তারেক রহমান কি বিএনপি'র 'সেভিয়ার' হতে পারবেন?।। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
এইদেশ সংগ্রহ , রবিবার, মে ২৬, ২০১৩


১৯৯১ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রথম তার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠন করেন, তখন আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে একটা কলাম লিখেছিলাম। কলামটির শিরোনাম ছিল, "ম্যাডাম, ভুল পরামর্শদাতাদের কবলে পড়বেন না।" কলামটি ছাপা হয়েছিল তখনকার একটি জনপ্রিয় দৈনিক 'আজকের কাগজে'। আমি ধারণা করেছিলাম, বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি নবজন্ম প্রাপ্ত হয়েছে। জেনারেল জিয়ার ক্যান্টনমেন্ট ভিত্তিক রাজনৈতিক দলটিকে তিনি গণতান্ত্রিক ভিত্তি দান করেছেন। বাংলাদেশে এখন প্রকৃতই একটি দ্বিদল ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি গড়ে উঠবে।

আমার এই আশাবাদের কারণ ছিল। বেগম জিয়ার স্বামী জেনারেল জিয়া বিএনপি গঠন করেছিলেন ক্ষমতায় বসে এবং সামরিক বাহিনীর সহায়তায়। তার মৃত্যুর পর বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে ক্যান্টনমেন্টের আরেক জেনারেলের (এরশাদ) দ্বারাই। তারপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপিকে রাজপথের আন্দোলনে নামতে হয়েছে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হতে হয়েছে। বেগম জিয়া নিজে এরশাদ সরকারের আমলে নির্যাতিত হয়েছেন। ফলে বিএনপিকে আর কেবল ক্যান্টনমেন্টের পার্টি বলে বিবেচনা করা যায়নি। এই পার্টির একটা গণতান্ত্রিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল।

তখন বিএনপি সম্পর্কে আমার বিরূপ ধারণা কেটে যাওয়ার আরেকটা বড় কারণ ছিল। বেগম জিয়া নিজে দেশ শাসনে রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগসহ সকল গণতান্ত্রিক দলের দাবি মেনে নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন পদ্ধতি বাতিল করে সংসদীয় প্রথায় ফিরে আসেন এবং নিজে রাষ্ট্রপতি হওয়ার বদলে প্রধানমন্ত্রী হন। আমার তখন মনে হয়েছে So far so good- এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তা ভালো। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর তিনি যেন চাটুকার ও অসাধু পরামর্শদাতাদের কবলে না পড়েন এবং বিরোধী দলের (আওয়ামী লীগ) সঙ্গে অনাবশ্যক বিরোধে জড়িয়ে না পড়েন। তাহলে দেশের অশুভ শক্তিগুলো আবার তার সুযোগ নেবে, গণতন্ত্রের শুভযাত্রা ব্যাহত হবে।

এই সময় আমার কূটনীতিক বন্ধু মহিউদ্দীন আহমদ (সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং বর্তমানে কলামিস্ট) নতুন বিএনপি সরকারের দ্বারা আমেরিকায় বাংলাদেশের মিশনে উচ্চ কূটনৈতিক পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং নিউইয়র্কে যাত্রার পথে লন্ডনে যাত্রাবিরতি ঘটিয়ে আমার বাসায় দু'দিন অবস্থান করেছেন। এক সকালে হাইড পার্কে মর্নিং ওয়ার্কে গিয়ে মহিউদ্দীন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনিতো আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে পরিচিত। বিএনপি'র বর্তমান সরকার সম্পর্কে আপনার মনোভাব কি? বলেছিলাম, এই সরকার একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। আমি আওয়ামী লীগের সমর্থক, কিন্তু এই সরকারের বিরোধী নই। বরং গণতন্ত্রের স্বার্থে এই সরকারকে সমর্থন দেয়া ও দেশ শাসনে সুযোগ দেয়া আমাদের দায়িত্ব বলে মনে করি। বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকলে আজ বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, কাল আওয়ামী লীগ আসবে। আমরা তো ক্ষমতায় শান্তিপূর্ণ পালা বদলে বিশ্বাসী।

মহিউদ্দীন আহমদ আমার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছিলেন। একই সঙ্গে তাকে বলেছিলাম, আমার একটাই ভয়, বেগম খালেদা দলের চাটুকার ও অসাধু পরামর্শদাতাদের খপ্পরে পড়ে না যান এবং তার সরকার ও দলের গণতান্ত্রিক চরিত্রটি আবার না হারান। এ সম্পর্কে বেগম জিয়াকে সতর্ক করে একটি কলাম লিখবো। মহিউদ্দীন এরপর নিউইয়র্কে চলে যান এবং আমিও ঢাকার "আজকের কাগজ" দৈনিকে (অধুনালুপ্ত) কলামটি লিখি, যার শিরোনাম ছিল, "ম্যাডাম, ভুল পরামর্শদাতাদের কবলে পড়বেন না।"

ক্ষমতায় বসার প্রথম দিকে বেগম খালেদা জিয়া যে নম্র ও গণতান্ত্রিক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন এবং কিছু প্রবীণ রাজনৈতিক সহকর্মী দ্বারা পরিবৃত ছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল, আওয়ামী লীগও যদি এখন কিছু সমঝোতার মনোভাব দেখায় তাহলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র টিকে যাবে। পাকিস্তানের অভিশপ্ত সামরিক শাসনের অনুকরণ করার বদলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অনুকরণীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে উঠবে।

আমার এই আশাবাদ খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ইতিহাস বেগম জিয়াকে একটা বিরাট সুযোগ দিয়েছিল, তিনি হতে পারতেন আর্জেন্টিনার ইভা পেরনের মতো ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক নারী। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি হলেন আর্জেন্টিনারই দীর্ঘ এক যুগের বিতর্কিত শাসক ইসাবেলা পেরন, যাকে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। অনেকেরই আশা ছিল, বেগম জিয়ার পাশে তখন ডা. বি. চৌধুরী, আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, আব্দুস সালাম তালুকদার, কর্নেল (অব.) অলি, শেখ রাজ্জাক আলী, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা প্রমুখের মতো মডারেট লিডারেরা থাকায় বিএনপি তার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র হারাবে না।

জামায়াত তখনো বিএনপি'তে প্রকাশ্য অনুপ্রবেশ ঘটাতে পারেনি। খালেদা-সরকার একবার জনমতের চাপে গোলাম আজমকে গ্রেফতার করায় জামায়াত প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য '৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি'র বিরুদ্ধে গিয়েছিল। অবশ্য সাময়িকভাবে। বেগম জিয়া তার প্রথম সরকারের আমলেই চাটুকার ও অসাধু পরামর্শদাতাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন। সংসদে বিরোধী দলের (আওয়ামী লীগ) সঙ্গে সমঝোতাপূর্ণ আচরণের বদলে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা দেখাতে শুরু করেন। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, ব্যক্তিগত ভাবেও।

বঙ্গবন্ধুর শোকাবহ মৃত্যুদিবসকে খালেদা জিয়া তার জন্মদিন ঘোষণা করে ঔদিন ঘটা করে উত্সব করা শুরু করেন। সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার বক্তৃতার সময় প্রধানমন্ত্রীর চোখের ইঙ্গিতে স্পিকার মাইক বন্ধ করে দেওয়া শুরু করেন। শুরু হয় উপনির্বাচনে (মাগুড়া) প্রকাশ্য কারসাজি। প্রশাসনে দলীয়করণ মাত্রা ছাড়ায়। বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে বিএনপি'র মৈত্রী প্রকাশ্য রূপ ধারণ করতে থাকে। ভারত-বিদ্বেষ প্রচার মুসলিম লীগ আমলের প্রচারণাকেও ছাড়িয়ে যায়।

বিএনপি ক্রমশ: সাম্প্রদায়িক দলের চরিত্র ধারণ করতে চললেও তারেক রহমান যতোদিন পর্যন্ত বয়ো:প্রাপ্ত হননি এবং বিএনপি-রাজনীতিতে সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেননি, ততোদিন পর্যন্ত দলটিতে মডারেট ও প্রবীণ রাজনৈতিক নেতারা একেবারে কোনঠাসা হয়ে পড়েননি। যদিও নিজেদের অনৈক্য ও দুর্বলতার জন্য তারা ক্রমশ: পিছু হটছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি-রাজনীতিতে তারেক রহমানের পূর্ণআবির্ভাব ও কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটে। মায়ের প্রধান উপদেষ্টা হয়ে দাঁড়ান তিনি।

মায়ের পরেই দলের কর্তৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর তারেক রহমান যে নীতি অনুসরণ করা শুরু করেন, তা হলো দলের প্রবীণ ও মডারেট নেতাদের দ্রুত কোণঠাসা করে ফেলা, অনেককে দল ছাড়তে বাধ্য করা এবং জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্য ও অচ্ছেদ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ঘোষণা করেন, বিএনপি ও জামায়াত একই পরিবারভুক্ত আত্মীয়। ২০০১ সালের নির্বাচন বিজয়ের পর বিএনপি প্রকাশ্যে জামায়াতকে ক্ষমতায় অংশীদার করে এবং শুরু হয় বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিতর্কিত শাসন। এ সময় দেশে জঙ্গি মৌলবাদের উত্থান ঘটে, বাংলাভাইদের মতো সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় পেতে থাকে। আওয়ামী লীগের বহু নেতাকে—শাহ কিবরিয়া, আহসান উল্লা মাস্টারকে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনাকেও হত্যা করার জন্য চলে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। যে হামলায় বেগম আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী হতাহত হন এবং হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।

এ সময় থেকেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র মধ্যে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা যে সুদূরপরাহত তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৭১-এর যুদ্ধাপরাধের জন্য জামায়াত দেশবাসীর কাছে কোনো গ্রহণযোগ্যতা না পেয়ে বিএনপিকে ক্রমশ গ্রাস করতে শুরু করে এবং বিএনপিও ক্ষমতায় থাকার জন্য জামায়াতের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিএনপি-জামায়াতের এই অচ্ছেদ্য মৈত্রীর আসল রূপকার তারেক রহমান। এক এগারোর সময়ে তার বন্দিদশা এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পরেও তিনি বিএনপি'র জামায়াতি সংশ্রব ত্যাগে সম্মতি দেননি বরং মাকে জামায়াতের সঙ্গে অধিকতর ঘনিষ্ঠতার জন্য প্রভাবিত করেছেন।

কিছুকাল আগেও অনেকের মতো আমারও ধারণা হয়েছিল, বিদ্যুত্, পানি, গ্যাস, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, তিস্তার পানি, ছিটমহল, সীমান্তে অব্যাহত বাংলাদেশি হত্যা ইত্যাদি সমস্যায় আওয়ামী লীগ যেভাবে দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে তাতে বিএনপি'র আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। দেশের মানুষ কর্তৃক যুদ্ধাপরাধের জন্য প্রত্যাখ্যাত জামায়াতিদের সংশ্রব ত্যাগ করে বিএনপি যদি দেশের মানুষের অভাব অভিযোগ নিয়েই সরকারের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়ায় তাহলে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে তার মোকাবিলা করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে।

কিছুদিনের জন্য মনে হয়েছিল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে এবং বিএনপি তার সমমনা কিছু ছোট বড় দল নিয়েই গণআন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বেগম জিয়া তার সাম্প্রতিক সিঙ্গাপুর সফরের পর যখন দেশে ফিরেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য পরিচালিত জামায়াতের সন্ত্রাসী আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন দেন এবং পাশাপাশি হরতাল সমাবেশ ডাকা শুরু করেন, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।

মনে হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিএনপি'র প্রস্তাব মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করার বদলে দলটি জামায়াতের সঙ্গে মিলে দেশ অচল করে দিয়ে এখনই সরকারের পতন ঘটাতে চায়। বেগম জিয়া বিভিন্ন স্থানে দেওয়া ভাষণে বলতে শুরু করলেন, এই সরকারকে এখনই ক্ষমতা ছাড়তে হবে। নইলে তারা পলায়নের সুযোগ পাবে না।

বেগম জিয়ার হঠাত্ এই হার্ডলাইন নেওয়ার কারণ কি? লন্ডনের বিএনপি সার্কেলের একটি সূত্র থেকে জানা গেল. সিঙ্গাপুর-পরিকল্পনাটি তারেক রহমানের তৈরি, তিনি সউদি আরবে ওমরাহ করার জন্য গিয়ে সিঙ্গাপুরে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাকে জামায়াতের সঙ্গে মিশে এবং পরবর্তী ধাপে মাদ্রাসা ছাত্রদের নিয়ে নতুন সংগঠন তৈরি করে সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোর পরামর্শ দেন। এই পরামর্শ যে নিখুঁত এবং তাতে সরকারের পতন অনিবার্য এটা বেগম জিয়া বিশ্বাস করেছিলেন এবং হেফাজতের ঢাকা অবরোধে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে সরকারকে আটচল্লিশ ঘন্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন।

কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবেই এই পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায় এবং হাসিনা সরকার নৈপুণ্যের সঙ্গে ৫ মে'র হেফাজতি অভ্যুত্থান দমনে সক্ষম হন। ফলে বিএনপি-জামায়াত শিবিরের রাজনৈতিক হিসেব-নিকেষ সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। সরকারের পতন ঘটানো এবং তারেক, কোকোসহ দুর্নীতি ও বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত বিএনপি'র নেতা-নেত্রীদের মুক্ত করে দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রথমে জামায়াতের উপর, পরে হেফাজতের উপর বিএনপি'র যে নির্ভরতা তা বাস্তব ও ফলপ্রসূ কোনোটাই প্রমাণিত হয়নি। ভবিষ্যতেও যে হবে তার সম্ভাবনা কম। গণসমর্থন এড়িয়ে, গণআন্দোলনে না গিয়ে কখনো জামায়াতি সন্ত্রাস, কখনো জামায়াত-হেফাজত মিলিত সন্ত্রাসের উপর নির্ভর করে বিএনপি'র ক্ষমতা দখলের আশা যে ব্যর্থ হয়েছে এটা এখন স্পষ্ট।

বিএনপি'র এখন অস্তিত্ব রক্ষার এবং দেশের রাজনীতিতে টিকে থাকায় শেষ তুরুপের তাসটি কি? দেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, এই তুরুপের তাসটি এখন তারেক রহমান। ৫ মে'র হেফাজতি-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর তারেক রহমানের আর পর্দার আড়াল থেকে রাজনীতির প্রকাশ্য মঞ্চে বেরিয়ে না এসে উপায় নেই। তিনি বেরিয়ে এসেছেনও। গত মঙ্গলবার (২১ মে) লন্ডনে তারেক রহমান বিএনপি'র এক মহাসমাবেশ ডাকেন। ইস্ট এন্ডের সেন্ট্রাল প্লাজায় ইউরোপের বিভিন্ন স্থান থেকে শ'তিনেক লোক এসে জড়ো হয়। তারপর তারেক রহমানের উপস্থিতিতেই শুরু হয় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ।

শেষ পর্যন্ত পুলিশ এসে সংঘর্ষ থামায় এবং সমাবেশ ভেঙ্গে দেয়। তারেক রহমান নিকটবর্তী পামট্রি হোটেলে শ'দেড়েক কর্মী ও সমর্থক নিয়ে সভা করেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আক্রমণ চালিয়ে সরকারের পতন ঘটানোর আন্দোলন শুরু করার আহবান জানান। এরই সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় বিএনপি'র দু'দুটি প্রেস কনফারেন্স হয়েছে এবং তারেক রহমানকে দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নানা আভাস-ইঙ্গিতে তুলে ধরে তার একটা বিশাল ইমেজ বিল্ডআপের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এই প্রেস কনফারেন্সে ঢাকার যেসব সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন, তাদের একজন আমাকে জানিয়েছেন, সম্মেলনে তারেক রহমানকে এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছিলো, যেন তিনি এখন শুধু দলের নন, দেশেরও একমাত্র সেভিয়ার বা ত্রাণকর্তা। বিএনপি ও জামায়াতের , এমনকি বেগম খালেদা জিয়ারও নেতৃত্ব ব্যর্থ। এখন তারেক রহমান ফিরে এসে দলের হাল ধরলেই দেশের সব সমস্যার সমাধান হবে। এমনকি নির্বাচনে ১৮ দলীয় জোট অংশ নিলে, জয়ী হওয়ারও সম্ভাবনা আছে।

কিন্তু তারেক রহমান কি সত্যই দেশের দূরের কথা, তার দলেরও সেভিয়ার হতে পারবেন? সাহসী নেতা হলে তিনি এখনই দেশে ফিরে আসতেন, শেখ হাসিনা এক/এগারোর সময় যেমন এসেছিলেন সব মামলা-মোকদ্দমা, ওয়ারেন্ট, হুলিয়া এবং ফখরুদ্দীন সরকারের সব হুমকি ও বাধা প্রদান উপেক্ষা করে। তারেক রহমান আসতে চান আগামী নভেম্বর মাসে, যখন বর্তমান সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন এবং কোনো ধরনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ক্ষমতায় বসবেন। বিএনপি'র আশা শেখ হাসিনার এই সরকারের প্রধান হওয়া যদি ঠেকানো যায়, তাহলে তারেক রহমান দেশে ফিরলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাকে জেলে পাঠাবে না এবং তার রাজনৈতিক তত্পরতায় বাধা দেবে না। ফলে তিনি রাজনীতিতে জাদুর খেলা দেখাতে পারবেন।

বিএনপি'র এই প্রত্যাশা, তারেক-নির্ভরতাও কি ফলপ্রসূ হবে? এ সম্পর্কে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা কি আভাস দেয়? আগামীতে সে সম্পর্কে আলোচনার ইচ্ছে রইলো।