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে প্রগতিশীলদের বিবেচনায় নিতে হবে। তারা যেহেতু শিক্ষক এবং দরিদ্র সেহেতু তারাই হবেন গ্রামশির ভাষায় 'গ্রামীণ অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত বুদ্ধিজীবী' Rural Organic Intellectual সুতরাং, গ্রামীণ রাজনীতিতে তাদের বিশেষ প্রভাব থাকবে। বর্তমানে এই সামাজিক শক্তিকে প্রতিক্রিয়াশীলরা ব্যবহার করছে।

এবার আমরা একটু মাদ্রাসার ছাত্রদের দিকে তাকাব। দেখা যাক ড. বারকাতের তথ্য কী বলে :
১. প্রথমত, এই মাদ্রাসা ছাত্রদের মোট সংখ্যা ২০০৮ সালে ছিল ৯৮ লাখ ২৭ হাজার ৭৪২ জন। তাদের মধ্যে গ্রামের মাদ্রাসায় পড়েন ৮৫ শতাংশ। শহরে মাত্র ১৫ শতাংশ।
২. তাদের মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসায় পড়েন প্রায় ৪৬ লাখ, আর কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ৫৩ লাখ। অর্থাৎ অধিকাংশ মাদ্রাসার ছাত্রই এসে জমা হয়েছেন 'খারিজি মাদ্রাসা'য়।
৩. আলিয়া মাদ্রাসার ৭১ শতাংশ ছাত্রই ছেলে। ছাত্রী ২৯ শতাংশ। কওমি মাদ্রাসায় ৯১ শতাংশ ছাত্র, ৯ শতাংশ ছাত্রী।
৪. কওমি মাদ্রাসায় ৮৫ শতাংশ ছাত্রই মাদ্রাসার বোর্ডিংয়ে থেকে লেখাপড়া করেন। মাত্র ১৫ শতাংশ ছাত্র বাইরে থেকে এসে পড়েন। পক্ষান্তরে আলিয়া মাদ্রাসায় ৮৯ শতাংশ ছাত্র বাইরে থেকে এসে পড়েন। ১১ শতাংশ হোস্টেলে থেকে পড়েন।
৫. মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের বিচারে তাদের প্রায় ৫১ শতাংশ দরিদ্র শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ৪৪ শতাংশ নিজেদের মনে করেন মধ্যবিত্ত। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে শিক্ষকদের মতো ছাত্রদের আপেক্ষিক আয় ও সামাজিক পরিচয় হচ্ছে_ দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত।

বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসা ছাত্রকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কে কে ভবিষ্যতে মাদ্রাসা শিক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বা উচ্চতর শিক্ষা অর্জনে আগ্রহী? দুই ক্ষেত্রেই মাদ্রাসাভেদে ও জেন্ডার ভেদে উত্তরদাতাদের উত্তরে তারতম্য দেখা যায়। আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের ৯৮ শতাংশ জানান, তারা উচ্চতর শিক্ষা লাভে আগ্রহী, আর ৫৯ শতাংশ ছাত্র বিশেষভাবে জানান যে, তারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পেতে চান। আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রীদের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ৯৬ এবং ৭২ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগ্রহের ক্ষেত্রে ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু কওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে উভয়ক্ষেত্রেই আগ্রহের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। কওমি ছাত্রদের ৮০ এবং কওমি ছাত্রীদের ৫২ শতাংশ উচ্চতর অধ্যয়নে ইচ্ছুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে ইচ্ছুক এ রকম কওমি ছাত্র হচ্ছে ৭ শতাংশ; আর ছাত্রী ২ শতাংশ।
আলিয়া ও কওমি : পার্থক্য ও সমাধান :আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষক-শিক্ষিকার আর্থসামাজিক পার্থক্যগুলো বিচারে নিয়ে সাধারণভাবে বলতে পারি, প্রথমটি মূলত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর এবং পাঠ্যসূচির ক্ষেত্রেও কিছুটা সরকারি নিয়ম-কানুনের মধ্যে থেকেই চলতে হয়। দ্বিতীয়টি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং বেসরকারি দেশি-বিদেশি অর্থ সাহায্যেই চলে; ফলে তাদের পাঠ্যসূচিতে ধর্মভিত্তিক গোঁড়ামি বেশি। দুটি টিপিক্যাল নমুনা নিয়ে তুলনা করে ড. বারকাত দেখিয়েছেন, একটি আলিয়া মাদ্রাসার মোট বার্ষিক আয়ের (গড়ে প্রায় ২৯ লাখ টাকা) ৬০ শতাংশই আসে সরকারি অনুদান থেকে। পক্ষান্তরে তুলনীয় একটি কওমি মাদ্রাসার মোট বার্ষিক আয়ের (গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা) ৬৭ শতাংশই আসে ব্যক্তিগত অনুদান থেকে। আলিয়া মাদ্রাসার মোট বার্ষিক ব্যয়ের ৮২ শতাংশ ব্যয় করা হয় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ। গরিব ও এতিম ছাত্রদের 'লিল্লাহ' বাবদ ব্যয় হয় মোট ব্যয়ের ৫ শতাংশ। পক্ষান্তরে কওমি মাদ্রাসার মোট ব্যয়ের ২৭ শতাংশ ব্যয় হয় শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন বাবদ। আর গরিব ও এতিম ছাত্র, যারা বোর্ডিংয়ে থেকেই মূলত লেখাপড়া করেন, তাদের জন্য ব্যয় হয় মোট ব্যয়ের ৩৬ শতাংশ এবং সেটাও লিল্লাহ হিসেবে ব্যয় হয়।

এই আয়-ব্যয়ের প্যাটার্ন থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্ট। আলিয়া মাদ্রাসার আধুনিক সংযোগ, নিয়ন্ত্রণ, আদর্শগত প্রবণতা ইত্যাদি বেশি কিন্তু তাদের সঙ্গে চরম দরিদ্রের যোগাযোগ কম। চরম দরিদ্ররা এসে ভিড় করেছে কওমি মাদ্রাসায় এবং সেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া যেমন কম, আর্থিক আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবও তেমনি বেশি।

এ কথাও আমরা জানি, কওমি মাদ্রাসার নেতারা নিজেরাই সরকারি সাহায্য প্রত্যাখ্যান করেছেন; কারণ তারা মনে করেন যে, সরকারি সাহায্য গ্রহণ করলে সরকারি নিয়ন্ত্রণও মেনে চলতে হবে। এ কথাও সত্য যে, এসব কওমি মাদ্রাসা ধর্মীয় শিক্ষায় একান্ত মনোযোগ দিয়ে দরিদ্রদের এমনভাবে শিক্ষিত করেছে যে, পাস করার পর সমাজে তাদের চাকরি বা কাজের পথ বিশেষ একটা থাকে না। তখন বাধ্য হয়েই তাদের ইমাম হিসেবে মসজিদে অথবা মাদ্রাসাতেই শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে হয়। এতে হয়তো কিছুটা সামাজিক মর্যাদা পাওয়া যায়; কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য মোটেও আসে না। ক্রমে তাদের মধ্যে যারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই অসন্তোষ জমতে থাকে। এই সামাজিক অসন্তোষই হচ্ছে জঙ্গিবাদের সবচেয়ে উর্বর প্রজনন ক্ষেত্র। এই অসন্তুষ্ট সামাজিক শক্তিকে জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো সহজেই কাজে লাগাতে সক্ষম হয়।

কিন্তু এই একই লজিক উদ্ধৃত করে বলা যেতে পারে যে, ব্যক্তিগত জীবনে 'অর্থনৈতিক ব্যর্থতার' কারণেই তাদের মধ্যে তৈরি হবে উচ্চতর আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ। তৈরি হবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রতি টান। জরিপে সেটাও কিছুটা দেখা গেছে। সুতরাং, দরিদ্র মাদ্রাসার ছাত্ররা যদি উপযুক্ত সুযোগ ও সরবরাহ সুবিধা পান তাহলে নিশ্চয়ই তারা কওমি মাদ্রাসা ত্যাগ করে আলিয়া মাদ্রাসায় আসবেন এবং আলিয়া মাদ্রাসায় যদি আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায় তাহলে সেখান থেকেও বের হয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হবেন এবং এভাবে মৌলবাদের বিপদ থেকে হয়তো আমরা রক্ষা পাব। এই ধারায় কিছুটা কাজও বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই হয়েছে। জেনারেল এরশাদ দাখিল ও আলিম পরীক্ষাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ডিগ্রির মর্যাদা দিয়েছিলেন। পরে আলিয়া মাদ্রাসার এই ডিগ্রিধারীরা কিছু পরিমাণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিও হতে শুরু করেছেন। কিন্তু কওমি মাদ্রাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার ইচ্ছা ও হার দুটিই কম। অন্যদিকে ধনী শ্রেণীর কেউ কেউ এই কওমি মাদ্রাসাতেই ব্যক্তিগত পয়সা ঢেলেছেন। তাই এই স্ট্র্যাটেজির অনেক বিপদের দিক রয়েছে।

তবে ব্র্যাকের শিক্ষা গবেষক সমীর কুমার নাথকে মাদ্রাসা বিষয়ে আমি ফিল্ডের অভিজ্ঞতা জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি আমাকে কিছুটা আশার আলো দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বললেন, দেশে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছেলেমেয়ের সংখ্যা মোটামুটি জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ। তাদের প্রায় সবার বর্তমানে মূলধারার প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার বাস্তব সুযোগ থাকায় ৯৫ শতাংশই সেখানে ভর্তি হচ্ছে। মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ নানা কারণে মাদ্রাসার ইবতেদায়ি শাখায় ভর্তি হয়।

নবম-দশম-একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী অর্থাৎ মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানে মূলধারার বিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা অপ্রতুল। দ্বিতীয়ত, এখানে মূলধারার প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুলও বটে। তৃতীয়ত, এখানে মূলধারার বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ও বাড়িতে টুকটাক কাজ দুটি একসঙ্গে করা সম্ভব হয় না। যদি তা করতেই হয় তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অন্তত বাড়ির কাছেই অবস্থিত হতে হবে। দূরে অবস্থিত হলে যাতায়াত বা থাকার সমস্যার উদ্ভব হয়। এসব বিচারে এখন দেখা যায় দরিদ্র পরিবারগুলোর সন্তানদের একটি বড় অংশ চলে যায় মাদ্রাসার মাধ্যমিক (দাখিল), উচ্চ মাধ্যমিক (আলিম) শিক্ষাক্রমে। সেখানে এই সুবিধাগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের নাগরিকদের চাহিদা রাষ্ট্র পূরণে অক্ষম বলেই নাগরিকরা মাদ্রাসায় ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন। আর চাহিদা যখন পূরণ হচ্ছে তখন আপনা থেকেই তারা আধুনিক মূলধারার শিক্ষার দিকে ঝুঁকছেন। এ ছাড়া আগে আমরা দেখেছি মাদ্রাসা শিক্ষার প্রবক্তা বিত্তবান ও ক্ষমতাবানরা কিন্তু নিজেদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়তে দিচ্ছেন না। তারপরও দেখা যায়, মাদ্রাসার শতকরা ২৫ ভাগ ছাত্রছাত্রী দাখিল বা আলিম স্তর পার হওয়ার পর স্বেচ্ছায় আর মাদ্রাসা শিক্ষায় না থেকে মূলধারায় চলে আসেন। উচ্চশিক্ষায় বা কারিগরি শিক্ষায় আরও বেশি সুযোগ থাকলে আরও অনেকেই যে এদিকেই ঝুঁকবেন তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাই মাদ্রাসা শিক্ষায় যে দরিদ্র জনগণ বর্তমানে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তা ওই দরিদ্র জনগণের ব্যর্থতা নয়; ব্যর্থতাটা আমাদের রাষ্ট্রের। এটি শাসক শ্রেণীর অক্ষমতার সমস্যা, আমরা আধুনিক মূলধারার শিক্ষার অধিকার ও সুযোগকে এখনও সর্বজনীন করতে পারিনি।