শাহবাগ গণজাগরনের ৩০ দিন
এইদেশ সংগ্রহ , বুধবার, মার্চ ০৬, ২০১৩


গণজাগরণ মঞ্চ থেকে: কয়েকজন তরুণের হাত ধরে শাহবাগে যে আন্দোলনের সূচনা, এক মাসের মাথায় তা দেশের পাড়া-মহল্লা ছাড়িয়ে সব ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বব্যাপী বাঙালিদের মনে স্থান করে নিয়েছে।

মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনের ধাক্কায় হুমকিতে পড়া জামায়াত-শিবির অস্তিত্বের সংকট কাটাতে ‘চাঁদে দেখেছে সাঈদীকে’। তাণ্ডব চালিয়েছে একাত্তরের মতো হিংস্রতায়। তাই তৃতীয় প্রজন্মও দেখে নিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী হায়েনার রুপ।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রত্যাখ্যান করে তার ফাঁসির দাবিতে রায়ের দিন ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে আন্দোলন শুরু করে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম। ফাঁসি ছাড়াও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলন দানা বেঁধে রুপ নেয় লক্ষ-কোটি জনতায়। তৈরি হয় গণজাগরণ মঞ্চ, যেখানে যুক্ত হয় শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাংবাদিক, ছাত্র-জনতাসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

বয়স এবং লিঙ্গের ভেদাভেদ ভুলে ২ বছরের শিশুর গালে লেখা হয়- ‘যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই’, ১৮ বছরের টগবগে তরুণের খোলা বুকে প্রকাশ পায় ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’, ষাট বছরের বৃদ্ধের কুঁচকে যাওয়া ললাট জানিয়ে দেয় ‘জেগেছে প্রজন্ম, আর তোদের রক্ষা নেই’।

ত্রিশ দিনের প্রতিটি দিন শিশু-কিশোর-তরুণ-যুবক-বৃদ্ধের আন্দোলনের অনুসঙ্গ হিসেবে তৈরি হয় নতুন নতুন কবিতা-গান-চিত্রকর্মসহ সৃষ্টিশীল নানা উপাদান। বিশ্বব্যাপী শান্তিপূর্ণ এতো দীর্ঘ অহিংস আন্দোলন ইতিহাসে স্থান করে নেয় সোনালী অক্ষরে।

সৃষ্টিশীল আন্দোলন-উপাদান
গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে আন্দোলনের নতুন অনুসঙ্গ। নানান চিত্রকর্ম, প্ল্যাকার্ডের ভাষার নতুনত্ব, গান-কবিতাসহ অনেক উপাদান বেগবান করেছে আন্দোলনকে। শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘জাগরণ’, ‘সর্বজন’-সহ বেশ কয়েকটি প্রকাশনা। ভারতের শিল্পী সুমনের ‘বিমানে উড়তে ত্রিশ মিনিট’-সহ অসংখ্য গান। যা আন্দোলনকে করেছে আরও বেগবান।

অগ্নিকন্যা-বঙ্গকন্যার কণ্ঠে আগুনের ফুলকি
শুরু থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লাকী আক্তার স্লোগান দিয়ে আন্দোলনকে চাঙ্গা করে রাখেন। গণজাগরণ মঞ্চ তাকে ‘অগ্নিকন্যা’ উপাধী দেয়। রাজধানীর স্কলাস্টিকা স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী ৫ বছরের ঈপ্সিতার স্লোগান এক করে ফেলে সব বাঙালিকে। গণজাগরণ মঞ্চ তাকে দেয় ‘বঙ্গকন্যা’র উপাধী।

এতো মোমের শিখা দেখেনি বিশ্ব
১৪ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের কর্মসূচি ছিল মোমবাতি প্রজ্জলন। আর সেই কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে সন্ধ্যায় শাহবাগে জড়ো হয়েছিল লাখো মানুষ। পাশাপাশি দেশব্যাপী কোটি কোটি হাতে সেদিন সন্ধ্যায় যে মোমশিখা জ্বলে উঠেছিল তা রেকর্ড গড়ে ইতিহাসে। গণজাগরণ মঞ্চের নানা কর্মসূচির মধ্যে রায়ের রাজার বধ্যভূমির উদ্দেশ্যে পতাকা মিছিল ছিল জনতার আর একটি সম্মিলন।

প্রাথমিক বিজয়
দাপুটে আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের মাধ্যমে। জাতীয় সংসদে আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষের জন্য কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ তৈরি হয়। এরইমধ্যে সরকার পক্ষে আপিল হয়েছেও।

হরতালেও সোচ্চার গণজাগরণ মঞ্চ
প্রতিটি হরতালে নগরীতে হরতালবিরোধী মিছিল করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। মিছিলে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি কার্যত প্রত্যাখানের অভাস দিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের প্রতিটি হরতাল।

রাজীবের রক্ত আন্দোলনের স্লোগান
আন্দোলন চলাকালে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পল্লবীতে খুন হন ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার। আন্দোলনকারীদের দাবি, বিরোধী পক্ষ আন্দোলন দমাতে রাজীবকে পরিকল্পিতভাবে খুন করেছে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ ছাত্রকে গ্রেফতারের পর তারাও জানিয়েছে, শিবিরের ‘বড় ভাই’র পরিকল্পনায় রাজীবকে খুন করা হয়। রাজীব ছাড়াও সিলেটে খুন হন জগৎজ্যোতি নামে এক ছাত্রলীগ নেতা, যিনি সেখাকার আন্দোলনের যুক্ত ছিলেন। তাদের খুনের ঘটনা আন্দোলনকে আরো চাঙ্গা করে রাখে। আন্দোলনে অংশ নিয়ে শান্ত নামের আর একজন ব্লগার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।

একাত্তরে ফিরে গেছে হায়েনারা
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের আরেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়ার পর মরিয়া হয়ে উঠেছে জামায়াত-শিবির। একের পর এক নৃশংসতায় তারা প্রকাশ করছে একাত্তরের হায়েনার স্বরুপ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিসহ সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, মসজিদ-মন্দির, বাস-ট্রেনে আগুন দিয়ে প্রতিনিয়নত ধ্বংস লীলা চালাচ্ছে। হত্যা করেছে সাত পুলিশসহ মানুষকে। তাদের সংহিংসতায় জীবন যাচ্ছে নিজ দলের নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের। তারা হিংস্র হয়ে বিভিন্ন স্থানে শহীদ মিনার ভাঙচুর করেছে, পদদলিত করেছে জাতীয় পতাকা।

‘চাঁদের গায়ে সাঈদীকে দেখছে’ জামায়াত-শিবির
অপপ্রচার চালিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফায়দা লুটতে নতুন কৌশল নিয়েছে জামায়াত-শিবির চক্র। তারা চাঁদের গায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাঈদীকে দেখা যাচ্ছে বলে বগুড়া, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে অপপ্রচার চালিয়ে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে পুলিশের মুখোমুখি করেছে, যা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু তাদের এই অপকৌশল ধোপে ঢোকেনি মানুষের। উল্টো আলেম সমাজ ধিক্কার দিয়েছে তাদের। চাঁদে নিজেকে দেখা গেছে একথা অবিশ্বাস করেছেন খোদ সাঈদী নিজেই। বুধবার কারাগারের কনডেম সেলে সাঈদীকে কথাটি জানানো হলে তিনি বলেন, “অনেকেই অনেক কথা বলছে, কে, কেনো, কীভাবে বলছে তা আমি বুঝতে পারি না।”

জামায়াতের ফাঁদে বিএনপি
শাহবাগের দল-মত নির্বিশেষে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে বিএনপি তাতে সমর্থন না দিয়ে উল্টো জামায়াতের পক্ষ নিয়ে পালন করেছে মঙ্গলবারের হরতাল। সমমনা অনেক দলই জামায়াতের ফাঁদে বিএনপি পড়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে। খোদ গণজাগরণ মঞ্চও এই অভিযোগ তুলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেওয়ার জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছে।

জামায়াত-শিবিরের ‘ঢাল’ নারী-শিশু
দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের ঢাল হিসেবে সাধারণ মানুষসহ নারী-শিশুদের ব্যবহার করেছে জামায়াত-শিবির। ফলে বিভিন্ন স্থানে নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

ছুঁতো খুঁজছে জামায়াত-শিবির
সাঈদীর রায়ের দিনসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি হরতালে নারকীয় ধ্বংসযজ্হ চালিয়েছে জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির। তারা কৌশলে আন্দোলনের নামে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নতুন করে হরতালসহ নানা কর্মসূচির দিকে যেতে চাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।

জেগে থাকবে শাহবাগ, বিজয় হবেই
শাহবাগে তৈরি হয়েছে স্থায়ী মঞ্চ। এদিকে মাসব্যাপী আন্দোলনের ২৯তম দিনে মঙ্গলবার যাত্রাবাড়ীতে এক সমাবেশে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, এ আন্দোলন সবার, এ আন্দোলনে বিজয় অনিবার্য। ইমরানসহ ছাত্রনেতারা সমাবেশ থেকে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি করেন।

গত ২১ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচির আলোকে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে দেশব্যাপী। দাবি আদায় না হওয়া ছাড়া তারা রাজপথ ছাড়বে না বলে জানিয়েছেন।

ইসমাইল হোসেন,
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম