ফিনলে, লিপটন, ডানকান ইত্যাদি নামি দামি ব্র্যান্ডের যে চা খেয়ে আমরা প্রতিদিন তাজা হই.....
কল্লোল মুস্তাফা , বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০১৩


ফিনলে, লিপটন, ডানকান ইত্যাদি নামি দামি ব্র্যান্ডের যে চা খেয়ে আমরা প্রতিদিন তাজা হই, সেই চা উৎপাদন করতে গিয়ে চা শ্রমিকরা প্রতিদিন আরো নির্জীব হয়।

চা গাছ ছেটে ছেটে ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেয় হয় না। চা শ্রমিকের জীবনটাও ছেটে দেয়া চা গাছের মতোই, লেবার লাইনের ২২২ বর্গফুটের একটা কুড়ে ঘরে বন্দী। মধ্যযুগের ভূমিদাসের মতোই চা মালিকের বাগানের সাথে বাধা তার নিয়তি।

তার দৈনিক মজুরী মাত্র ৫৫ টাকা। ২০১১ সালে এর পরিমাণ ছিল ৪৮ টাকা। সাথে সপ্তাহে ৩ কেজি রেশনের চাল ও আটা। এ দিয়ে পরিবার নিয়ে তিন বেলা খাবার জোটে না।

সকালে লবণ দিয়ে এক মগ চা আর সাথে দুমুঠো চাল ভাজা খেয়ে বাগানে যেতে হয়, তার উৎপাদিত চা ও দুধ চিনি দিয়ে খাওয়ার সামর্থও তার নাই। সারা দিন এক পায়ে দাড়িয়ে, মাইলের পর মাইল হেটে কঠোর পরিশ্রম। যারা পাতা তোলেন, ২৩ কেজি পাতা তুললেই কেবল দিনের নিরিখ পূরণ হয়, হাজিরা হিসেবে গণ্য হয়। গাছ ছাটার কালে অন্তত ২৫০টা গাছ ছাটতে হয় দিনে। কিটনাশক ছিটালে অন্তত ১ একর জমিতে কীটনাশক ছিটালেই তবে নিরিখ পূরণ। দুপুরে এক ফাকে মরিচ আর চা পাতার চাটনি, সাথে মাঝে মাঝে মুড়ি, চানাচুর।

একেকদিন হাত ফুলে যায়, পা ফুলে যায়, ঝোপালো চা গাছের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে হাত পা কোমড় ছিলে যায়। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সাপ বিচ্ছার কামড় খেয়ে তারা বাগানে কাজ করে। সন্তানের শিক্ষা মেলে না, চিকিৎসা মেলে না, যে ঘরটিতে প্রজন্মান্তরে তার বসবাস সে ঘরটিও তার হয় না, ঘরটি ধরে রাখতে হলে পরিবারের একজনকে অন্তত চা শ্রমিক হতেই হয়।

অথচ বাগান মালিকের জমি সরকারেরই খাস জমি, সামান্য অর্থে লিজ নিয়ে সস্তায় চা বাগান করে ফিনলে, ডানকান ইত্যাদি ব্রিটিশ স্টারলিং কম্পানি, দেশীয় সরকারি এবং বেসরকারি কোম্পানি। ভর্তুকী মূল্যে সার পায় তারা, সহজ শর্তে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণও বরাদ্দ বাগান মালিকদের জন্য। ফলে মুনাফা তাদের কম নয়। চট্টগ্রামের নিলাম হাউজে প্রতি কেজি চা যখন ১৪৭ টাকায় বিকোয়, তাদের খরচ তখন কেজি প্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ফলে মুনাফ বিপুল।

অথচ চা শ্রমিকদের দাবী সামান্যই- দৈনিক মজুরী ১২০ টাকা(মালিকরা মাত্র ৭ টাকা বাড়িয়ে ৫৫ টাকা থেকে ৬২ টাকা করতে চাচ্ছে), পরিবার নিয়ে বসবাস করবার জন্য ৭৫০ বর্গফুটের ঘর,বাগানে ভূমির অধিকার, সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের সুষ্ঠু চিকিৎসা, চাকুরি স্থায়ী করণ ইত্যাদি।

এইরকম ২০দফা দাবীতে আধুনিক যুগের বাগান দাস, চা শ্রমিকেরা ফুসে উঠেছে, তারা আজ ২১ মে থেকে সারা দেশের চা বাগানে অনির্দিষ্ট কালের ধর্মঘট ডেকেছে। আমরা চা শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকা এই ধর্মঘটের সাথে সংহতি জানাই।